সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্মদিন আজ

স্টাফ রিপোর্টার
বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্মদিন আজ। ১৯৪৫ সালের ৫ মে দিরাই উপজেলার আনোয়ারাপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা চিকিৎসক দেবেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও মা সুমতি বালা সেনগুপ্ত। তিনি দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সিলেট এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স গ্র্যাজুয়েট ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ঢাকা সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রিও অর্জন করেন। প্রয়াত এই রাজনীতিক ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন।
বিরোধী দলের সমালোচনার যে মাধুর্য থাকা উচিত তা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছিলো। তাঁর আরো যে বিরল গুণ ছিলো তা’হলো নিজের এবং নিজ দলের সমালোচনা করার ক্ষমতা। তিনি অনেক কঠোর কথা বলতেন অনেক মধুর ভাষায়, অলংকারে মুড়িয়ে! বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর মতো অভিজ্ঞ এবং উচ্চমানের প্রজ্ঞাধারী নেতা বিরল। তিনি জীবন প্রভাতে রাজনীতি শুরু করেছিলেন বামপন্থী হিসেবে। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক এসেম্বলির নির্বাচনে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি থেকে নির্বাচিত হন। আমরা তখন পাকিস্তানের পেটের ভিতরে। আগুন সময়। মুক্তিযুদ্ধে জয়ী বাংলাদেশের প্রথম সংসদের তিনি হলেন বিরোধী দলের মুখপত্রদের একজন। ছোট খাটো কোন কথা নয়। বঙ্গবন্ধুর সামনে দাঁড়িয়েই তাঁর সমালোচনা করেছেন এই জননেতা। তিনি বলতেন-অবলীলায়, সর্পিলগতিতে, ঋজুভাবে, কখনো কখনো নির্মিলিত চোখে। এক পর্যায়ে আলাদা দল একতা পার্টির নেতৃত্ব দিতে থাকেন তিনি। ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করলেন। বক্তৃতায় সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের যে বৈচিত্রতা ছিলো, এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেননি। ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ভোর ৪টা ২৯ মিনিটে তিনি রাজধানী ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন সুরঞ্জিত। তিনি ৫ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ৫ নম্বরের সেক্টরের অধীন টেকেরঘাট সাব সেক্টরে প্রথম সাবসেক্টর কমান্ডার এবং পরে সংগঠক, ১৯৭২ সালে সাংবিধানিক সংসদ সদস্য, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনীতি থেকে উঠে আসা বামপন্থি এই নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। দীর্ঘ ৫৯ বছর রাজনীতি করেছেন দাপটের সঙ্গে।
‘ল’ পাসের পর কিছু দিন তিনি আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ভিপি প্রার্থী হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) পিকিং ও মস্কো ধারায় দুই ভাগ হলে মাওলানা ভাসানীর পক্ষ ত্যাগ করে সুরঞ্জিত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশে যোগ দেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে ন্যাপ থেকে বিজয়ী হন। পরে ন্যাপের ভাঙনের পর গণতন্ত্রী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ ও ১৯৯১- এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।
পঞ্চম সংসদের সদস্য থাকাকালেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে প্রথমে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরে দলটির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হন। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেন সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেও পরে হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জ-বানিয়াচং আসনে উপ-নির্বাচন করে বিজয়ী হন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন তিনি।
২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সুরঞ্জিতকে আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর নবগঠিত রেলপথমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। কিন্তু ব্যক্তিগত সহকারীর দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় রেখে দেন। পরে তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সুরঞ্জিতকে নির্দোষ ঘোষণা করে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে তিনি আবারও আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলন তিনি পুনরায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
তুখোর পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিতের রাজনীতির শুরু বামপন্থী সংগঠনে। সাম্যবাদী দর্শনে দীক্ষা নিয়ে ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক জীবন শুরু করা এই নেতা দীর্ঘ ৫৯ বছর দাপটের সঙ্গেই চলেছেন। তবে শেষ জীবনে রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর দিরাই-শাল্লা আসনের উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হন তাঁর স্ত্রী ড. জয়া সেন গুপ্তা। বিগত সংসদ নির্বাচনেও এই আসনে জয়া সেন নির্বাচিত হন।