সুরমার উত্তর পাড় মাদকের অভয়ারণ্য

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর উত্তরপাড়ে মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আস্তানা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এপাড়ে (সুনামগঞ্জ শহরে) পুলিশী অভিযান হলেই মাদকের ক্রেতা-বিক্রেতারা সুরমা নদীর উত্তরপাড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নেয়। ওপাড়ের মাদকসেবী ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে এপাড়ের বিক্রেতাদের ঘনিষ্টতা রয়েছে। সুরমার উত্তরপাড়ের বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা এ প্রতিবেদককে এই তথ্য জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, সুরমা উত্তরপাড়ের গ্রামগুলোতে চাইলেই মাদক পাওয়া যায়। মাদকসেবীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ নিরীহরা। দেশী-বিদেশী মদ, গাঁজা, হোরোইন, ইয়াবা এমন কোন মাদক নেই, যা পাচ্ছে না মাদকসেবীরা।
মাদক ব্যবসায়ীদের দাপটও সাধারণের চেয়ে বেশি। এজন্য মুখ খুলেন না সাধারণেরা।
জানা যায়, গ্রামীণ এলাকার চায়ের দোকানে ব্যবসার পাশাপাশি মাদকের ব্যবসা জমজমাট করতে টিভিতে ছায়াছবি প্রদর্শন করা হয়। কাস্টমার টিভি দেখার সুযোগে দোকানের ভেতরে থাকা নিরাপদ কোঠায় বসে মদ, গাঁজা, ইয়াবা সেবন করে। এসব দোকানে দিনে ও রাতে চলে জুয়ার আসর। এই ব্যবসায় সহযোগিতা করে গ্রামের প্রভাবশালীরা। মাদকের ব্যবসায় জড়িত থাকে ফেরি নৌকার মাঝি, সেলু নৌকার চালক ও গাড়ি চালক। মাদক ব্যবসায়ীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি’র ঘটনায় জড়িত থাকে। উপজেলার বাইরের মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে স্থানীয় একাধিক মাদক ব্যবসায়ীর।
সুনামগঞ্জ শহরের মাদকসেবী ও বিক্রেতারা এপাড়ে তাড়া খেলেই ওপাড়ে গিয়ে সেবন করে, জমজমাট ব্যবসাও অব্যাহত রাখে।
এলাকাবাসী জানান, সুরমা ইউনিয়নের সদরগড়, কুরুতলা, আমিরপুর, আমিরগঞ্জ ও অলিরবাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে ইয়াবা, দেশী-বিদেশী মদ ও গাঁজার রমরমা ব্যবসা।
সদরগড় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে চলছে জুয়ার রমরমা ব্যবসা। সুনামগঞ্জ শহর ও বিভিন্ন স্থানের বহিরাগতরা লাখ লাখ টাকার জুয়ার আসর জমিয়ে তোলেন এসব জায়গায়।
শহরের তেঘরিয়া এলাকায় সাহেব বাড়ি ফেরি দিয়ে সুরমা নদী পার হয়ে জালখালির মুখে এবং অলির বাজারে নিরাপদে পৌঁছে যান মাদকের ব্যবসায়ীরা। বাজারের দোকানপাটের আড়ালে মাদকের ব্যবসা চালানো হয়। এ নিয়ে একাধিক মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। জালখালীর মুখ থেকে শুরু হয়ে ইব্রাহীমপুর গ্রামের আনন্দ বাজার এলাকায় মাদকের ক্রেতা-বিক্রেতাদের অভয়ারণ্য। শহরের চাঁদনী ঘাটের ফেরি পার হয়ে যাওয়া যায় ইব্রাহীমপুরের আনন্দবাজার। শহরের জেলরোডের ফেরি পার হয়ে ইব্রাহীমপুর এবং লঞ্চঘাটের ফেরি পার হয়ে পূর্ব ইব্রাহীমপুর গ্রামে পৌঁছা যায়। ইব্রাহীমপুর গ্রামের চায়ের দোকানে জুয়ার আসর বসে প্রায়ই। চলে মাদকের ব্যবসা। সন্ধ্যায় চলে গ্রামের দোকানে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা।
ইব্রাহীমপুর সড়কের কালভার্ট সেতু এলাকায়, আঞ্জবপাড়া এলাকায়, কবরস্থানের আশপাশে রয়েছে মাদক ব্যবসার আস্থানা। রাতের বেলায় নেশার রাজ্যে পরিণত হয় পুরো এলাকা। জগন্নাথপুর সড়কের পাশে, মইনপুর খালের সেতুর আশপাশে মাদক বেচাকেনা, সেবন ও জুয়ার আসর জমে উঠে রাতের বেলায়। বিশেষ করে জগন্নাথপুর স্কুলের পেছনে, মন্দিরের সড়কে এবং জগন্নাথপুর-মইনপুর সড়কের পাশে সন্ধ্যার পর চলে মাদকের জমজমাট ব্যবসা।
সুনামগঞ্জ শহরের ধোপাখালি থেকে সুরমা নদীর ফেরি পার হয়ে জগন্নাথপুর পৌঁছা যায়। জুয়ারি, মাদক সেবী ও ব্যবসায়ীদের আচরণ দেখলে মনে হয় সবকিছুই তাদের ম্যানেজ করা। প্রকাশ্যে সেবন করলে বা বিক্রি করলেও তেমন কিছু হবে না।
স্থানীয়রা জানান, পুলিশ এসে মাঝে-মধ্যে নিরিহ মাদক সেবী ১-২ জনকে গ্রেপ্তার করে থাকেন। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকছে। এই ব্যবসা করে ‘আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে’ কেউ কেউ। সমাজকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাচ্ছে ওরা।
ধারারগাঁও-হালুয়ারঘাট ফেরি পার হয়ে হালুয়ারঘাট বাজারে একাধিক স্থানে মাদক বেচাকেনা হয়। সন্ধ্যার পর নেশার রাজ্যে পরিণত হয় পুরো হালুয়ারঘাট বাজার। নেশা পানের কারণে প্রায়ই মারামারির ঘটনা ঘটে। ফেরি নৌকায় দিনে-রাতে মাদক পাচার হয়। সেলু নৌকায় হচ্ছে মাদক পাচার। মাদক ব্যবসায়ীরা দিন দুপুরে সুকৌশলে বিস্কুটের প্যাকেটে, কেউ বস্তার ভেতরে, কেউ বাজারের ব্যাগে, কেউ আবার কাপড়ের ব্যাগে পাচার করে এই মাদক।
সুরমা ইউনিয়নের বালাকান্দা বাজারেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মাদক বেচাকেনা করেন। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের আমপারা বাজারে, চৌমুহনি বাজারে এবং ডলুরা এলাকায় মাদকের রমরমা ব্যবসা আছে। রঙ্গারচর ইউনিয়নের রংপুর মাজারের পাশে, বনগাঁও বাজারে, নৈগাং ও হাসাউড়া বাজারে মাদকের ছড়াছড়ি রয়েছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মঙ্গলবার এই প্রসঙ্গে গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন,‘শহরে পুলিশী অভিযান কালেই সুরমা নদীর উত্তরপাড়ের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলবে। আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে এবং তাদের সুন্দর ভবিষ্যত বিনির্মাণে সমাজে শান্তি শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে সমাজ সচেতনদের সহযোগিতায় মাদককে নির্মূল করা হবে।’