সুশাসন ছাড়া আমলাতন্ত্রের সেবক হয়ে উঠা কঠিন

সোমবার ছিল পাবলিক সার্ভিস ডে। আক্ষরিক অনুবাদে এর সরল বাংলা দাঁড়ায় জনসেবা দিবস। জনসেবায় নিয়োজিত পাবলিক সার্ভেন্টরা প্রতি বছরের ২৩ জুন এই দিবসটি পালন করেন। ঔপনিবেশিক কাল পেরিয়ে এসেছি আমরা বহু আগে। ঔপনিবেশিক বা প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে প্রশাসন ব্যবস্থা সাজানো হয়েছিল শাসকের পক্ষে প্রজা তথা জনসাধারণকে শাসন করা এবং সরকারের পক্ষে রাজস্ব আহরণের জন্য। এছাড়া সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে বৈচারিক কার্যক্রমও ছিল প্রশাসনিক কাজের অংশ। তখনকার প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মানুষকে শাসকের অধীনে বাধ্য নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা। জনসেবার সাথে তখন প্রশাসনের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। যদিও তখনও প্রশাসনিক কর্তৃত্বাধীন ও নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হত। তবে সেইসব উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত শাসন ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করা এবং ঔপনিবেশিক বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে মুনাফা আহরণ করা। আমরা সেই ঔপনিবেশিক কাল পেরিয়ে এসেছি। এখন আমরা একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অধিবাসী। সংগত কারণেই ঔপনিবেশিক আমলে প্রশাসনের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তা স্বাধীন দেশে বদলে যেতে বাধ্য। প্রশাসনিক দর্শন বদলেছেও। এখন প্রশাসনকে বলা হয় জনপ্রশাসন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা কর্মচারীদের জনসেবক হিসাবে অভিহিত করা হয়। সর্বতোভাবে জনসেবার জন্য প্রশাসনকে গড়ে তোলার একটি প্রবণতা লক্ষণীয়। এমন প্রেক্ষাপটে পাবলিক সার্ভিস ডে পালনের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উপযুক্ত কর্মী হিসাবে তৈরি করার শপথ গ্রহণ করার সুযোগ পান। দিবসটি পালনের মাহাত্ম্য এখানেই।
বৃটিশ প্রশাসনিক কাঠামোর যে উত্তরাধিকার আমরা বহন করে চলেছি তা দিয়ে আদৌ গণতান্ত্রিক চাহিদা মিটানো সম্ভব কিনা সেটি নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। আমলাতন্ত্রে কোন কর্মচারীর নির্দিষ্ট বয়সের আগে চাকুরি ত্যাগের সুযোগ নেই (অভিযোগজনিত কারণে পদচ্যুতি বা ইচ্ছাকৃত অবসর গ্রহণ ছাড়া)। এদিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর ক্ষমতার পালা বদল ঘটে। স্বাধীন বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর প্রায় সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই আমরা ভোটের মাধ্যমে যে দল ক্ষমতা থেকে সরে যায় তার বিপরীত আদর্শের দলকে ক্ষমতায় আসতে দেখা যায়। এই দুই বিপরীত আদর্শের দলের কর্মসূচী ও কৌশল ভিন্ন হতে বাধ্য। রাজনৈতিক সরকারের সব কর্মসূচী ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমলাতন্ত্রের উপর ন্যস্ত। কিন্তু অনঢ় আমলাতন্ত্র যেভাবে আগের সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করেছে সেইভাবে একই হাত দিয়ে বিপরীত আদর্শের সরকারের কর্মসূচীও তারা সমান দক্ষতায় বাস্তবায়ন করে থাকেন। অর্থাৎ আমলাতন্ত্র কোন ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গিকারের বাইরে থেকে কাজ করেন। এই জায়গায় রাজনৈতিক সরকারের সাথে অরাজনৈতিক আমলাতন্ত্রের সমন্বয় কিছুটা সমস্যা তৈরি করে। আমেরিকায় রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের বেশ কিছু উচ্চ পদস্থ আমলা সরকার পরিবর্তনের সাথে বদলে নতুন সরকারের আদর্শভাজন লোকরা সেখানে প্রতিস্থাপিত হন। এর ফলে রাজনৈতিক সরকার স্বচ্ছন্দে কাজ করতে পারেন। কিন্তু বৃটিশ ভারতীয় আমলাতন্ত্রে এখন পর্যন্ত এই ধরনের পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো হয়নি। এটি ভাল নাকি মন্দ সে নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলতে পারে।
পাবলিক সার্ভেস ডে উপলক্ষে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিজেদের আরও জনমুখী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। এই অঙ্গীকার মুখে ব্যক্ত করা যত সোজা কাজে পরিণত করা ততটাই কঠিন। আমরা এমন একটি সিস্টেমের দাস বনে আছি যেখানে ব্যক্তি তার নিজের ইচ্ছা নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে পারেন না। তাই ক্ষমতাকেন্দ্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া আমলাতন্ত্রের গায়ে সেবকের লেভেল এঁটে দেওয়া গেলেও প্রকৃত সেবক হয়ে উঠা সত্যিই কঠিন। তবে আমরা প্রশাসনের নানা স্তরে কর্মরতদের ইতিবাচক মনোভাবটিকে স্বাগত জানাই।