সেতু যেন মৃত্যুকূপ

বিশ্বজিত রায়, ফতেপুর থেকে ফিরে
‘আমরা কঠিন সমস্যায় আছি। গাড়ি ব্রিজে তুলি না, কারণ কোন সময় কি হয়। মারাত্মক ঝুঁকি, যে ঝুঁকির শেষ নেই। কোন গাড়ি পড়লে অন্তত ৫০-৬০ হাত পানির নীচে তলাইয়া যাইব। ব্রিজের নীচের অংশে যে গভীর হইছে, সেটা পানি কমলে বোঝা যাইব। এই ব্রিজের নীচ অংশ শূন্য হইয়া গেছে। যে কোন সময় ভাইঙ্গা পইড়া যাইতে পারে।’ ফতেপুর সেতুর পূর্ব পাশে বসে কথাগুলো বলছিলেন ফতেপুর পূর্বপার সিএনজি স্ট্যান্ডের ম্যানেজার মালে গনি।
তিনি আরও বলেন, ‘গত মাস দুয়েক আগে যখন বস্তা ফেলানো হয় তখন আমরা না করছিলাম। কইছিলাম এভাবে বস্তা ফালাইয়া কোন লাভ হইব না। তারপরও বস্তা ফেলানো হইছে। এক সপ্তাহ পরেই ভাঙ্গা শুরু হয়ে এখন এই অবস্থা। শুনেছি বড় বরাদ্দ হইছে। কিন্তু সামান্য কিছু টাকার বস্তা ফালাইয়ঔ কাম (কাজ) শেষ। এখন যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটবো।’
সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের ফতেপুর সেতুর দুই পাশের এপ্রোচ ভেঙ্গে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। সুনামগঞ্জের চার উপজেলার যোগাযোগের এ সেতুটি এখন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। দু’দিকের এপ্রোচের প্রায় সবটুকু ভেঙ্গে সামান্য অংশ সেতুর সাথে যুক্ত থাকলেও অল্প বৃষ্টি হলে বাকিটুকু ধসে সেতুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
ভাঙ্গনকৃত সেতু দিয়ে সিএনজি অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ রয়েছে। মোটরসাইকেল ও পায়ে হেঁটে সাধারণ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হতে দেখা গেছে। তবে সেতুর দুই মুখ ভেঙ্গে বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন অংশেই সতর্কতা কিংবা সাবধানতামূলক কিছু সাঁটায়নি। এতে যে কোন সময় ধসে পড়ে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন পথচারী ও স্থানীয়রা।
জানা গেছে, সেতুর ভাঙ্গন ঠেকাতে ৪৩ লাখ টাকা বরাদ্দও দিয়েছে সুনামগঞ্জের সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এত টাকা বরাদ্দের পরও ঠিকমতো কাজ না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ ও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। ৪৩ লাখ টাকার কয়েন বিছিয়ে দিলেও সেতুর দুই পাশ ঠিক হয়ে যেত বলেও মন্তব্য করছেন অনেকে। ৪৩ লাখ টাকা বরাদ্দের বিষয়টি স্বীকার করে গত জুন মাসের আগে বস্তা ফেলে কাজ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সওজ কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর উঠানামার উভয় পাশ ভেঙ্গে সেতুটি ভয়ংকর বিপজ্জনক অবস্থায় পতিত হয়েছে। সেতুতে উঠে ভাঙ্গনকৃত অংশে দৃষ্টি ফেরালে মনে হয়, জায়গাটি যেন ভয়ংকর মরণফাঁদ। সেতুর দুই পাশের সবটুকু অংশই প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে, বৃষ্টি হলে সেটুকুও পানিতে নিমজ্জিত হবে। সেতুর দু’দিকে বেলে মাটি থাকায় ভেঙ্গে পড়ার শঙ্কা আরও প্রবল বলে মনে হয়েছে। চরম ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতু দিয়ে সিএনজি-অটোরিক্সা চলাচল না করলেও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত মোটরসাইকেল কিংবা পায়ে হেঁটে চলাচল করছে। সেতুর উত্তরদিকের ফতেপুর খেয়া পাড়ি দিয়ে বেশকিছু পথ পায়ে হেঁটে যাত্রীরা ভাঙ্গনকৃত সেতু পার হয়ে পূর্বপাশে এসে সিএনজি-অটোরিকশায় ওঠতে দেখা গেছে।

জীবনঝুঁকি নিয়ে চার উপজেলার সহস্রাধিক গ্রামের মানুষের চলাচল


স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেপুর সেতুর এপ্রোচ অংশ বছরখানেক আগেই ভাঙতে হয়। ধীরে ধীরে ভেঙ্গে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। বন্যা পূর্ববর্তী সময়ে সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ ভাঙ্গনে বস্তা ফেলে সংস্কারের চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু বস্তা ফেলার কয়েকদিনের মাথায় ফের ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সেতুর দুই মুখ। সজনার হাওর ও কোপা নদীর সংযোগস্থলের ফতেপুর সেতুর উভয় পাশের মাটি সরে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সেতুর নীচে থেকে মাটি সরে শত ফুট গভীর হওয়ায় যেকোন সময় মূল সেতুই ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার অন্তত হাজারো গ্রামের মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে।
বর্তমানে সুনামগঞ্জ থেকে ফাড়ি পথ ব্যবহার করে চলাচলকারীরা তাহিরপুর গেলেও মূলত সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর যাতায়াতের প্রধান সড়ক হচ্ছে এটি। এছাড়া এ পথ ধরে প্রতিনিয়ত জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন পথে যাতায়াত করছে। সেতুসহ সড়কের সংস্কার ও মেরামতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।
সেতুর পাশে দাঁড়িয়ে দেখা হয় আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরা মনীন্দ্র কুমার তালুকদারের সাথে। সেতুর বিষয়ে প্রশ্ন করলে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের লখা গ্রামের এই প্রবীণ বলেন, ‘বড়ই রিস্কের ব্যাপার। জান হাতে লইয়া যাওন-আওন। যে কোন সময় এইডা ধইস্যা পড়ব। সকালে গেছি, বিকালে আইতে পারমু কিনা সন্দেহ। যত সময় যাইতাছে, ততই ভাঙতাছে। দুই-তিনদিন পরে আর সেতু থাকব বইল্যা মনে হয় না। কিছুদিন আগে বস্তা ফালাইছিল, কাজ হয় নি।’
কথা হয় ফতেপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও আলীপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুন নূর (নূর মেম্বার) এর সাথে। তিনি জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর ধরেই ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। প্রথমে ছোট ছিল। পরে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। সওজের লোকেরা বস্তা ফেলে আটকানোর চেষ্টা করলেও কাজ হয়নি। এখন যে অবস্থা ভয়ংকর থেকে আরও ভয়ংকর হয়েছে। দ্রুত কাজ না হলে দুর্ঘটনা নিশ্চিতভাবেই ঘটতে পারে।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম প্রাং বললেন, এখন আমরা সেতুর দুই পাশে বেইলি সেড করে দিব। কারণটা হচ্ছে ধসে পড়া জায়গাটা অনেক গভীর। তাই এখন এইখানে খুঁটি গাঁড়া কিংবা কোন কিছু দিয়ে কাজ করলে সেটা ঠিকবে না। পানি কমে গেলে নভেম্বর মাসের দিকে এখানে আরসিসি ফাইলিং করে আমরা প্রটেকটিভ ওয়ার্ক করব।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, এখানে ৪৩ লাখ টাকা বরাদ্দের বিষয়টি ঠিক আছে। গত জুন মাসের আগে আমরা এইখানে কাজ করেছিলাম। জিও ব্যাগ ফিলিং করা হয়েছিল। কিন্তু পানির গভীরতা থাকায় সেটা টিকেনি। এর মাঝে বন্যা হওয়ায় ব্রিজের সম্মুখ অংশ আরও ক্ষতির মুখে পড়েছে।