সেদিন আকাশ কেঁদেছিলো

মীর মোশারফ হোসেন
মনু মিয়া একজন শিক্ষক। চাকরির প্রয়োজনে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা উপজেলা সদরে ভাড়া থাকেন। মহল্লায় মনু মিয়ার অবস্থান বেশি দিনের নয়। মহল্লার অনেকের সাথে তেমন কোন পরিচিতি তখনও গড়ে ওঠেনি। মহল্লার লোকগুলোর অনেককেই চোখের দেখায় চিনেন। স্থানীয় একটা কলেজে শিক্ষকতা করেন মনু মিয়া। মনু মিয়ার বাসার আশেপাশের বেশিরভাগ লোকই স্বচ্ছল।
মনু মিয়ার বাসার পাশে একটা টিনের ঘর আছে। ঘরটি বেশ নড়বড়ে। বেড়া, দরজা কোনটাই ঠিক না। জানালাতো নাইই। জানা গেলো এখানে থাকে বানেছা এবং তার পরিবার। বানেছার স্বামী ষাটোর্ধ্ব একজন ভূমিহীন ঠেলা শ্রমিক। এই বয়সেও বানেছার স্বামী যথেষ্ট কর্মঠ। তার একমাত্র ছেলেও ঠেলা চালায়। বানেছার ছেলে বিয়ে করেছে এবং তার সন্তানও আছে। এক ঘরে থাকলেও বাপ-বেটা দুই পরিবারে বিভক্ত। ঘরটা তাদের নিজের না। জায়গার মালিক দখলের জন্য যে ঘরটি তুলেছিলেন দয়াপরবশ হয়ে এই পড়ো ঘরটাতে বানেছা তার স্বামী, সন্তান ও নাত-নাতীদের নিয়ে থাকতে দিয়েছেন।
বানেছার বয়স পঞ্চাশ হতে পারে। কিন্তু অপুষ্টি আর রোগের কারণে তাকে তার বয়সের চেয়ে বেশি বৃদ্ধা দেখায়। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে অনেকদিন ধরে। নিজের কাজটা নিজে ঠিকমতো করতে পারে না। খাওয়া পড়ার জন্য সম্পুর্ণভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদের দয়ার উপর নির্ভরশীল। বানেছা জানে তার স্বামী সন্তানেরা খুব বেশি রোজগার করতে পারে না। তাই অনেক কষ্ট বুকে চেপে রাখেন। মুখ খুলে বলেন না। সহ্য করে নেন। বানেছা বুঝতে পারে তার স্বামী সন্তানের সেই সাধ্য নাই। বানেছা বিছানায় কায়মনো বাক্যে মহান রবের কাছে চায় প্রতিটি আগামি যেনো একটি সুদিন হয়ে আসে। প্রতিদিনই নতুন সূর্য ওঠে, আবার সূর্য অস্ত যায়। কিন্তু বানেছাদের ভাগ্যে সুপরিবর্তন আসে না। বরং কষ্ট আরো বাড়ে।
বানেছার স্বামীর প্রতিদিন কাজ থাকে না। যখন কাজ পায় তখন কাজ করে। যা পায় তাই দিয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকে। তার ছেলেরও একই অবস্থা। খুব কষ্টে তার সংসার চালায়। কাজ না থাকলে বাপ-বেটা বাসায় থাকে। বাসায় থাকলে বেশিরভাগ সময়ই বাপ-বেটা ঝগড়া করে। আর ঝগড়ার কারন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বানেছা। একেতো খাবার যোগাড় করাই তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। সেখানে বানেছা বেগমের চিকিৎসার খরচ যোগানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। এতো অভাবের মধ্যে বানেছার অসুস্থার খবর নেওয়া কিংবা তার চিকিৎসা করা তাদের সাধ্যের বাইরে।
বানেছাও বিষয়টা বুঝে। তার স্বামী সন্তানের রোজগারের আলোকে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব না। তাই নীরবেই অনেক কিছু সহ্য করে যান। মুখ খুলে কিছু বলেন না। তার তেমন কোনো চাহিদা নাই। শুধু একটু খাবার পেলেই খুশি থাকেন।
বানেছার শারিরীক অসুস্থতা খুব খারাপ হয়ে গেলে কিংবা সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে গেলে মাঝে মাঝে কান্না-কাটি করে। তখন ঘরে আরেক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বানেছার অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে বাপ-বেটার মধ্যে শুরু হয় ঝগড়া। কে মহিলার চিকিৎসা করাবে তা নিয়ে শুরু হয়ে যায় ঠেলাঠেলি। কিন্তু কাজের কাজ কেউই করে না। বাপ, বেটা দুজনেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
এই দৃশ্য দেখে অসহায় বানেছা অপলক তাকিয়ে থাকে আর ভাবে: এই সংসারের জন্য আমি কী করি নাই? যৌবনে সমস্ত শক্তি দিয়ে স্বামীর পাশে থেকে পরিশ্রম করেছি। সংসারের সমস্ত কাজ করেছি, স্বামীকে সর্বোচ্চ সেবা দিয়েছি। মা হওয়ার পর জীবনের সকল ভোগ-বিলাস সন্তানের জন্য ত্যাগ করেছি।
আজ স্বামী সন্তানের আচরণে বানেছার শারিরীক কষ্টের চেয়ে মানষিক কষ্ট অনেকগুন বেড়ে গেছে। যাদেরকে ভালো রাখার জন্য সীমাহীন কষ্ট সহ্য করেছে, আজ তার এই কষ্টের সময় তারা কেউ তার পাশে থাকছে না।সবার কাছেই বানেছা বোঝায় পরিণত হয়েছে।
এখন বানেছার সেবা পাওয়ার আশা মরে গেছে। এখন আর কাউকে কিছু বলে না। শব্দ করে কাঁদে না। শুধু তার অবস্থানটা জানান দেয়। আর বাকি সব নীরবে সহ্য করে।
সর্বোপরি বানেছাও একজন মা। মাতৃত্বের অনুভূতি তার কমেনি। স্বামী সন্তানকে তিনি এখনও যথেষ্ট ভালোবাসেন। মনে মনে ভাবেন: যাদেরকে ভালো রাখার জন্য সারা জীবন কষ্ট করেছি, যাদের সুখ-শান্তিটাই ছিলো আমার একমাত্র কাম্য, জিবন সায়াহ্ণে এসে তাদেরকে আর কষ্টে ফেলতে চাই না।
মনু মিয়া ভাবেন, এই বানেছারা তেমন কিছুই চায় নাই। শুধু একটু খেয়েপড়ে বাঁচতেই চায়। জীবনের কোনো প্রকার জটিলতা তারা কখনো বুঝে না, বুঝতে চায় না। একটু ভালোবাসলে তারা মানুষের জন্য বুক পেতে দিতে পারে। কিন্তু এই বানেছাদের জীবন কতো কঠিন।
এই বানেছারা সারা জীবনই সমাজের বিত্তবানদের কাজ করেছে। তাদের পাশে থেকেছে। কিন্তু তার দুর্দিনে কেউ তার জন্য এগিয়ে আসেনি। বরং তার রথ পড়ে যাওয়ায় তার থেকে সকলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দেশের সরকার এই বানেছাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা বরাদ্ধ রেখেছেন কিন্তু বানেছাদের ভাগ্যে জুটেনি। এই বানেছাদের দেখিয়েই অনেকে অনেক অনুদান এনেছে কিন্তু তা দিয়ে নিজেদের অবয়ব বৃদ্ধি করেছে। বানেছারা তার খবরই জানে না। জনপ্রতিনিধিদের দরবারে বানেছারা অনেক ধরনা দিয়েছে কিন্তু দরিদ্র, অসহায় ভুমিহীনদের তালিকায় বানেছাদের নাম জায়গা পায় নাই। যাই হোক, মনু মিয়াদের ভাবনায় বানেছাদের জীবনমান উন্নত কিংবা অবনত কোনোটাই হয়তো হয় না।
এভাবে চলছে বানেছার দিনকাল। স্বামী-সন্তানের ভাবনা কমতে শুরু করছে। কোনো রকমে দিন পার করছে। আর মুক্তির আশা করছে। পরিবারে বানেছা এখন শুধুই বোঝা। তার কোন গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করছে না। আবার তাকে বিদায়ও করতে পারছে না। সকলের আচরণে বানেছা বুঝতে পারছে সবাই তার মৃত্যুর প্রহর গুণছে। বানেছা মরলে সবাই বেঁচে যায়। বানেছাও চায় আল্লাহ তায়ালা একটা ফায়সালা করুন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে বানেছার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। সে এখন নতুন বউ নিয়ে ব্যস্ত। বানেছার ধারে কাছেও আসে না। এই খবরে বানেছার কষ্ট আরো বেড়ে গেলো। শারিরীক কষ্ট ও মানুষিক কষ্ট দুইয়ে মিলে সে আর বাঁচার আশা করছে না। মনে মনে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
একদিন গভীর রাতে মনু মিয়া বানেছার ঘর থেকে শব্দ শুনতে পায়। ভাবছে এমন শব্দতো প্রায়ই শুনা যায়। এটা আবার নতুন কী? ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠে মনু মিয়া দেখতে পেলো বানেছার স্বামী, ছেলেসহ কয়েকজন মানুষ বানেছার বাড়িতে জড়ো হয়েছে। জানতে পারলো বানেছা মরে গেছে। মনু মিয়া মনে মনে বললেন: আল্লাহ বানেছাকে মুক্তি দিয়েছে।
বানেছার স্বজনেরা আজ কোনো ভুল করে নাই। সবাই বানেছার অন্তুষ্টক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা করেছে। বানেছাকে গোছল দিয়েছে, বানেছাকে কাফনের কাপড় পড়িয়েছে, বানেছার জন্য কবর খুড়েছে। বানেছার দাফন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আবহাওয়া খুব ভালো ছিলো। নির্বিঘেœ বানেছার দাফন কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
মনু মিয়া লক্ষ করেছে বানেছার স্বজনদের চোখে-মুখে শোকের চেয়ে স্বস্তির ছায়া ছিলো সবচেয়ে বেশি। বানেছার মৃত্যুতে কেউ কান্না করেনি, ঝড়েনি কারো এক ফোটা চোখের জল। কিন্তু বানেছার দাফন কাজ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেলো ভারি বৃষ্টি সেই সাথে প্রচন্ড ঝড়। ঝড়ে লন্ড-ভন্ড হয়ে গেছে সব।
মনু মিয়া ভাবে: বানেছার মতো একজন সহজ, সরল, ত্যাগি, পরিবারের জন্য নিবেদিত প্রাণ মানুষটার মৃত্যুতে কেউ কাঁদেনি কিন্তু আকাশ কেঁদেছে। আকাশের কান্নায় ভেসেছে ধরণীর বুক। ঝড়েছে গাছের পাতা। অন্যদিকে ঝড়ো হাওয়ায় প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রকৃতি। সমাজের কিছু মানুষের অপরাধের কারণে যে সব মানুষকে শাস্তি পেতে হয় তা আবারো প্রমাণীত হলো বানেছার মৃত্যুতে। এই ঝড় একটি চপেটাঘাত সেইসব দায়িত্বশীলদের প্রতি যারা সাংবিধানিক দায়িত্বে থেকে বানেছাদের পাশে দাঁড়ায়নি, যারা রাষ্ট্রকর্তৃক বরাদ্ধ বানেছাদের ঘরে পৌঁছে দিতে পারেনি। সেইসব প্রতিবেশিদের প্রতি যারা স্বচ্ছল হওয়া সত্বেও প্রতিবেশী হিসাবে বানেছার হক আদায় করে নাই। সর্বোপরি মানবিকতার তাগিদে যারা একজন অসহায় মানুষের পাশে দাড়ায় নাই।
লেখক : প্রভাষক, ইংরেজী বিভাগ, জামালগঞ্জ সরকারি কলেজ