সোনালী স্বপ্ন ফিকে, ২৮ ধানে চিটা

বিন্দু তালুকদার
‘শীষ থেকে ধান বের হওয়ার সময় জমি দেখেছি খুব সুন্দর। কিন্তু যখন ধানগুলো পাকার সময় হয়েছে তখনই সব শেষ হয়ে গেলো। কি কারণে যে সব ধান সাদা হয়ে মরে গেছে তা জানি না। চুছা (চিটা) হয়ে গেছে সবার ২৮ ধানে। কিয়ার প্রতি ২/৩ মণ ধান হচ্ছে। আমার ১৪ কিয়ার জমির ২৮ ধানের এই দশা। এই ধান কেউ কাটতে চায় না। ধান কাটার খরচই পাওয়া যায় না। শুধু আমার না, এলাকার যারাই ২৮ ধান করছে সবার ধানই শেষ।’
হাওরের বি-ধান ২৮ জাতের ধানে মাত্রাতিরিক্ত চিটা হওয়ার বিষয়টি এভাবেই বলছিলেন জামালগঞ্জের হালীর হাওরের হরিনাকান্দি গ্রামের কৃষক জালাল মিয়া।
কৃষকদের অভিযোগ রয়েছে, হালীর হাওরের ২৮ জাতের ধান নিয়ে কৃষকরা যখন সমস্যায় ছিল তখন স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে কোন ধরনের সহায়তা বা পরামর্শ পাননি তারা। বিষয়টি স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাকে জানালেও তিনি পরামর্শ দেননি, এমনকি এলাকায় গিয়ে কোন খোঁজ-খবর নেননি। কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ দিলে কৃষকদের এই সর্বনাশ হত না।
তবে কৃষকদের এই অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আজিজুল হক বলেন,‘হালীর হাওরে বি-ধান ২৮ এর ব্লাষ্ট রোগ হয়নি। আমি নিজে ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তারা এসব ধান সরেজমিনে দেখেছি। আগাম চাষ করা ধানগুলো শীষ তৈরির সময় ঠা-াজনিত রোগ ও আবহাওয়ার কারণেই এই সমস্যা হয়েছে। কৃষকরাই জানিয়েছেন, যারা কিছুদিন পরে চাষ করেছে তাদের ২৮ জাতের কোন সমস্যা হয়নি। ’
হরিনাকান্দি গ্রামের জালাল মিয়া তার জমি চাষের হিসাব জানিয়ে এই প্রতিবেদককে বললেন,‘ ১৪ কেদার জমি বর্গা দিলে ২০/২৫ হাজার টাকা নগদ পাওয়া যেত। ধান চাষ করেছিলাম অন্তত ১৫০-২০০ মণ ধান পাওয়ার আশায়। প্রতি কেদারে কম হলেও ২ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। কিন্তু ধান কাটার পর মাথা ঘুরছে। ৭ কেদার জমি কাটতে ৫০০ টাকা করে ৩৫ জন শ্রমিক লাগছে। ধান পেয়েছি মাত্র ২১ মণ। সাড়ে ১৭ হাজার টাকার শ্রমিক দিয়ে সাড়ে ১০ হাজার টাকার ধান পেয়েছি। ৫ শ্রমিককে ৫’শ করে ২৫০০ টাকা খরচ করে প্রতি কেদারে ধান কেটে পাওয়া গেছে ৩ মণ, যার দাম ৫০০ টাকা করে ১৫০০ টাকা। প্রতি কেদারে সবশেষ লোকসান গুনতে হয়েছে ১ হাজার টাকা করে। টাকার সাথে সারা বছরের পরিশ্রমও জলে গেল। ৭ কেদার কেটেছি, অন্য ৭ কেদার আর কাটব না। ’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু জালাল উদ্দিনই নয়, কপাল পুড়ছে বিআর-২৮ জাতের ধান চাষকারী সকল কৃষকেরই। হালীর হাওরের পাশাপাশি তাহিরপুরের শনি হাওরসহ অনেক হাওরেই ২৮ ধানে এই সমস্যা হয়েছে। একাধিক কৃষকের দাবি ব্লাস্ট রোগে ২৮ ধান নষ্ট হয়েছে। প্রায় ৯০ ভাগ ধান নষ্ট হওয়ায় অনেক জমির ধান হাওরেই থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, এসব ধান কাটার পর শ্রমিকের খরচই পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অধিকাংশ কৃষক এসব ধান কাটবে না।
হরিনাকান্দি গ্রামের স্বাবলম্বী গৃহস্থ ও বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনু মিয়া বলেন,‘ ২৮ ধান ব্লাষ্ট রোগে নষ্ট হয়েছে। ধানে রোগ হওয়ার পর আমি নিজে কৃষি অফিসারকে ফোনে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু কেউ এসে কোন ধরনের খোঁজ-খবর নেয়নি। পরে আমি নিজ উদ্যোগে নেত্রকোনায় আমার এক আত্মীয় কৃষি অফিসারের কাছ ধান নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, এটা ব্লাস্ট রোগ। তার পরামর্শে প্রতি কেজি ৭ হাজার টাকা দরে ‘নাটিবু’ পাউডার এনে পানিতে মিশিয়ে জমিতে দিয়েছি। এতে আমার ৭০/৮০ কেদার জমির ধান রক্ষা পেয়েছে। তবে ৪০ কেদার জমির ধান নষ্ট হয়েছে, এসব ধান কাটব না।’
ইউপি সদস্য মনু মিয়া আরও জানান, হালীর হাওরের হরিনাকান্দি, মদনাকান্দি, মাহমুদপুর, আছানপুর ও আলীপুরের কৃষকদের ২৮ জাতের ধান নষ্ট হয়েছে। তার গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য সামছু মিয়ার প্রায় ৬০ কেদার জমির সব ধান এই রোগে নষ্ট হয়েছে। এই জমির ধান আর কাটাই যাবে না। সামছু মিয়ার স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে সর্বনাশা ব্লাষ্ট রোগ।
মাহমুদপুর গ্রামের বাসিন্দা বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মশিউর রহমান বলেন,‘এই বছর যারা আগে ২৮ জাতের ধান করছেন তাদের সবার ধানই শেষ। শুরুতে ধান অনেক ভাল দেখা গেলেও এখন দেখা যাচ্ছে সব নষ্ট। আমার ৫ কেদার জমির ২৮ ধান বেপারিরা (ধান কাটার শ্রমিক) কাটতে চাইছে না। বেপারীদের দাবি এই ধান কেটে পুষাবে না।’
তাহিরপুরের শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. গোলাম সরোয়ার ডালিম বলেন,‘ শনির হাওরে এই বছর যারা ২৮ ধান চাষ করছেন তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। শনির হাওরের উমেদপুর, শাহপুর, শাহগঞ্জ, ইকরামপুর, শ্রীপুর নায়নগর, মারালা গ্রামের কৃষকরা বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব গ্রামের কৃষকরা কেদার প্রতি ২ মণ করে ২৮ ধান পাচ্ছেন।’
শনির হাওরপাড়ের ইকরামপুরের গ্রামের কৃষক পুলক তালুকদার বলেন,‘এবার ২৮ জাতের ধান করে চরম লোকসানে পড়েছি। ধান নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকেই নানা ঔষধ প্রয়োগ করেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। ২২ কেদার জমির মধ্যে ৮ কেদার ২৮ ধান করেছিলাম। এই ৮ কেদার জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ২৮ ধান কাটা শুরু করেছি, প্রতি কেদারে ২/৩ মণ ধান পাওয়া যাবে। যারা ২৮ ধান করেছে সবারই একই দশা।’
দিরাইয়ের তাড়ল ইউনিয়নের বরাম হাওরপাড়ের জালালপুর গ্রামের কৃষক রিপু মিয়া জানান, অন্য বছর থেকে এই বছর ২৮ ধানের ফলন খুব কম হয়েছে। প্রতি কেদার জমিতে ৫/৬ মণ ধান পাওয়া গেছে। অন্য বছর ১০-১২ মণ ধান পাওয়া যেত।
কৃষি বিভাগ জানায়, এবার জেলায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল, ৩৫ হাজার ১৬৮ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড এবং ৪ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ হয়েছে। উচ্চফলনশীল জাতের ধানের মধ্যে মধ্যে বি ধান ২৮ ও ২৯-ই বেশি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় ১২ লাখ মেট্রিকটন ধান উৎপাদন হওয়ার কথা। তবে বি-ধান ২৮ চাষাবাদ করে চরম লোকসানের মুখে পড়েছে কৃষকরা। এতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত নাও হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো: বশির আহম্মেদ সরকার বলেন,‘জেলার সব হাওরে এই সমস্যা হয়নি। যারা বি-ধান ২৮ আগাম চাষাবাদ করেছেন তাদের ধানের কিছু ক্ষতি হয়েছে। কারণ ধানের শীষ তৈরির সময় একদিকে ঠা-াজনিত আবহাওয়া অন্যদিকে পানির অভাবে জমি ছিল শুকনো। যার কারণে ধানে কিছু চিটা হয়েছে। ১০ ডিসেম্বরের আগে যারা ২৮ জাতের ধান চাষ করেছিলেন তাদের ধানে কিছু চিটা হয়েছে। তবে যারা পরে চাষাবাদ করেছেন তাদের ফলন ভাল হয়েছে, কোন সমস্যা হয়নি। বড় কোন দুর্যোগ না হলে আমরা আশা করছি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। কারণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও চাষাবাদ বেশী হয়েছে। ’