স্কুলছাত্রী ঊষামনির মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে রড পড়ে এক ছাত্রীর নির্মম মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় তলায় নির্মাণাধীন ছাদ থেকে লোহার রড পড়ে ঊষামনি নামের প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রীর তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু ঘটেছে। নিহত শিশু ছাত্রটি শ্রীপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের মেয়ে। যে শিশুটি বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণের জন্য এসেছিলো জীবনকে গড়বে বলে সেই বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় তার নিথর দেহ লুটিয়ে পড়বে, এর চাইতে বেদনাদায়ক ঘটনা আর কী হতে পারে? নিহত শিশু কন্যার পিতা-মাতা এই পাহাড়ের মতো ভারী শোক কীভাবে সামাল দিবেন আমরা জানি না। তবে এই নির্মম ঘটনার মধ্য দিয়ে ঠিকাদারদের গাফিলতির কদর্য চেহারাটি আবারও জনসম্মুখে প্রকাশিত হলো। নির্মাণ কাজের সময়ে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে তা সুনির্দিষ্ট আছে। কিন্তু বাস্তবে কেউই কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধার ধারেন না। ফলে নির্মাণ কাজ চলার সময়ে বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক ও সাধারণ মানৃষের মৃত্যুর করুণ সংবাদ আমাদের শুনতে হয়। এই কিছুদিন আগেও খোদ রাজধানী শহরে নির্মাণাধীন ওভারব্রিজের গার্ডার ভেঙে একই পরিবারের কয়েক জনের মৃত্যুসংবাদ আমরা জেনেছি। সেখানেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার বালাই ছিল না বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। একের পর এক এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও ঠিকাদাররা পার পেয়ে যাচ্ছেন। এরা পার পেয়ে যাচ্ছেন বলেই দুর্ঘটনার সংখ্যা না কমে বরং প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে।
এখন সকলেই বেশি বেশি মুনাফা কামাতে হিং¯্র হয়ে উঠেছেন। অতিরিক্ত মুনাফা কামানোর জন্য খরচ কমানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। নিয়ম অনুসারে কোনো ছাদ ঢালাই করতে হলে কাজের শুরু থেকেই ছাদের চারপাশে এমন সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে হয় যাতে নির্মাণস্থান থেকে কোনো ভারী বস্তৃ নীচে না পড়তে পারে কিংবা কাজে নিয়োজিত শ্রমিক পড়ে না যায়। কার্যাদেশে এরকম শর্ত সংযুক্ত থাকে। বলাবাহুল্য এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য প্রাক্কলনে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু এই অর্থ খরচ করে অন্যের জীবন রক্ষার কোনো দায় অনুভব করেন না কোনো ঠিকাদার। এই উন্মত্ত মুনাফাবাজির শিকার হয়েছে ঊষা নামের নিস্পাপ শিশুটি। প্রকাশিত সংবাদে তাহিরপুর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঘটনার পর এরকম বহু কথা শুনা গেলেও দায়ীরা এরকম কাজের জন্য কখনও শাস্তি পান কিনা তা মানুষ জানতে পারে না। তাই এই ধরনের কথাকে ঘটনার উত্তাপ কমানোর কৌশল ছাড়া আর কিছু ভাবা চলে না। যদি সত্যিই আমাদের কর্মপরিবেশে এরকম দায়বোধ ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকত তাহলে দুর্ঘটনার এত প্রাবাল্য লক্ষ করা যেত না। যদিও এরকম জবাবদিহিতা নিশ্চিকরণের মাধ্যমেই কেবল বর্ণিত নির্মম দুর্ঘটনাগুলো রোধ করা সম্ভব।
এটা পরিস্কার যে, নিহত ঊষামনির মৃত্যুর জন্য নির্মাণকাজের ঠিকাদারের অবহেলাই দায়ী। এখন ওই ঠিকাদারকে কীভাবে বাধ্য করা হবে এই অবহেলার ক্ষতিপূরণ দিতে ও সাজা নিশ্চিত করতে? এখানেই তদারকী কর্তৃপক্ষের যথাযথ দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সম্পর্কিত। ঠিকাদার আর কর্তৃপক্ষ যদি হরিহর আত্মায় পরিণত না হয়ে কিছুটা মানবিকতার পরিচয় দেন তাহলে এই অবহেলার সুষ্ঠু প্রতিকার পাওয়ার পথ খোলা থাকবে। অন্তত আরও অনেক ঊষামনির মৃত্যু রোধ করতে তথা নির্মাণ কাজে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখার প্রত্যাশিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে দায়ী ঠিকাদারের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ বলে আমরা মনে করি।