স্কুলটির এখন কী হবে?

বিশেষ প্রতিনিধি ও আশিক মিয়া, দোয়ারাবাজার ঘুরে এসে
দোয়ারাবাজারের মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭ জন শিশু শিক্ষার্থী সোমবার প্রখর রোদে বসে পরীক্ষা দেওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এছাড়া স্কুলের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী মঙ্গলবার বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে আসেনি। যারা এসেছিল তাদেরকেও প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা প্রখর রোদে বসে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পরে স্কুল ঘরের দরজা খোলে দেয়া হলে শিক্ষার্থীরা ভেতরে বসে পরীক্ষা দেয়। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় শর্ত সাপেক্ষে স্কুলের জমি বন্দোবস্তের আবেদন প্রত্যাহার এবং দোয়ারাবাজার কলেজের পরিত্যক্ত ঘর কিছুদিনের জন্য ব্যবহার করবেন বলে কলেজ অধ্যক্ষের কাছে লিখিত দেন মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুবী রানী দাস। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা চিন্তিত আছেন স্কুলটির এখন কী হবে সে নিয়ে।
জমি-জমার মালিকানা নিয়ে পাশের দোয়ারাবাজার ডিগ্রি কলেজের সঙ্গে বিরোধ থাকায় স্কুলঘর থেকে অমানবিকভাবে ১৬২ শিশু শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হয়। সোমবার ঐ বিদ্যালয়ের ১৬২ জন শিক্ষার্থী প্রখর রোদে খোলা আকাশের নীচে বসে পরীক্ষা দেওয়ায় ৭ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরা হচ্ছে- বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৃপ্ত দাস, দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিনা বেগম, দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবেল, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী জগাই ও মাধাই, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মামুন এবং প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী বর্ষা।
এছাড়া সোমবারের প্রখর রোদে বাইরে পরীক্ষা দেবার পর মঙ্গলবার ভয়ে শিশু শ্রেণির ৭ জন, প্রথম শ্রেণির ১৩ জন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ১৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে আসেনি।
বিদ্যালয়ের ৪ জন শিক্ষকই জানালেন, সোমবার বিকালে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রেনু মিয়া এসে তাদেরকে জানান, দোয়ারাবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পক্ষে গত ১৭ এপ্রিল করা জমি বন্দোবস্তের আবেদন প্রত্যাহার করতে হবে এবং
যেখানে স্কুল পরিচালনা হচ্ছে, সেখানে কিছুদিন স্কুল পরিচালনার জন্য একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে। তাহলেই স্কুল ঘর খোলে দেওয়া হবে। শেষে বাধ্য হয়ে বিকাল সাড়ে ৫ টায় কলেজের প্রভাষক শের মাহমুদ ভুইয়া ও সাইফুর রহমানের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক রুবী রানী দাস উপজেলা পরিষদে গিয়ে জমি বন্দোবস্তের আবেদন প্রত্যাহার করেন। ঐ সময় জানানো হয়েছিল সকাল ৯ টায়ই স্কুল খোলা থাকবে। কিন্তু সকাল ১১ টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রখর রোদে পরীক্ষা দেয়ার জন্য খোলা আকাশের নীচে বসতে হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক রুবী রানী দাস এ প্রসঙ্গে বলেন,‘আমি স্কুলকে বাঁচানোর জন্য সকল চেষ্টাই করছি। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে অধ্যক্ষ স্যার ( দোয়ারাবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ) সহ গণ্যমান্যরা যা বলছেন সবই করছি।’ একই মন্তব্য করলেন- সহকারী শিক্ষক সাহেলা বেগম, কনিকা রানী দাস ও লক্ষী রানী দাস।
সহকারী শিক্ষক সাহেলা বেগম বললেন,‘সোমবার পরীক্ষা দিয়ে অসুস্থ হয়েছে কিছু শিশু, কিছু শিক্ষার্থী প্রথম দিনেই রোদে বাইরে বসে পরীক্ষা দিতে হবে এজন্য পরীক্ষা দেয়নি। কালকের পর আজ মঙ্গলবার ভয়ে আরও কিছু শিশু স্কুলে আসেনি। যারা অসুস্থ হয়েছে তাদের মুখের দিকে তাকালে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না।’ তিনি জানালেন, শারমিন আক্তার নামের তাদের ৫ম শ্রেণির একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বাইরে পরীক্ষা দিতে হবে বলে পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। তারা চিন্তিত তাদের স্কুলটির এখন কী হবে?
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন,‘মংলার গাঁও, তেগাঙা, পশ্চিম নৈনগাঁও, নৈনগাঁও কান্দিপাড়া এই চার এলাকায় কোন স্কুল নেই। ৮ কিলোমিটার এলাকার মধ্যখানে এই বেসরকারী স্কুলটি প্রায় ১১ বছরের চেষ্টায় কিছু মানুষ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এক নিমিষেই কলেজ অধ্যক্ষ সাহেব স্কুলটি বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন। দলিল দেখে আমরা জানতে পেরেছি এই স্কুলের জমি মংলারগাঁওয়ের সারদা কান্তি দাস ১৯৯৪ সালে মহাপরিচালক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নামে রেজিস্ট্রি দানপত্র দলিল (নম্বর ৪৬৩৪/ ৯৪) করে দিয়েছিলেন। দানপত্র করার পর এই জমির মালিক তিনি আর থাকেন না। তিনি পরে আবার ১৯৯৮ সালে এই জমি কীভাবে কলেজ অধ্যক্ষকে দানপত্র রেজিস্ট্রি করে দেন এটি আমাদের প্রশ্ন।
মংলারগাঁওয়ের সাবেক ইউপি সদস্য তাজুল ইসলাম বলেন,‘মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিও বর্তমানে কলেজের দখলে, কলেজের নিজস্ব ভূমিও আছে। অর্পিত জমির ১১৫ শতাংশও কলেজের দখলে। এতো জমি কলেজের থাকার পরও স্কুলকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এটি কার স্বার্থে হচ্ছে? এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তাহলে জমি না থাকায় বন্ধ হয়ে যাবে। এটি কেউই মানবে না।’
স্থানীয় সমাজকর্মী মাসুক মিয়া বলেন,‘প্রাইমারী স্কুল থেকে পড়াশুনা করেই শিক্ষার্থীরা কলেজে পড়বে। এখন ৪ গ্রামের একটি প্রাইমারী স্কুল এভাবে একগুয়েমির জন্য বন্ধ হতে পারে না।’
স্থানীয় একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক (নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেছেন) বলেন,‘দোয়ারাবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সাহেব কলেজেরও অধ্যক্ষ, স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাও। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়বেন। তাঁর আচরণে একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া কোন ভাবেই কাম্য নয়।’
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার দাস বলেন,‘ মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোমবার বিকালে এসে জমি বন্দোবস্তের আবেদন প্রত্যাহার করেছেন। কেন করেছেন সেটি বলেননি। ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আমরা যে ঘরে স্কুল চলছিল সেখানে প্রবেশ করার ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলে দিয়েছি। ভূমি নিয়ে জটিলতা আদালতে সমাধান হবে বলেও জানিয়েছি। আমরা বলেছি স্কুলটি যাতে চালু থাকে। এই ব্যাপারে যেন সকলে সতর্ক থাকেন।’ একই জমি দুইবার কীভাবে দানপত্র রেজিস্ট্রেশন হলো ? এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘এর জবাব রেজিস্ট্রারকেই দিতে হবে।’
কলেজ অধ্যক্ষ একরামুল হক বলেন,‘ওখানে কখনই স্কুল ছিল না। কিছুদিন হয় কিছু শিক্ষার্থীকে নিয়ে আমাদের একটি কক্ষ ব্যবহার করছে ৪ জন শিক্ষক। কলেজ পরিচালনা কমিটিকে না জানিয়ে তাদের এই ঘরটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলাম। এরমধ্যেই আমাদের বন্দোবস্তকৃত অর্পিত জমি বন্দোবস্তের জন্য তারা আবেদন করায় আমরা তাদেরকে ঘর ছাড়ার জন্য বলেছি। এখন তারা বন্দোবস্তের আবেদন প্রত্যাহার করেছে এবং আমাদের ঘরটি ব্যবহারের আবেদন করেছে, আমরা পরিচালনা কমিটির সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব কী করা যায়। আপাতত জেলা প্রশাসক ঘরটি ব্যবহারের সুযোগ দেবার জন্য বলায় খুলে দেওয়া হয়েছে।’ কলেজের প্রচুর জমি রয়েছে, স্কুলটাকে মানবিক বিবেচনায় রক্ষা করা যায় কী-না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে জমি আছে তার সবটুকুই এক সময় এই কলেজের লাগবে।
জেলা প্রশাসক মো: সাবিরুল ইসলাম মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন, ‘যেহেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সরকারি ভূমি ব্যবহার করছে সেহেতু তারা আবেদন করলে গণকল্যাণের জন্য এবং প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করা হবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন বালা বলেন,‘সোমবার এই স্কুলের সমস্যা নিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমাকে জানান। ১৯৯৪ সালে স্কুলটি চালু হয়। মাঝখানে বন্ধ ছিল। ২০০৭ সাল থেকে চলছে। এখন বিদ্যালয়টি আমাদের না হলেও শিক্ষার্থী আমাদের। ১৬২ জন শিক্ষার্থী গতকাল মাঠে পরীক্ষা দিচ্ছে জেনে ইউএনও সাহেবকে বলেছি এরা যাতে পরীক্ষা দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করার জন্য। স্কুলের জমি একবার দানপত্র রেজিস্ট্রি করে আবার কীভাবে রেজিস্ট্রি হলো, সেটিও দেখার বিষয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অ্যাসিল্যা- সেটি দেখবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন।’
প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের বিভাগীয় উপ-পরিচালক তাহমিনা খাতুন বলেন,‘এই বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কিছুই জানাননি, এজন্য আমার পক্ষে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
প্রসঙ্গত. ১৯৯৪ সালে মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে ৩৩ শতক জমি দানপত্র রেজিস্ট্রি করে দেন একই গ্রামের ঠাকুর চান দাসের ছেলে সারদা কান্তি দাস। প্রায় ৩ বছর পাঠদানের পর বিদ্যালয়টি ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়। ঘর না থাকায় পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ থাকে। এসময় ঐ বিদ্যালয়ের জমি খালি থাকায় ঐ জমিতেই দোয়ারাবাজার ডিগ্রি কলেজের ৪ তলা ভবন হয়। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে দোয়ারাবাজার কলেজের টিনশেড ঘরটি। ২০০৭ সালে আবার দোয়ারাবাজার কলেজের পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। সম্প্রতি, মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারেন সারদা কান্তি দাস বিদ্যালয়ের যে জমি দানপত্র করে দিয়েছিলেন সেটি পরবর্তী সময়ে কলেজকে আবারও দানপত্র করে দিয়েছেন। বিষয়টি জেনে স্কুল কর্তৃপক্ষ দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যান । দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জানান, মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে। ওখানে ১১৫ শতক জমি রয়েছে। এই সংবাদ জেনে গত ১৭ এপ্রিল বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য জমি বন্দোবস্তের আবেদন করেন। বিষয়টি জেনে দোয়ারাবাজার কলেজের অধ্যক্ষ ক্ষিপ্ত হন। তিনি ঐ দিনই মংলারগাও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড খুলে ঐ ঘরে তালা ঝুলিয়ে রাখেন। সোমবার বিদ্যালয়ের প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের ১৬২ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত হলে কলেজ অধ্যক্ষ একরামুল হক শিক্ষার্থীদের ঘরে ঢুকতে দেননি। পরে প্রখর রোদে খোলা আকাশের নীচে পরীক্ষা দিয়েছে শিশু শিক্ষার্থীরা। এসময় বিদ্যালয়ের অনেক শিশু শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে।