স্থানীয়রা বললেন অহরহ দুর্নীতি করছেন তিনি

বিশেষ প্রতিনিধি
দোয়ারাবাজার উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) ফয়সল আহমদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠেছে। তবে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, সে সরকারি সম্পদ লুটপাটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে নানা কথা তুলেছে। এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। সংসদ সদস্য জানালেন, কিছু অভিযোগের সত্যতা আছে। কিছু অভিযোগের প্রমাণ নেই।
উপহারের ঘরের জন্য এক দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে এসিল্যান্ডের নাম ভাঙিয়ে টাকা আনার অভিযোগ করায় মঙ্গলবার অভিযোগকারী ও তার শ^শুরকে পুলিশে দিয়েছিলেন তিনি। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ এলাকার জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে ছাড়া পায় নিরীহ ওই দুই ব্যক্তি।
উপহারের ঘর দেবার কথা বলে এক মধ্যস্বত্বভোগী ২০ হাজার টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গাপাড়া গ্রামের আরফান আলী। একদিনের মধ্যেই মঙ্গলবার তদন্ত সম্পন্ন করে উল্টো অভিযোগকারীকেই শাসিয়ে দিয়েছেন এসিল্যান্ড।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘর আরফান আলী পেয়েছেন জানিয়ে একই গ্রামের মানিক উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সল আহমদ ও পিআইও আম্বিয়া আহমদের নাম ভাঙিয়ে ২০ হাজার টাকা নেয়। আরফান আলী পরে জানতে পারেন এই ঘরের জন্য কোন টাকা দেওয়া লাগে না। প্রধানমন্ত্রী ভিটে বাড়ীহীনদের ঘর উপহার হিসাবে দিয়েছেন। এই ঘর দেবার ক্ষমতাও মানিকের নেই। তিনি মানিককে টাকা ফেরতের জন্য চাপ দেন। মানিক তাকে জানায়, টাকা ফেরত নিলে ঘর পাবে না, ঘর পেলে টাকা পাবে না। এই ঘটনা জানিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে আরফান আলী লিখিত অভিযোগ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে ওই সময়েই আসেন এসিল্যান্ড। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগের কপি দিয়ে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন এসিল্যান্ডকে। এসিল্যান্ড মঙ্গলবার বিকালেই দুই পক্ষকে ডাকেন। এসিল্যান্ডের সামনে এসেও ২০ হাজার টাকা নেবার কথা জানান আরফান আলী। এসিল্যান্ড এক পর্যায়ে আরফান আলীকে ধমকাতে থাকেন। এক পর্যায়ে আরফান আলী ও তার শ^শুর আব্দুল মালেককে পুলিশের কাছে সমঝে দেন এসিল্যান্ড।
শেষে স্থানীয় গণ্যমান্যদের দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় আরফান আলী ও তার শ^শুর আব্দুল মালেক ছাড়া পান।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি দেবদুলাল ধর বললেন, উপহারের ঘর দেবার কথা বলে এক ব্যক্তি আরফান আলীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়েছিল বলে অভিযোগ হয়েছিল। এসিল্যান্ড বিষয়টি মঙ্গলবার বিকালেই তদন্ত করেন। এসময় তিনি বুঝতে পারেন অভিযোগ সত্য নয়। পরে আরফান আলী ও তার শ^শুরকে থানায় দেন। এ ঘটনায় যার বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়েছিল, সে থানায় মামলা দায়ের করার কথা ছিল। কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত সে মামলা দেয় নি। এক পর্যায়ে মামলা করবে না বলে জানায়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে মুছলেখা নিয়ে দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ প্রসঙ্গে আরফান আলী সাংবাদিকদের বললেন, আমার কাছ থেকে টাকা নেবার বিষয়টি সত্য আমি জানিয়েছি। এরপরও আমাকে পুলিশে দেওয়া হয়। পরে চেয়ারম্যান, মেম্বার সাহেবরা আমাদের ছাড়িয়ে আনেন।
আরফান আলীর এই ঘটনা কেবল নয়। দোয়ারাবাজারে শিশু পার্ক করার কথা বলে স্থানীয় ধনাঢ্যদের কাছ থেকে এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বড় অংকের টাকা নেবার অভিযোগ স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছেও করেছিলেন এলাকাবাসী।
উপজেলার নরসিংহপুরের জব্বার মিয়া জানিয়েছেন, তাঁর ছেলের পাথর জব্দ করার পর তারাই তিন লাখ ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে নিলাম গ্রহণ করেন। পরে তাদেরকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকার রশিদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ জব্বার মিয়া তিন লাখ ত্রিশ হাজার টাকা দিলেও সরকারি কোষাগারে জমা হয় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। এই বিষয়টি জব্বার মিয়া সংসদ সদস্যকে অবিহিত করেছেন বলে জানান।
বাঁশতলায় অবৈধ পাথর জব্দ করে এধরণের ঘটনা ঘটেছে বলে এলাকায় অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটির সদস্য নরসিংহপুরের চাইরগাঁওয়ের মতছিন আলী মাস্টার বললেন, এসিল্যান্ডের অনিয়মের দুর্নীতির বিষয়ে এলাকায় আসলে সবাই বলবেন। পাথর জব্দ করা আর উৎকোচ নিয়ে ছাড়াই তার কাজ। এলাকার সবাই এই বিষয়ে জানেন।
নরসিংহপুরের জব্বার মিয়া জানালেন, এসিল্যান্ডের অনিয়মের বিষয়ে প্রতিবাদ করায়, তার ছেলেদের শাসিয়ে যান তিনি। পরে তার বোনের জামাই বীর মুক্তিযোদ্ধার (মৃত আশরাফ আলী) বীর নিবাস সরকারি জমিতে পড়েছে জানিয়ে ভাঙতে আসেন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে পিছু হটেন তিনি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আমিরুল ইসলাম বললেন, কয়েক মাস আগে খাসিয়ামারা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ করেছিলাম। কোন লাভ হয় নি। তিনি কোন পদক্ষেপ নেন নি। ওখান থেকে বড় অংকের টাকা তিনি নিয়েছেন বলেও অভিযোগ ছিল।
উপজেলার মান্নারগাঁওয়ের আজমপুরের উপহারের ৩৯ টি ঘর নির্মাণের সময় নীচের বিমে রড না দেওয়ায় গত ১৩ আগস্ট পাঁচটি ঘর ভাঙা হয়। ২৭ আগস্ট ভাঙা হয় আরও দুটি। স্থানীয় লোকজন এসব ঘর নির্মাণে অনিয়ম হচ্ছে জানানোয়, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান সহ তিনজনকে আটকও করেছিলেন এসিল্যান্ড। এখানেও স্থানীয় লোকজন রুখে দাঁড়ানোয় এদেরকে ছাড়তে হয়। এই উপহারের ঘর নির্মাণ করে দেবার জন্য তাজির উদ্দিন নামের এক ঠিকাদারের সঙ্গে অন্যায়ভাবে মৌখিক চুক্তি করে আর্থিকভাবে লাভবান হবার চেষ্টা ছিল বলে এলাকায় অভিযোগ আছে।
এসিল্যান্ড ফয়সল আহমদকে এই বিষয়ে জানার জন্য বৃহস্পতিবার কয়েক দফায় ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি। বুধবার সন্ধ্যায় অবশ্য তিনি ফোন রিসিভ করে প্রথম বললেন, আরফান আলীর অভিযোগ ছিল উপহারের ঘর দেবার কথা বলে আমরা নাকি টাকা পয়সা আত্মসাৎ করেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্তের জন্য আমাকে দেন। আমি কিছুক্ষণ পরই এই বিষয়ে শুনানী নিয়েছি। তদন্তের সময় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় নি। আমি রিপোর্ট দিয়েছি। এর বেশি কিছুই হয় নি বলে জানালেন এসিল্যান্ড ফয়সল আহমদ। পরে অবশ্য আরেকবার তিনি জানালেন, আমরা নয় আমাদের নাম ভাঙিয়ে টাকা আদায় করার অভিযোগ হয়েছিল। অন্যান্য বিষয়ে জানার জন্য বৃহস্পতিবার একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে ফোন ধরার অনুরোধ করলেও তিনি সাড়া দেন নি।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা প্রিয়াংকা বললেন, এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ লিখিত আকারে পেলে এবং অভিযোগ সত্য হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, দোয়ারাবাজারের এসিল্যান্ড সরকারি বালু-পাথর মহাল রক্ষায় তৎপর হওয়ায় একটি মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। তার সততা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই পর্যন্ত তার সকল উদ্যোগ ছিল সরকারি সম্পদ রক্ষার পক্ষে। আজমপুরের উপহারের ঘর নির্মাণে অনিয়মের খবর পেয়ে সেই ঘটনাস্থলে আগে গিয়ে ঘর ভাঙার উদ্যোগ নেয়।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বললেন, দোয়ারাবাজারের এসিল্যান্ড নতুন যোগদান করেছেন। ওকানকার শিশু পার্ক নির্মাণের সময় তার বিরুদ্ধে কিছু কথা ওঠেছিল। আমি এবং জেলা প্রশাসক তাকে সতর্ক করেছি। অন্যান্য অভিযোগের কোন প্রমাণ নেই।