স্থানীয় সরকারের সেবায় সন্তুষ্ট নয় জনগণ, ক্ষমতায়ন ও দক্ষতা বাড়াতে উদ্যোগ নিন

স্থানীয় সরকারের সেবা থেকে ৪৭ শতাংশ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। যদিও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, অবকাঠামোসহ নানা ধরনের সুবিধা শতভাগ নাগরিকের পাওয়ার কথা। যারা এসব সুবিধা ভোগ করছে, তাদের আবার ৩৮ শতাংশ সন্তুষ্ট নয়। গুণগত মান, অর্থায়ন ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটিতে তারা অসন্তুষ্ট। বিশ্বব্যাংক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) যৌথ গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। স্থানীয় সরকারের সঙ্গে এ দেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ যুক্ত থাকলেও স্থানীয় সরকারের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদগুলো শক্তিশালী নয়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় রয়েছে নানা জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্পদের সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের অভাব, জনগণের কাছে সঠিক সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাব, বাজেট ব্যবস্থাপনার অভাব ইত্যাদি। স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট (বিভাগ অথবা জেলা) গঠন ও কার্যকর করার ওপর জোর না দিয়ে মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে উপজেলার ওপর অতিমাত্রায় জোর দিতে গিয়েও ইউনিয়নকে অবহেলিত ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের চেয়ারম্যানরা তাদের কোনো কাজকেই নিজের মনে করেন না। কেন্দ্রীয় সরকার এবং তার প্রতিনিধিদের দিকে তাকিয়ে থাকেন তারা। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, আজ যদি স্থানীয় সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণ কিংবা যথার্থ স্বায়ত্তশাসিত করা হতো, তাহলে ওইসব কাজ তারা নিজেদের মতো করে রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা বাস্তবায়ন করতেন। এতে সেবার মানও বাড়ত। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, বাজেটে দেয়া বরাদ্দ ও সুবিধাগুলো সময়মতো পৌঁছাতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এটি করছে। অথচ বাংলাদেশে জনগণের গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এজন্য বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো কেন্দ্রীভূত থাকে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোর আর্থিক সচ্ছলতা নেই। তাদের কর আদায় বাড়ানোরও সক্ষমতা নেই। এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে ইউনিয়নগুলোয় নতুন পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ইউনিয়ন পরিষদগুলো জনগণকে সেবা দিতে পারবে। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে হলে চারটি বিষয় জরুরি। এগুলো হলো, সরকারের সদিচ্ছা, জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং আর্থিকভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থ করা।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন অনুযায়ী যে কাজগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর করার কথা, তা আদৌ করা হচ্ছে কিনা, এটিও সরকার দেখে না। তাছাড়া কাজগুলো করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক সামর্থ্য গড়ে তোলার কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয়নি। পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষার মতো সরকারের সেবাদানকারী বিভাগগুলোর সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলো নিজেদের মতো পরিকল্পনা তৈরি করে তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে। এসব পরিকল্পনা তৈরিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা না থাকায় কার্যকর সুফল দেয় না।
স্থানীয় কর তাই স্থানীয় সরকারের রাজস্ব আয়ের একমাত্র উৎস। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী পরিষদগুলো পর্যাপ্ত কর আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিপত্তিতে পড়ছে স্থানীয় সরকারগুলো। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে স্থানীয় সরকারকে আরো শক্তিশালী করা হবে। স্থানীয় সরকারগুলোর স্তর পুনর্বিন্যাস করে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনা তাদের হাতে দেয়া হবে। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ইশতেহারে স্থানীয় সরকার গুরুত্ব পেয়েছে। একটি বিশেষ অঙ্গীকারের শিরোনাম ‘আমার গ্রাম, আমার শহর: প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ’। এর আওতায় যাতায়াত-যোগাযোগ, সুপেয় পানি, সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এগুলো করতে হলে স্থানীয় সরকারকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।