স্বস্তিতেই শেষ হলো ভোট

বিজয় রায় ও আশিক মিয়া
দ্বিতীয় ধাপে ছাতক ও দোয়ারা উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ১৪ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের গলার কাঁটা হিসেবে মাঠে ছিলো এক বা একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী। তবে দোয়ারাবাজার সদর, বোগলাবাজার ও সুরমা ইউনিয়ন এবং ছাতক উপজেলার চরমহল্লা, ইসলামপুর ইউনিয়নে কোন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল না।
ছাতকের ১০ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। মাত্র ৪ ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। বাকী ৭টির মধ্যে বিদ্রোহী ৩, বিএনপি ২ এবং ১টি ইউনিয়নে জামায়েত সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। ছাতকের ১০ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৫১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই আওয়ামীলীগের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় নৌকার প্রার্থীদের এমন ভরাডুবি হয়েছে। কোন-কোন ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীদের অবস্থান ছিল ৩য় স্থানে। বিগত নির্বাচনে উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের ৯ ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী, ৩ ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এবং ১ ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন।
চলতি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১ম দফায় ৩ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে ২টিতে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী এবং ১ ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়।
১১ নভেম্বর ২য় দফা ইউপি নির্বাচনে ছাতক সদর ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম (আনারস) ৩ হাজার ১৪৩ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী রঞ্জন কুমার দাস (নৌকা) পেয়েছেন ২ হাজার ৭৪৩ ভোট।
খুরমা উত্তর ইউনিয়নে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান বিল্লাল আহমদ (নৌকা) ৪ হাজার ৬৩৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এ নিয়ে তিনি টানা ৩য় বারের মতো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি শামছুল ইসলাম খাঁ (আনারস) পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৭৯ ভোট।
কালারুকা ইউনিয়নে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান অদুদ আলম (নৌকা) ৯ হাজার ৭৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আশরাফুল আলম (আনারস) পেয়েছেন ৬ হাজার ৪২৭ ভোট।
ছৈলা-আফজলাবাদ ইউনিয়নে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী গয়াছ আহমদ (নৌকা) ৬ হাজার ৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। এ ইউনিয়নে তার নিকতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন নানু মিয়া পেয়েছেন ৫ হাজার ২০ ভোট।


জাউয়াবাজার ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান মেম্বার আব্দুল হক (ঘোড়া) ৩ হাজার ৭২৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী নূরুল ইসলাম (নৌকা) পেয়েছেন ২ হাজার ৭৫৬ ভোট।
গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও ইউনিয়নে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক চেয়ারম্যান সুন্দর আলী। তিনি পেয়েছেন ৫৪২৬ ভোট। তার নিকতম হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী আখলাকুর রহমান (আনারস) পেয়েছেন ৪৫৩২ ভোট।
ইসলাপুর ইউনিয়নে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক চেয়ারম্যান জামায়েত নেতা অ্যাড. সুফী আলম সুহেল (টেলিফোন)। তার প্রাপ্ত ভোট হলে ৫ হাজার ৫৭০। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি মাওলানা আকিক হোসাইন(চশমা) পেয়েছেন ৪ হাজার ৪৭৬ ভোট।
চরমহল্লা ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আবুল হাসনাত (মোটরসাইকেল) বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা কদর মিয়া (নৌকা)।
দোলারবাজার ইউনিয়নে বিএনপি নেতা নূরুল আলম (চশমা) বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আমির উদ্দিন (মোটরসাইকেল) ছিলেন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি।
এ ছাড়া দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী আবু বকর (ঘোড়া) ২৮২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জয়নাল আবেদীন (টেলিফোন) ২৭৭৪ ভোট পেয়েছেন। এসব নির্বাচনী ফলাফল উপজেলা সম্মেলন কক্ষ এবং স্ব স্ব রিটানিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।


এদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলা সদর ইউনিয়নে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল হামিদ। তিনি পেয়েছেন ৬৫১১ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি বর্তমান চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপি নেতা) এমএ বারী পেয়েছেন ৪২২২ ভোট।
বোগলাবাজার ইউনিয়নে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মিলন খান। তিনি পেয়েছেন ৫২১৯ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির সমর্থিত আরিফুর ইসলাম জুয়েল পেয়েছেন ৩২৪৮ ভোট।
সুরমা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এমএ হালিম বীরপ্রতীক। তিনি পেয়েছেন ৫৪৪৫ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপি নেতা) হারুন অর রশীদ পেয়েছেন ৫০১৯ ভোট।
লক্ষীপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছেন জহিরুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ৬৪৬৮ ভোট। বিদ্রোহী প্রার্থী, বর্তমান চেয়ারম্যান আমীরুল হক পেয়েছেন ৪০১০ ভোট।
বাংলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন আ.লীগের বিদ্রোহী এম আবুল হোসেন। তিনি পেয়েছেন ৯৩১৭ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি বর্তমান চেয়ারম্যান জসিম আহমদ চৌধুরী পেয়েছেন ৪১৫৯ ভোট।
মান্নারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপি নেতা) ইজ্জত আলী। তিনি পেয়েছেন ৪৯১৭ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগের মনোনীত অসিত কুমার দাস পেয়েছেন ৩৬০২ ভোট।
পান্ডারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল ওয়াহিদ। তিনি পেয়েছেন ৪০০৯ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী (বিএনপি নেতা) ওলিউর রহমান পেয়েছেন ৩৭৪৯ ভোট।
দোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন শামীমুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ৫৬০৭ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী নুর মিয়া পেয়েছেন ৪২৪৯ ভোট।
নরসিংহপুর ইউনিয়নে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান নূর উদ্দিন আহমদ। তিনি পেয়েছেন ৪৬৩৪ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী সামছুল হক নমু পেয়েছেন ৪৬১২ ভোট।
ছাতক উপজেলায় ১০টি ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৯টি ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। চলে একটানা বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ১টি ইউপিতে (দোয়ারাবাজার সদর) ভোটগ্রহণ করা হয় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে। অন্য ১৮টি ইউপিতে ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হয়।
ছাতক উপজেলায় ১০৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ছাতকের প্রতিটি কেন্দ্রেই নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটার ছিলেন প্রায় ১ লক্ষ ৮৬ হাজার। গড়ে শতকরা ৭০ ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রে নিয়োজিত প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা। জাউয়াবাজার ইউনিয়নের কপলা, জাতুয়া এবং মুক্তিরগাঁও কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন সংর্ঘষের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। তবে কোন কেন্দ্রই বন্ধ ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়েজুর রহমান।
এদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন পরিষদের ৮২টি ভোট কেন্দ্র গ্রহণ করা হয়। এসব কেন্দ্রে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭ জন। এরমধ্যে মহিলা ভোটার সংখ্যা ৮৩ হাজার ৫৫৬ জন, পুরুষ ভোটার ৮৫ হাজার ৫৪০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ছিলেন ১ জন।
নির্বাচনে সুষ্ট ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রনে রাখতে ৪ স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়। ভোটগ্রহণ উপলক্ষে কেন্দ্র পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন ২০ জনের ফোর্স। প্রতিটি কেন্দ্রেই পুলিশ ও আনসার বাহিনীর পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি, স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং পুলিশের বিশেষ টিম টহল দিতে দেখা গেছে। নির্বাচনী অপরাধের বিচার ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন বিচারিক ও নির্বাহী হাকিম। এছাড়াও পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র‌্যাব ও স্ট্রাইকিং ফোর্স দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয় ধাপে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক ও দোয়ারাবার উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে সুনামগঞ্জে ৯২ জন। দোয়ারাবাজার উপজেলার ৯ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪১ এবং ছাতক উপজেলার ৫১ জন প্রার্থী। সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য পদে ২১৩ এবং সাধারণ ওয়ার্ডে সদস্য পদে সুনামগঞ্জে ১৭৪ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।