স্বাগত ১৪২৫ বঙ্গাব্দ- সার্বজনিন মঙ্গলই হোক এই দিনের কামনা

হাওরের জন্য দুঃখের ১৪২৪ বাংলা সনটি গতকাল বিদায় নিয়েছে। আজকের সূর্যোদয়ে নতুন বছর, নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন। ১৪২৪ বাংলা সনের ১ বৈশাখ তারিখটি ছিল হাওরের কৃষকের চোখের অশ্রুভেজা। সেদিন হাওর সোনালী ধানের শীষ বাতাসে দোল খাওয়ার পরিবর্তে থৈ থৈ পানিতে ভাসমান ছিল। সর্বনাশা পানি সেবছর কচি ধানগাছ সমেত পুরো হাওর ডুবিয়ে ফসল হারা করে দিয়েছিল হাওরবাসীকে। সেই দুঃখ নিদারুণ সংগ্রাম কাতরতার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে উঠেছে সংগ্রামী কৃষক কূল। এক বছর পর আবার আজকের দিনটি ১ বৈশাখ। এবার আবহাওয়া অনুকূল রয়েছে। হাওরের কিছু অংশে ব্লাস্ট ভাইরাসের আক্রমণ ভিন্ন বোরো ফসলের জন্য আর কোন হুমকি দেখা যায়নি। স্বভাবতই এই সনপয়লা দিনটি হাওরের কৃষকের জন্য সত্যিকার আনন্দদায়ক হয়ে উঠার জন্য একটি আদর্শস্বরূপ। কৃষকের মুখে আজ যেহেতু হাসি রয়েছে সেহেতু বাংলা পঞ্জিকার নতুন বছরটিও আজ উদ্ভাসিত। তাই কৃষকের মুখের সন্তোষ ভরা তৃপ্তি দিয়ে আমরা স্বাগত জানাই বাংলা নতুন বছরকে। স্বাগত ১৪২৫ বাংলা সন।
সদা প্রবহমান সময় এক লহমার জন্য থেমে থাকে না। সময়ের ধর্ম সামনে এগিয়ে চলা। সব পুরাতনকে পিছনে ফেলে সামনের দিকে তার গতি। সামনে যে গতি তাকেই বলে অগ্রগতি। সময়ের এই অগ্রগতিকে সঠিকভাবে আত্মস্থ করলে মানব জাতি কখনও স্থবির বা পিছিয়ে পড়তে পারে না। কিন্তু আমরা সময়ের চরিত্রকে মানব জাতির জন্য ধারণ না করে নিজেদের জন্য নিজেদের মত করে ধারণ করি। ফলে মানুষে মানুষে আজ এত বিভেদ এত বৈষম্য এত বিচ্ছিন্নতা। আজ হয়তো কেউ আড়াই হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ মাছ কিনে শখের পান্তা ইলিশ খাবেন, আবার হয়ত কোন কৃষক বধূ ভোর বিহান বেলা আগের রাতের পানি ভাত শানকিতে তুলে কৃষক স্বামীর পাতে দিবেন। লবণ আর কাঁচামরিচ দিয়ে সেই ভাত খেয়ে কৃষকটি জমিতে ছুটবেন পাকা ধান কাটার জন্য। মূলত বৈশাখি সংস্কৃতি বলতে আজ নগরে যে সংস্কৃতি আমরা দেখছি তার সাথে বৃহত্তর বাঙালি জীবনের তেমন কোন সম্পর্ক নেই। আসল কথা হলো সমাজে যখন দৃষ্টিকটু অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান থাকবে তখন সামজিক সংস্কৃতিও বিভাজিত হতে বাধ্য। এই বিভাজনের প্রকটতা দেখা যাবে আজ বেশ বড় আকারেই।
নতুন বছর মানেই পুরাতন হিসাব মিলানো আর নতুন হিসাব খোলার দিন। বছর হিসাব করার এই পদ্ধতির আবির্ভাবও এই কারণেই। আজ যদি বৃহত্তর জনসমষ্টি নিজেদের অধিকারের হিসাব মিলাতে বসেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই হুছট খাবেন ‘না মেলার পাহাড়ে’। এই হিসাব মিলানোটা যদি সার্বজনিন মঙ্গলার্থে করার মতো সামাজিক বাস্তবতা গড়ে উঠত তাহলেই কেবল নববর্ষের দিনটি ভিন্ন মাত্রার ব্যঞ্জনায় রঙে ভরে উঠত। মানুষ যেহেতু সৃষ্টি জগতের একমাত্র সৃজনশীল প্রাণী, এবং এই মানুষ নিরন্তর নিজেকে নিজের চারপাশকে পরিবর্তনে সক্ষম হয়েছে, তাই মানবিক সৃজনশীলতার উপর আস্থা রেখেই আমরা ভাবতে চাই, একদিন সেই নববর্ষ আসবে যেদিন সামাজিক সাম্যে দিনটি মুখরিত হবে। সেই শুভদিনের প্রত্যাশায় সকলকে শুভ নববর্ষ।