স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা

মনোরঞ্জন তালুকদার
৪৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন নানা কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা এমন এক সময় আমাদের ৪৯ তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছি যখন জাতি যুগপৎ আনন্দ-আতংকের এক অভিনব মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে আছে। একদিকে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের আনন্দ অন্যদিকে করোনাভাইরাসের আতংক। এই প্রেক্ষিতে ৪৯ তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন আমাদের মগ্নচৈতন্যে নানা রকম ভাবনার জাল বিস্তার করে।
স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু চেতনাবোধের জায়গা থেকে একই সূত্রে গ্রথিত। বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন বাঙালির রেঁনেসা পুরুষ। বঙ্গবন্ধু কেন বাঙালির রেঁনেসা পুরুষ তা বুঝতে হলে আমাদের জানা কিছু বিষয়ের নুতন করে রাজনৈতিক পোস্টমর্টেম করতে হবে।
প্রথমতঃ বাংলাদেশ দুটো বিচ্ছিন্নতার ফসল। বাঙালির এমন একটি জাতি যারা পঁচিশ বছরের মধ্যে দু’বার জাতিসত্বার পরিবর্তন করেছে। অথচ মুসলিম শাসনের আগ পর্যন্ত বাঙালির অধিকাংশ সময় বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র বাংলায় বিভক্ত ছিল। বাংলার মধ্যযুগীয় ধর্মমঙ্গল সাহিত্যে দ্বাদশ বাংলার উল্লেখ বার বার পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাঙালির নিজেরা অধিকাংশ সময় বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। মুসলমান শাসন আমলে প্রথম বাঙালির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সমূহ আস্তে আস্তে একজন শাসকের অধীনে আসে কিন্তু তারা একক জাতি সত্বায় পরিণত হয়নি। ইংরেজ শাসনামলেও এই ধারাবাহিকতা অনেকদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ সাধিত হলেও বাঙালি জাতীয়তা বাদের বিকাশ না হয়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিকাশ সাধিত হয়। পরবর্তীতে বাঙালি জাতি হিসেবে তার অভিযাত্রা শুরু হয় ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। যদিও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন উত্তর ৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬ ছয়দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ অনেকটাই বিকশিত হয়েছিল কিন্তু পরিপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করেছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতেই পারে। কারণ ৭০ এর নির্বাচনে ২৩.৮% ভোট পাকিস্তানের পক্ষে পড়েছিল অর্থাৎ ঐ ভোটাররা ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদের পক্ষে। বাংগালী হিসেবে শত বঞ্চনার মধ্যেও তাদের পাকিস্তান প্রীতি অটুট ছিল। এতক্ষনে নিশ্চয়ই এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ভৌগোলিক বা ধর্মীয় কোন জাতীয়তাবাদেই আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম না। তবুও ১৯৭১ সালে আমরা একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হই। আর এখানেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির রেনেসাঁ পুরুষ।
আগেই উল্লেখ করেছি বাংলাদেশ দুদুটো বিচ্ছিন্নতার ফসল তবে দুটোর মূলগত চেতনা ভিন্ন হলেও প্রত্যাশা ছিল এক। চেতনাগত পার্থক্য হচ্ছে মুসলিম জাতীয়তাবাকে দূরে ঠেলে বাংগালী জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা আর প্রত্যাশার অভিন্নতা হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি। উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বাঙালি সব সময়ই এক অস্থিতিশীল জাতি। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন, বাংলাদেশ স্ববিরোধীতার চ্যালেঞ্জে ভরা একটি দেশ। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে নানা জন নানা ভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলেও উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমাদের স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় দক্ষিণ এশিয়ার জাতীয়তাবাদের প্রচলিত ধ্যান ধারণার সাথে মোটেও মিলে না। দক্ষিন এশিয়ার এক জাতি তত্ত্বের সমর্থনকারী ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের ছকেও যেমন তা পড়েনা তেমনি দ্বিজাতিতত্ত্বে বর্ণিত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সাথেও তা খাপ খায় না। মন্ত্রী মিশনের তিন রাষ্ট্রের পরিকল্পনা অপেক্ষা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে সৃষ্ট পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানরা যেমন অংশগ্রহণ করে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় তেমনি আবার মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনাকে পিছনে ফেলে বাঙালি জাতীয়তাবাদে প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ। সবচে মজার বিষয় হচ্ছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রবল জোয়ারের মুখেও কিছু বাঙালি হিন্দু মুসললিম অখন্ড বাংলার যে আন্দোলন করেছিলেন তা কোন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেই সমর্থন পায়নি।
অর্থাৎ ভূখন্ড ও ভাষা ভিত্তিক ঐক্য থাকা সত্যে বাঙালি অখন্ড বাংলার আন্দোলন বা মন্ত্রীমিশন পরিকল্পনায় বাংলা ও আসামকে নিয়ে যে রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল তা সর্বাত্মক ভাবে সমর্থন না করে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান আন্দোলন কে সমর্থন করে। অর্থাৎ ভূখন্ড ও ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তার বিপরীতে কেবল মাত্র ধর্মভিত্তিক জাতীয়তায় বাঙালি পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, একই ভুখন্ড, একই ভাষা ও একই ধর্ম থাকা সত্বেও আরবরা ১৯টি রাষ্ট্রে বিভক্ত। বাঙালির আবেগের কাছে এই বাস্তবতাও পরাজিত হয়। তাই পাকিস্তানের ভাঙ্গন ও বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল অনিবার্য। পাকিস্তানের অংশ হওয়া যেমন বাঙালির জন্য এক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা তেমনি বাংলাদেশের অভ্যুদয় হলো সেই ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার সংশোধন। আর এই সংশোধনের নেতৃত্ব দানকারী মহানায়ক হচ্ছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
জাতিসত্বার ধারনাটি একটি আধুনিক ধারনা। ১৮৫০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে জাতিরাষ্ট্র ছিল মাত্র ৩৮ টি। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ব্যাপকতা অর্জন করে। আর সেই সময়ই বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতি ধারণার বীজটি বপন করেন। যিনি একটি ঘুমন্ত জাতিকে দ্রোহের চেতনায় উদ্ভাসিত করে স্বদেশ অন্বেষণে অনুপ্রাণিত করেন এবং তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার রূপরেখা পাওয়া যায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এবং মূল সংবিধানের মূল নীতিতে।
আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে বলা হয়েছে,
‘…….বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি….’
অর্থাৎ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ হবে প্রজাতন্ত্র আর রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হবে নাগরিকের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সমস্ত রকম অসাম্যের অবসান।
অন্যদিকে আমাদের ১৯৭২ সালের সংবিধানে মূল নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, ১. গণতন্ত্র ২. সমাজতন্ত্র ৩. ধর্মনিরপেক্ষতা ৪. জাতীয়তাবাদ।
সিরাজুল আলম খান ৭২ এর সংবিধানের এই মূলনীতিকে মুজিববাদ বলে ঘোষনা করেছিলেন।
আপাত দৃষ্টিতে এই মূল নীতিগুলোকে পরস্পর বিরোধী মনে হলেও কিন্তু আমরা যদি গভীরভাবে এই মূল নীতিগুলো বিশ্লেষণ করি তবে তার ঐক্যতানটা বুঝতে পারব।
আমরা জানি, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র পরস্পর বিরোধী শাসন ব্যবস্থা। গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। পক্ষান্তরে সমাজতন্ত্রে ধর্মকে যেখানে আফিমের সাথে তুলনা করা হয়েছে সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রাসঙ্গিকতাই বা কি। তাছাড়া সমাজতন্ত্র জাতীয়তাবাদে নয় আন্তর্জাতিকতা বাদে বিশ্বাসী। এত পরস্পর বিরোধী নীতিকে মুজিববাদ বলার অর্থ কি? উত্তরটা খুবই সহজ।
বঙ্গবন্ধু সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন। পাশাপাশি তিনি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা চেয়েছেন। তাই তিনি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন। তিনি গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন বিপ্লবের মাধ্যমে নয়। জনগণের সন্মতিতে যদি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় তাহলে আলাদা নীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা বা জাতীয়তাবাদের কোন প্রয়োজনই হবে না অন্যদিকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদ, সামাজিক ন্যায় বিচার এমনি এমনি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে আর যে পর্যন্ত জনগণের সন্মতিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পর্যন্ত গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সংবিধানের মূল নীতিকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রের চেতনা বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এক কথায় এটাই মুজিববাদ।
আজ স্বাধীনতার ৪৯তম বর্ষে, বিশ্ব বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সমাজতন্ত্র ততটা প্রাসঙ্গিক নয় কিন্তু সমাজে বিদ্যমান অসাম্য দূরীকরণ, সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরো বেগবান করার শপথ নেয়াটা আরো বেশী প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাই মুজিববর্ষে ৪৯ তম স্বাধীনতার দিবস উদযাপনে এক নুতন দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে।
আজ ৪৯ তম স্বাধীনতা দিবসে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমার বিন¤্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথপুর সরকারি কলেজ।