স্বাস্থ্যসেবাকে করতে হবে মানবিক

‘স্বাস্থ্যখাতে চাই সুশাসন’ শ্লোগানকে সামনে রেখে সোমবার সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে একটি মতবিনিময় সভা করেছে। মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষে সংগঠনটি নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরেছে। সনাক যেদিন মতবিনিময় সভা করেছে তার পরদিন মঙ্গলবার দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘স্বাস্থ্য ব্যয়ে হিমশিম খাচ্ছে দেশের মানুষ’ শিরোনামে জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সরকারি গবেষণার সারমর্মভিত্তিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতের সুশাসন বিষয়ে এই প্রতিবেদনটি প্রাসঙ্গিক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মানুষ চিকিৎসাখাতে মোট ব্যয়ের গড়পড়তা ৬৮.৫% ব্যয় বহন করে নিজের পকেট থেকে। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৪.৪১% মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে। সবচাইতে বেশি মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৫৪% মানুষ ওষুধের দোকান ও হাতুড়ে চিকিৎসকের নিকট থেকে এই সেবা পেয়ে থাকে। এরা মূলত কোনো স্বীকৃত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট এই গবেষণা করেছে। গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পরিবারের উপর কিভাবে আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে এবং এই চাপে তাদের সামর্থ হ্রাস পায়। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে আয়ের তুলনায় চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রায় ২৪.৪% মানুষ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। এছাড়া সক্ষমতা না থাকায় প্রায় ১৬.৪% মানুষ চিকিৎসা সেবা নেয়া থেকে বিরত থাকেন বলে বিশ^ব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিরাজমান এই ধরনের পরিসংখ্যান থেকে ওই খাতে চরম অসাম্য ও সুশাসনের অভাব ফুটে উঠে। সংবিধানে চিকিৎসাকে মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ওটি যে নিছক কাগজের পাতায়ই আটকে রয়েছে উপরের তথ্যগুলো এর প্রমাণ। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরের এমন স্বাস্থ্যসেবা চিত্র একেবারেই হতাশাজনক।
গবেষণা কেন, সচেতন ব্যক্তি মাত্রই নিজের চারপাশ পর্যবেক্ষণ করলে উপরের তথ্যগুলোর সত্যতা পাবেন। ক্যান্সার, হৃদরোগ বা শৈল্যচিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন রোগের কারণে কত পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছে এবং এরকম কত মানুষ কেবলমাত্র টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে না পেরে মারা গেছে তাও আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি। মানুষের এমন অসহায় অবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বড় বড় দুর্নীতির খবরগুলোও সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই উঠে আসে। দামি যন্ত্রপাতি কিনতে এই বিভাগের যত উৎসাহ সেগুলো সচল বা ব্যবহারাধীন রাখতে তত নিরুৎসাহের খবরও পাওয়া যায়। অথচ এই দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করতে পারলে স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটা সামান্য হলেও উন্নত হিসাবে দেখা যেতো।
আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে আরেকটি অভিযোগ হলোÑ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের আন্তরিকতার ঘাটতি। হাসপাতালে বিনা পয়সার চিকিৎসায় না হয় এই অবস্থা মেনে নেওয়া গেলো কিন্তু পয়সা দিয়ে যারা চিকিৎসা গ্রহণ করেন তাদের অভিজ্ঞতাও হতাশাজনক। অধিক সংখ্যক রোগী দেখার তাড়না থেকে আমাদের চিকিৎসকরা রোগী পিছু সময় দেন একেবারেই কম। অযথা রোগ নির্ণয় পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে রোগীদের। ভুল চিকিৎসা করা আরেকটি বড় অভিযোগের জায়গা। এইসব কারণে সামান্য সংগতি থাকলেও রোগ সারাতে মানুষের বিদেশ গমনের প্রবণতা বেড়ে গেছে। পরীক্ষা ও ঔষুধের মূল্যাধিক্য ও প্রয়োজনাতিরিক্ত ঔষধের ব্যবস্থাপত্র লিখা নিয়েও রোগীরা অসন্তুষ্ট। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা একটি সেবাধর্মী মানবিক চরিত্র ধারণ করতে পারেনি। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী অতিক্রমের সময় এ জাতির জন্য এটি এক আফসোসই বটে।
সনাক স্বাস্থ্যখাতে যে সুশাসনের কথা বলছেন তা মূলত রাষ্ট্রিক ও ব্যক্তিক আকাক্সক্ষার উপর নির্ভরশীল। সকলে সকলের জায়গায় থেকে চিকিৎসাকে মানবতার ব্রত হিসাবে না নিলে যত কথাই বলি বা যত মতবিনিময়ই করি দিন শেষে তা অর্থহীনতায় পরিণত হয়। এমন অর্থহীনতা আমাদের পীড়িত করে।