স্মরণ মরহুম আব্দুল হেকিম চৌধুরী

এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা, অসীম সাহসিকতা ও মননশীলতাকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন অন্যদিকে সাহিত্য, ক্রীড়া চর্চা ও শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে রেখে গেছেন বহুমূখী প্রতিভার স্বাক্ষর। ৫২’র ভাষা আন্দোলেনে পালন করেছেন অগ্রণী ভূমিকা। অগাধ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ প্রিয় মাতৃভূমিকে পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে রক্ষা করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে। পাশাপাশি যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করে গেছেন তিনি মরহুম আব্দুল হেকিম চৌধুরী। আজ ২৪ মার্চ তাঁর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী।
তিনি ১৯২৪ সালের ১ মার্চ হাওর বেষ্টিত ধর্মপাশা উপজেলার ধর্মপাশা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে  জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম হাজী আব্দুর রহমান চৌধুরী। আব্দুল হেকিম চৌধুরী রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন। ছাত্র জীবনেই তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। তিনি ১৯৪৮ সালে সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি ও মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ড ধর্মপাশা থানার আঞ্চলিক কমাণ্ডার ও ১৯৫৩ সালে সুনামগঞ্জ মহুকুমা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নিজ নির্বাচনী এলাকায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহুকুমা বাংলা ভাষা কর্ম পরিষদের সদস্য হিসেবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।
১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটি গঠন নিয়ে তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহুকুমা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা মহুকুমার এক অংশ নিয়ে গঠিত সাংগঠনিক কমিটি গঠনে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ থানাসহ নির্বাচনী এলাকা নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে ধর্মপাশা ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য এবং ১৯৬৩ সালে সুনামগঞ্জ মহুকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী পার্টির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এ রাজনীতিবীদ।
১৯৬৫ সালে তিনি পুনরায় প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য ও ধর্মপাশা সদর ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তৎকালীন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১নং সেক্টরের অধীনে মহিষখলা ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা ও ক্যাম্প ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ সময় নিজ এলাকায় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে তা নিজে পরিচালনার দায়িত্ব নেন এবং সামরিক শিক্ষা কেন্দ্র খুলে যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। একই সঙ্গে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের প্রেরণ করেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ১৯৭০ সালে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদে এবং ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি জয় লাভ করেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেলা গভর্নর পদ্ধতিতে সুনামগঞ্জ জেলার গভর্নর নির্বাচিত হন তিনি। হাওর এলাকার পিছিয়ে পরা নারী শিক্ষা বিস্তারে লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালের ৩০ জানুয়ারি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে নিয়ে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ধর্মপাশা বালিকা বিদ্যালয়ে নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি ধর্মপাশা জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে তৎকালীন সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বে প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে অধিবেশনের প্রদত্ত ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ লিপিবদ্ধ করে ‘আইন পরিষদের সাত বছর’ নামের একটি বই রচনা করেন তিনি। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে তিনি ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী এবং আমৃত্যু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে একজন নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। ১৯৮৬ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরে তাঁকে ধর্মপাশা গ্রামের জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।