স্মৃতিতে ভাস্মর ময়নার পয়েন্ট

হাসান শাহরিয়ার
ছেলেবেলায় দেখেছি, আমার জন্মস্থান প্রান্তিক মহকুমা শহর সুনামগঞ্জের দুই প্রধান রাস্তায় বেশ কয়েকটি তেমাথাÑচৌমাথা রয়েছে। আজও আছে। সবাই এগুলোর নাম দিয়েছিলেন ‘পয়েন্ট’। যেমন, ‘পুরাতন কলেজ পয়েন্ট’, ‘কাজীর পয়েন্ট’, ‘রজন্তির দোকান পয়েন্ট’, ‘পাদ্রীর পয়েন্ট’ বা ‘বিহারী ডাক্তারের পয়েন্ট’, ‘ময়নার পয়েন্ট’ ইত্যাদি। এই নামগুলো মানুষের দেওয়া, পৌরসভার খাতায় কী আছে তা আমার জানা নেই। শহরের কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়ের জন্যই তেমাথাÑচৌমাথার এই নামকরণ। 
গত শতকের আশির দশকে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে রূপান্তরিত হলে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন পুরাতন কলেজ পয়েন্টÑএ ছোট আকারের একটি ট্রাফিক স্ট্যন্ড স্থাপন করা হয়। ফলে এর নাম হয়ে যায় ট্রাফিক পয়েন্ট। পরে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আলফাতউদ্দিন আহমদের নামে এর নামকরণ করা হয় ‘আলফাত স্কোয়ার’। তবে রিকশাচালকেরা ‘ট্রাফিক পয়েন্ট’ই বলে। সেই পঞ্চাশ দশক থেকে এখনও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জনসভা এই চত্বরেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ ১৯৫২ সালে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলেজ পয়েন্ট। তখনও কলেজ তার নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়নি। তমদ্দুন মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিশিষ্ট দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এর নেতৃত্ব দেন। আমার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী তখন সুনামগঞ্জ মুসলিম লীগের সভাপতি। তিনি আসাম ব্যবস্থাপক পরিষদের সাবেক সদস্য এবং সিলেটের প্রথম মুসলমান পত্রিকা সম্পাদক। ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কলেজ পয়েন্টে প্রকাশ্য জনসভায় মকবুল হোসেন চৌধুরী মুসলিম লীগের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং চিরদিনের জন্যে মুসলিম লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ ত্যাগ করেন। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা এগিয়ে নিয়ে যান।  প্রায় প্রতিদিনই কলেজ পয়েন্টে সভা-মিছিল হতো। তখনকার মিছিল থেকে বিভিন্ন ধরণের শ্লোগান হতো। দু’একটি আজও মনে আছে ঃ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই,’ ‘ নূরুল আমিনের মু- চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘জুলুমবাজীর অবসান চাই’ ইত্যাদি। সেদিন তরুণ ও যুব সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আব্দুল হাই, আব্দুল হক, আব্দুল মতিন চৌধুরী, বরুণ রায়, হোসেন বখত, আলফাত উদ্দিন আহমদ, নূরুল আবেদিন, মঞ্জু দাস ও কাজল দাস প্রমুখ।
আমরা এখানেই দেশের নামীÑদামী নেতাদের বক্তৃতা শুনেছি।  তখনকার দিনে আয়োজকরা সভাস্থলের অনতিদূরে একটি টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার রাখতেন। সেখানে বসতেন ইনটেলিজেন্স ব্যুরো বা আইবির কর্মকর্তাগণ। বক্তাদের বক্তব্য সুষ্ঠুভাবে লিপিবদ্ধ করার জন্যই এই আয়োজন।  একবার জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এক জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। বক্তৃতার মাঝখানে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দু’ হাত তুলে ‘জালিম’ সরকারের বিরুদ্ধে মেনাজাত করতে শুরু করলেন। জনতার রোষানলে পড়ার ভয়ে আইবির কর্মকর্তাগণও মোনাজাতে শরিক হন। ‘দেখুন, আইবির লোকেরাও আমাদের সঙ্গে মোনাজাত করছে,’ এই উক্তি করে তিনি বলেন, ‘সকলেই এই  জালিম সরকারের পতন চায়।’ এতে আইবি বা গোয়েন্দা কর্মকর্তাগণ একটু বিব্রতবোধ করেছিলেন।
‘কাজীর পয়েন্ট’Ñএর অবস্থান ষোলঘরে। এর আগের নাম ‘আরশাদ আলী পয়েন্ট’। পরে এর নাম হয় ‘কাজলের পয়েন্ট’। আরশাদ আলী ও কাজলের চা-স্টল ছিল এই চত্বরে। এক সময় ওই এলাকার কাজী সাহেব সেখানে তার অফিস স্থাপন করলে পয়েন্ট নাম বদলে যায়। সবাই একে ‘কাজীর পয়েন্ট’ বলতে শুরু করে। আসলে রিকশাচালকেরাই এই নাম দিয়েছে। উকিল পাড়ায় ‘রজন্তির দোকান’ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। সেখানে কোনো চত্বর না থাকলেও রিকশাচালকেরা ‘রজন্তির দোকান পয়েন্ট’ বলতো। হাসননগরে খ্রিস্টান মিশনের কোণায় যে চৌমাথাটি আছে তাকে কেউ কেউ ‘পাদ্রীর পয়েন্ট’ বলেন। ডা. আহমদ রেজার বাসভবনটি খ্রিস্টান মিশনের পূর্বদিকে। তিনি ‘বিহারী ডাক্তার’ নামে পরিচিত ছিলেন। ফলে কারো কারো কাছে এর নাম ‘বিহারী ডাক্তার পয়েন্ট’। 
জনপ্রিয় পৌর চেয়ারম্যান প্রয়াত দেওয়ান মমিনুল মউজদীন হাসননগরে সতীশচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয় ও প্রেসক্লাবের কাছের চত্বরটিতে কয়েকটি বকমূর্তি বসালে এর নাম হয়ে যায় ‘বক পয়েন্ট’। বর্তমান পৌর মেয়র আয়ুব বখত জগলুল বক মূর্তিগুলো সরিয়ে রাস্তা প্রশস্ত করেন এবং দৃষ্টিনন্দন এই পয়েন্টের নাম রাখেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হোসেন বখতের নামে। এর বর্তমান নাম ‘হোসেন বখত চত্বর’। চুয়ান্ন সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় আমরা ছোট ছিলাম। তখন হোসেন বখত যুক্তফ্রন্টের নিবেদিতপ্রাণ নেতা ছিলেন। মেয়র জগলুল ডাক বাংলো থেকে হোসেন বখত চত্বর পর্যন্ত রাস্তাটির নাম দিয়েছেন ‘বরুণ রায় সড়ক’। হোসেন বখত ও বিশিষ্ট কম্যুনিস্ট নেতা প্রসুনকান্তি রায়ের (বরুণ রায়) স্মৃতি রক্ষার জন্য পৌরসভার এই উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। তবে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে অনেক জননেতা জেলÑজুলুম সহ্য করে আন্দোলনে অংশ নিয়ে সুনামগঞ্জের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন। তাঁদের স্মরণেও রাস্তাঘাটের নামকরণ করা হলে সকল শ্রেণির জনগণ খুশি হবে।  
লক্ষণছিড়ির জমিদার আনোয়ার রাজা চৌধুরী কলেজের নতুন ক্যাম্পাসের জন্য  হাসন নগরে ১৪ কেদার জমি দান করার পর আমাদের চোখের সামনে গড়ে ওঠেছে কলেজের নতুন ভবনটি। এলাকাটি ছিল নিচু, বর্ষায় ডুবে যেতো। তাই বিশাল দীঘি কেটে মাটি ভরাট করে ভবনের ভিত তৈরি করা হয়। আমার কলেজ জীবন শুরু হওয়ার দু’বছর আগে ১৯৬০ সালে বৃক্ষরাজিশোভিত খোলামেলা ও মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে কলেজটি তার নিজস্ব জমিতে ও নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হয়। তবে বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করতো পুরাতন কলেজে। তখন পর্যন্ত কলেজের নতুন ভবনে কোনো ক্যান্টিন চালু হয়নি। ঐ বছর সিলেট থেকে একদল ছাত্র এসে যোগ দিল বিজ্ঞান বিভাগে। তাদের মধ্যে কয়েকজন  হলো: এজাজ আহমদ চৌধুরী, অরুণ ব্রহ্ম, মাহতাব চৌধুরী, তাজ উদ্দিন, ইয়াকুব আলী, সাফিউর রসুল, হাবিবুল্লাহ, জহির আহমদ, মঈনুল ইসলাম, মাসুদ কলিম, গোলাম মওলা, আলতাফ হোসেন, মকবুল হোসেন, মুসলিম আহমদ প্রমুখ। মহকুমার বিভিন্ন থানা থেকে এই কলেজে পড়তে আসতো ছাত্ররা। তখন সুনামগঞ্জের অন্য কোথাও কোন কলেজ ছিল না। মুসলমান ছাত্রদের জন্য হোস্টেল ছিল হাসন নগরে এবং হিন্দু ছাত্রদের জন্য উকিল পাড়ায়। দুই হোস্টেলেই জায়গার অভাব ছিল। তাই অনেকছাত্রকে কারো বাসায় বা মেস করে থাকতে হতো। কেউ কেউ আশেপাশের গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে বা লঞ্চে চড়ে কলেজে আসতো। ছাত্রীদের জন্য কোনো হোস্টেল ছিল না। তাদের অনেকে পড়াশোনা করতো আত্মীয়Ñস্বজনের বাসায় থেকে। 
ছোট সময় থেকে দেখে এসেছি হাসননগর পয়েন্টে রাস্তার দক্ষিণ পাশে একটি মুদি দোকান। নিঃসন্তান খলিলুর রহমান অরফে গেদু মিয়া এটি চালাতেন। তবে অধিকাংশ সময়েই তা বন্ধ থাকতো। এই সুযোগে হাসননগরের মিছিল আলীর দুই ছেলে আব্দুর রাজ্জাক (ময়না মিয়া) ও মোছন আলী রাস্তার পূর্ব পাশে একটি মুদি দোকান দেন। ময়না মিয়া হাসননগর গ্রামে আমাদের সব ধানি জমি দেখভাল করতেন। দেখতাম, মাকে তিনি ধান বিক্রির টাকা বুঝিয়ে দিতেন। আমার মা তাকে খুব বিশ্বাস  করতেন। তিনি আমাদের সঙ্গে কখনও বিশ্বাসের বরখেলাপ করেননি।
মুসলিম হোস্টেলের ছাত্রদের নাস্তা খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তখন ময়না মিয়া খ্রিস্টান মিশনের পাদ্রী সুরেশচন্দ্র দাশের কাছ থেকে একখ- জমি নিয়ে(প্রথমে ইজারা ও পরে ক্রয়) একটি টি-স্টল বা রেস্টুরেন্ট চালু করেন। মুসলিম হোস্টেলের ছাত্ররা তার স্টলের চা, মিষ্টি, বুন্দিয়া ও পরোটা খুব পছন্দ করতো। অমায়িক ব্যবহারের জন্য খ্যাত ময়না মিয়া তাদের জন্য দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকা ও সিঙ্গল চা সরবরাহ করতেন। খবর শোনার জন্য রেডিও তো ছিলই। মুসলিম হোস্টেলের ছাত্ররা সকালÑবিকাল ময়না মিয়ার চা স্টলে নাস্তা করতো।এই স্টলের চা পান করা যেন ছাত্রদের এক অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। অনতিদূরে আমাদের বাসা থাকা সত্ত্বেও কলেজে যাওয়ার আগে, কলেজ থেকে ফিরে কিংবা বিকালে আমার র‌্যালি সাইকেলে করে চা পান করতে যেতাম এই স্টলে। কিছুদিনের মধ্যেই ময়না মিয়ার চাÑস্টল ছাত্রদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। অনেকটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর কেন্টিনের মতো কলেজের ছাত্র নেতারা ধর্মঘট থেকে শুরু করে সব  গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন এই স্টলে বসে।
কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচন এলেই ছাত্র নেতারা ময়নার স্টলে বসে তাদের স্ট্রাটেজি ঠিক করতেন। ময়না মিয়া একদলের কথা অন্যদলকে বলতেন না। তখন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও সরকার সমর্থক জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন বা এনএনএফÑএর শাখা ছিল সুনামগঞ্জে। ছাত্রলীগের চেয়ে ছাত্র ইউনিয়ন অনেকটা শক্তিশালী ছিল; তবে দাপট ছিল সরকার সমর্থক এনএসএফÑএর। বড় ভাইদের মধ্যে সৈয়দ রফিকুল হক (পরবর্তীকালে সংসদ সদস্য), চৌধুরী মনসুর আহমদ, আলী ইউনুস (এডভোকেট, প্রয়াত), মিসবাউদ্দোজা আহমদ রেজা (সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, প্রয়াত), আব্দুর রহিম চৌধুরী (হবিগঞ্জের একটি উপজেলা বা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান), ইশতিয়াক আহমদ চৌধুরী (প্রয়াত), আবু জাফর খালেদ (সাবেক অধ্যাপক, বর্তমানে চাÑবাগান ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা), জাহাঙ্গীর বখত খসরু (প্রয়াত), আনোয়ারুল হক (প্রয়াত), ইকবাল হোসেন চৌধুরী (সাবেক মন্ত্রী, প্রয়াত), মানসকমল রায় (ভারতবাসী), সিতাংশুকুমার চৌধুরী মিনু (ভারতবাসী), আহমদ আলী (পরে কলেজ অধ্যক্ষ), গোলাম রব্বানী (প্রয়াত), হোসেন তওফিক চৌধুরী (এডভোকেট ও কলাম লেখক), মনসুর আহমদ চৌধুরী ভাসানী (অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা), আব্দুর রহিম (এডভোকেট, প্রয়াত) ও বদরুদ্দোজা আহমদসুজা (সাবেক এমপি)Ñএর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন চৌধুরী মনসুর আহমদ, মানসকমল রায়, ইকবাল হোসেন চৌধুরী, সিতাংশুকুমার চৌধুরী মিনু, আব্দুর রহিম, দেওয়ান শামসুল আবেদীন ও আব্দুল মান্নান। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবকে জুতা দেখানোর অভিযোগে ইকবাল হোসেন চৌধুরীকে সিলেট এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি জেলও খাটেন। কর্মজীবনে সেনাবাহিনী থেকে বিদায় নিয়ে ইকবাল রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি দুইবার মন্ত্রী হয়েছিলেন।
এই স্থানটি এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, আজ এই তেমাথার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ময়নার পয়েন্ট’। এই ‘ময়নার পয়েন্ট’ হয়েই আমাদের বাসা বা কলেজে যেতে হয়। সবাই এক নামে চিনে। কয়েক বছর আগে ময়না মিয়া ও তার ভাই মোছন আলীর মৃত্যু হয়েছে। অতি পরিচিত সেই চাÑস্টলটি এখন আর নেই, তবে মুদি দোকানটি আছে। 
লেখক: প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্লেষক; কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস।



আরো খবর