সড়কের মৃত্যুদূতকে এখনই থামান

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরই হচ্ছে। শুধু সুনামগঞ্জের প্রেক্ষাপটে গত এক সপ্তাহে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ ব্যক্তির করুণ মৃত্যু ঘটেছে। এই সময়ে দোয়ারাবাজারে বরসহ ৭ নিকটাত্মীয় ও ছাতকে ৫ যাত্রীর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে সড়ক দানব। প্রতিবছর গড়পড়তা আট থেকে সাড়ে আট হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে সড়ক দুর্ঘটনায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মোতাবেক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দিক দিয়ে পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে ওভার স্পিড, ওভারট্রেকিং, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, রাস্তার সমস্যা ও অদক্ষ চালকের বিষয়টিকে সামনে আনা যায়। এছাড়া প্রতিদিন যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে তাতে জড়িত চালক বা যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সীমাবদ্ধতাকেও দুর্ঘটনা বেড়ে চলার অনুঘটক বলা যেতে পারে। সম্ভবত বাংলাদেশে সড়ক সেক্টরের পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা সবচাইতে সংগঠিত শক্তি যারা কখনও আইন ও যাত্রীস্বার্থকে মোটেই পরোয়া করে না। আইনপ্রয়োগকারীরা এই শক্তির কাছে অসহায় আত্মসমর্পন করে বসে আছেন। ফলে প্রতিকারহীনভাবেই সড়কদানব প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে অগণিত তাজা প্রাণ। প্রশ্ন হলো, একটি দেশের সড়ককে এরকম অবাধ হত্যার লাইসেন্স দিয়ে রাখাটাই কি আমাদের ভবিতব্য?
কোন যাত্রী যখন একটি যানবাহনে চড়েন নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার জন্য, তখন মূলত ওই যানবাহনটি সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে গন্তব্যে নিরাপদ ও অক্ষত অবস্থায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে। যাত্রাপথে সড়কে সংঘটিত যেকোন দুর্ঘটনার দায় পরিবহন কর্তৃপক্ষ নিতে বাধ্য। উন্নত দেশে যাত্রীদের দুর্ঘটনাজনিত বীমা করা থাকে, এটি পরিবহন কোম্পানিই করে থাকেন। আমাদের দেশে এরকম ব্যবস্থা আছে কিনা জানি না। তবে থাকলেও যে এর কোন সুফল হতভাগ্য যাত্রীরা পেতেন না তা নিশ্চিত। বীমা থাকবে দূরের কথা, আমাদের দেশে খোদ যানবাহনেরই থাকে না কোন ফিটনেস সনদ ও লাইসেন্স। অনেক যাত্রীর প্রাণ যার হাতে সেই চালকের থাকে না কোন ড্রাইভিং লাইসেন্স। চালকদের লাাইসেন্স দেয়ার জন্য যে ধরনের মামুলী পরীক্ষা নেয়া হয় এবং চালকদের জন্য যে সহজ শর্তের যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, সেরকমটি অচিন্তনীয়। এ নিয়ে কথা উঠলেই হৈ হৈ রৈ রৈ করে উঠেন অনেকে। এই ধরনের বাস্তবতায় সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস পাওয়ার কোন সম্ভাবনাও হয়ে উঠে সুদূরপরাহত।
বাংলাদেশের প্রতিটি সড়কে ধারণ ক্ষমতার চাইতে বেশি যানবাহনকে চলাচল করতে হয়। একই সড়কে ধীরগতির রিক্সা, ঠেলাগাড়ি থেকে দ্রুতগতির বাস পর্যন্ত একই সাথে চলে। এইসব সড়কে ট্রাফিক সিগনালিং ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা ততধিক দুর্বল। সড়কের উপর চাপ কমানোর কোন পরিকল্পনা বা ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় না রাষ্ট্রশক্তির। সড়ক ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র স্বার্থ সংরক্ষণ করতে যেয়ে উপেক্ষা করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসাবে স্বীকৃত রেলপথ সম্প্রসারণকে। সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে জলপথকেও। যাতায়াত করতে চাইলে এক এবং একমাত্র সড়ক ছাড়া কোন বিকল্প না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে অসহায় যাত্রীদের।
তারপরও সকলেই চাই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামুক। কীভাবে থামানো যায় এই দুর্বিনীত মৃত্যুদূতকে? আশু করণীয়, মধ্যমমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী কী পরিকল্পনা থাকতে পারে এজন্য, সড়ক বিশেষজ্ঞরা তা ভালভাবে জানেন। এসব বিষয় নিয়ে কম কথা হয় না প্রতিদিন। আসল কাজ হলো কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভঙ্গ। এজন্য যাত্রীদের ক্রমাগত নাকাড়া বাজিয়ে ওই ঘুম ভাঙাতে হবে।