সড়ক তুমি কার ?

রাস্তায় লাইন করে গাড়ি দাঁঁড় করিয়ে রাখার এক অঘোষিত মাস্তানি শুরু হয়েছে আমাদের দেশে। যে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে মানুষের চলাচলের জন্য, যানবাহন চলাচলের জন্য; সেই রাস্তাকে টার্মিনাল হিসাবে ব্যবহার করার বিষয়টি যেমন আইনসিদ্ধ নয় তেমনি সড়কের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী গাড়ি মালিক জনগণের করের টাকায় নির্মিত সড়ককে নিজেদের মালিকানাধীন জায়গা মনে করে যেভাবে গাড়ি পার্কিং এর মাধ্যমে চলাচলের রাস্তাকে সংকুচিত করে ফেলেছেন তাতে ধারণা জন্মে তারা সব ধরনের আইন-কানুনের উর্দ্ধে। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে শনিবার এক আলোচনাসভায় সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক বিষয়টি সামনে এনেছেন। ওই আলোচনাসভায় তিনি বলেছেন, জেলা সদরের রাস্তায় ঢাকাগামী গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার বেআইনি কর্মকা- বন্ধ করা হবে। জেলা প্রশাসককে আমরা ধন্যবাদ জানাই সড়কের অন্যতম একটি সমস্যাকে চিহ্নিত করে জনসম্মুখে তুলে ধরা এবং এর সমাধানের চিন্তা-ভাবনা শুরু করার জন্য। তবে সড়কে লাইন করে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার এই সংস্কৃতি শুধু সুনামগঞ্জে নয়, বরং সারা দেশের এক সাধারণ চিত্র বলে এখন আমরা দেখতে পাই। খোদ রাজধানীতে বিভিন্ন বাস টার্মিনালের সংলগ্ন সড়কগুলো কতিপয় প্রভাবশালী পরিবহন কোম্পানির বড় বড় বাস দাঁড় করিয়ে রেখে মূল সড়ককে সংকুচিত করে রাখতে দেখি আমরা। এসব সড়কের প্রায় অর্ধাংশই এইভাবে বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানি দখল করে রাখে। এতে এইসব রাস্তায় তীব্র যানজটের অসহনীয় অবস্থা দেখে এখন আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
সড়ক পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকরা নিজেদের সব ধরনের বিধি বিধানের উপরে ভাবতে শুরু করেছেন। তারা যখন তখন কোনো কারণ ছাড়াই ধর্মঘট ডাকেন, যাত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন, ইচ্ছামত ভাড়া বাড়িয়ে দেন, বাসের ভিতর যাত্রীদের সব ধরনের সুবিধা হ্রাস করে ফেলেন। ঢাকাগামী বাসগুলোতে এখন যাত্রীদের একটু পা মেলে বসার পথ নেই। এমনভাবে সিট বসানো হয়েছে যে, যাত্রীদের রীতিমত যুদ্ধ করে নিজের আসনে বসতে হয় এবং সারাক্ষণ অস্বস্তি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার অপেক্ষা করেন। চারটি বা আটটি সিট বাড়ানোর জন্য যাত্রীদের একেবারে পশুর স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। কারণ তাদের মাথার উপরে আর কেউ আছেন পরিবহন মালিক শ্রমিকরা যেন এখন তা ভাবতেই অনভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এরকম অবস্থায় জেলা প্রশাসক রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে না রাখার যে আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন তা বাস্তবায়ন করা যে বেশ কঠিন হবে তা আমরা বেশ বুঝতে পারি।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ভয়ানক স্তরে নেমে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে সড়ক নিরাপত্তার জন্য যেসব আইন প্রণীত হয়েছে তার কোনো বাস্তবায়ন দৃশ্য কারও চোখে পড়ে না। সড়ক পথকে যাতায়াতের একমাত্র উপায় ভাবার একচোখা নীতি বাস্তবায়নের কুফল জনসাধারণ এখন নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে প্রতিক্ষণ অনুভব করেন। জলপথ ও রেলপথকে অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে সড়ক-বেনিয়াদের প্রভাবকে উপেক্ষা করার শক্তি নেই বলে। দেশে দেশে গণপরিবহন বলতে যেখানে রেলপথকে বুঝানো হয় সেখানে আমাদের দেশে উল্টোচিত্র। সামনের দিনগুলোতে সড়কের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। এরকম প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের তেমন কোনো তাৎপর্য থাকতে পারে না। এই দিবসটি তখনই সার্থক হয়ে উঠতে পারে যখন পরিবহন ব্যবসায়ীদের বদলে সাধারণ যাত্রীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হবে। কবে আসবে এইরকম দিন?
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাস্তায় অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করে রাখা এবং বড় সড়কে সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকসা চলাচল না করার যে আইনসম্মত কথা বলেছেন, অচিরেই আমরা তার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।