সড়ক পরিবহন আইনটি প্রয়োগ-সুন্দর হয়ে উঠুক

বাঙালি নাকে দম না আসলে নাকি ডাক্তারের কাছে যায় না। বেরসিক কোনো বাস্তবতাবাদীর পর্যবেক্ষণলব্ধ এমন অভিমত সর্বাংশে সত্য না হলেও ক্ষেত্র বিশেষে যে এ অতি বড় সত্য দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে গতকাল প্রকাশিত একটি সংবাদ তার বড় প্রমাণ। ‘জেলা বিআরটিএ অফিসে সেবা প্রত্যাসীদের ভিড়’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, নতুন সড়ক আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে হঠাৎ করেই ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসের জন্য সেবাপ্রত্যাসীদের ভিড় শুরু হয়ে গেছে। যে ব্যাংক এইসব সেবার সরকারি ফিস জমা রাখছে তারা ভিড়ের কারণে ব্যাংকিং টাইমের পরেও টাকা জমা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সেবাগ্রহীতাদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিআরটিএ অফিসকে কেন্দ্র করে গজিয়ে উঠেছে একটি দালালচক্র। অনেকেই হয়রাণি, সময় ও যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে দালালদের সহায়তায় কার্যসিদ্ধির উপায় খোঁজছেন। এতে করে সরকার নির্ধারিত ফিসের চাইতে বেশি বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে অনেককে। বিআরটিএ অফিসে সেবা দানের জন্য নির্ধারিত ফিসের বাইরে কিছু অর্থ খরচের কাহিনী নতুন নয়। নতুন হল, এখন খরচের পরিমাণটা সম্ভবত বেড়ে যাবে। হঠাৎ করে কেন সারা দেশের যানবাহনের মালিক ও শ্রমিকরা এতোটা সচেতন হয়ে উঠে কাগজপত্র হালনাগাদকরণের জন্য মনোযোগী হলেন তা সকলেরই বোধগম্য। বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইনে শক্ত জরিমানা ও সাজার বিধান রাখা হয়েছে। সরকারের আচরণ থেকে স্পষ্ট সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন আইনের প্রয়োগ ঘটাতে চান তারা। নতুন আইনের কারণে অধিক হারের জেল-জরিমানা থেকে বাঁচতেই বিআরটিএ অফিসের সেবা গ্রহণের এই দীর্ঘ লাইন। একেই বলে নাকে দম আসার পর ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া।
এই নতুন আইন হওয়ার আগেও সড়ক পরিবহনের আইন বলবৎ ছিল। সেখানে জেল জরিমানার পরিমাণ কম হলেও ছিল কিন্তু। কিন্তু ওই আইনের প্রয়োগ ছিল সীমাবদ্ধ। সড়ক আইন প্রয়োগের সাথে জড়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতিপ্রবণ মানসিকতার কারণেই আইন প্রয়োগের বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হয়। এই সুযোগে সড়ক ভরে উঠেছে অযোগ্য যানবাহনে। চালক ও পথচারীরা হয়ে উঠেছেন বেপরোয়া। কোনো বৈধ কাগজপত্রের ধার ধারেনি মালিক-চালক কেউই। রাস্তায় বৈধ যানের চাইতে অবৈধ যান ছিল কয়েক গুণ বেশি। এই অবৈধ যানবাহনের কতক অংশ এখন ভীত হয়ে বৈধতা গ্রহণের জন্য বিআরটিএ অফিসে ভিড় জমিয়েছে।
কোন কিছু কখনও না হওয়ার চাইতে বিলম্বে হওয়াও ভাল বলে একটি প্রবাদ আছে। সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে যদি এই প্রবাদ বাক্যটি সত্য হয় তাহলেও ভাল। তবে এটি নির্ভর করছে আইন প্রয়োগকারীদের উপর। শুরুর এই কঠোরতা যদি কিছুদিন পরই ঢিলেমিতে রূপান্তরিত হয় তাহলে তো সবই অক্কা। শুরুর কঠোরতার পরই নির্জীব হয়ে উঠার আশঙ্কা আমাদের অতীত কাল থেকে শিক্ষা লাভ। এবার আমরা এই শিক্ষা থেকে মুক্তি পেতে চাই। সড়কে একটিও দুর্ঘটনা ঘটুক কেউই চায় না। কোনো চালক বেপরোয়া ঘাতক হয়ে উঠুক এ কারও কাম্য নয়। কেউ সরকারকে কর ফাঁকি দিয়ে সড়কে যানবাহন নামাক এও অভিপ্রায় নয় কারও। পথচারীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রয়োজ্য। সকলকেই সড়কের আইন মানতে অভ্যস্ত হতে হবে। আইন মানার বিষয়টি নির্ভরশীল আইনের প্রয়োগের উপর। কঠোর ও নিরপেক্ষভাবে আইন প্রযুক্ত হলে আইন ভঙ্গের প্রবণতা কমতে বাধ্য। তরুণ শিক্ষার্থীদের অভাবনীয় সড়ক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রণীত এই সড়ক পরিবহন আইনটি প্রকৃত অর্থেই প্রয়োগ-সুন্দর আইনে পরিণত হোক এই আমাদের কামনা।