সড়ক প্রশস্তকরণ ও নদী খননের দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বড় ধর্মীয় স্থাপনা তাহিরপুর সীমান্তের যাদুকাটার পাড়ের শ্রী অদ্বৈত প্রভুর মন্দির এবং শাহ্ আরেফিন (র.) মাজারে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এই অবস্থার অবসানের জন্য দায়িত্বশীল বিভিন্ন মহল থেকে সড়ক প্রশস্তকরণ এবং নদী খননের দাবি ওঠেছে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূন্যস্থান হিাসাবে পরিচিত তাহিরপুরের সীমান্ত নদী যাদুকাটার পনতীর্থে চৈত্র মাসের মধু-কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে
গঙ্গাস্থানে মিলিত হন লাখো লাখো পূন্যার্থী। নদীর পাড়েই শ্রী শ্রী অদ্বৈত প্রভু’র মন্দির। এর একটু দূরেই সীমান্তের লাউড়ের গড়ে শাহ্ আরেফিন (র.) মাজারে একই সময়ে ওরস উৎসবে সমবেত হন লাখো ভক্ত।
এই দুই উৎসবকে ঘিরে যাদুকাটার অদ্বৈত প্রভু’র মন্দির থেকে লাউড়েরগড়ের শাহ্ আরেফিন (র.) মাজার পর্যন্ত ৩-৪ দিন ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ সমবেত হন। গত প্রায় ৫ বছর ধরেই এসব মানুষকে যাতায়াত ভোগান্তি পোহাতে হয়।
গেল উৎসবে আসা পূন্যার্থী ভক্তরা (২রা এপ্রিল থেকে ৪ এপ্রিল) এই পথে চরমে দুর্ভোগে পড়েছিলেন। ২রা এপ্রিল রাতে সুনামগঞ্জ শহরের আব্দুজ জহুর সেতু থেকে যাদুকাটার পাড়ের অদ্বৈত বাড়ী পর্যন্ত গাড়ীতে-গাড়ীতে ঠাসা ছিল। এতো ভিড় ছিল যে, পুরো রাত লাখ লাখ নারী পুরুষকে সড়কেই কাটাতে হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ভিড় সামাল দিতে হিমসিম খেতে হয়েছে।
এর আগে ২০১৬ খ্রি.’এর বারুণি ¯œানোৎসবে পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সুনামগঞ্জ থেকে যাদুকাটার বারুণি উৎসব স্থলে যাবার জন্য রওয়ানা দিয়ে ভিড়ের জন্য বিশ্বম্ভরপুরের হালাবাদি এলাকায় গিয়ে আটকা পড়েন। পরে ওখান থেকেই সুনামগঞ্জে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি।
বিশ্বম্ভরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি, শ্রী অদ্বৈত প্রভু’র মন্দির পরিচালনা কমিটি ও বারুণি মেলা উদযাপন কমিটির সদস্য স্বপন কুমার বর্মণ বলেন, পলাশ বাজার (সড়ক ও জনপথের সড়ক থেকে) থেকে ধনপুর বাজার, আনন্দ বাজার হয়ে অদ্বৈত বাড়ী পর্যন্ত এবং সলুকাবাদ-বাঘবেড় বাজার, চিনাকান্দি, মাছিমপুর, স্বরূপগঞ্জ হয়ে শাহ্ আরেফিন (র.) মোকাম, শাহ্ আরেফিন (র.) মোকাম থেকে শ্রী অদ্বৈত বাড়ী সড়ক, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদর থেকে বাঘমারা পয়েন্ট, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদর থেকে কাঠাখালী- মাছিমপুর হয়ে অদ্বৈত বাড়ী পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করতে হবে। মাঝে মধ্যে ট্রাফিক পয়েন্ট অর্থাৎ গাড়ী ঘুরানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। নৌ-পথকে সচল করতে রক্তি নদী ও যাদুকাটা নদী খনন করতে হবে। তাহলে নৌপথে মানুষ আসা যাওয়া করতে পারবে। এছাড়া বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সড়ক, যেমন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদর থেকে লালারগাঁও হয়ে পলাশ পর্যন্ত, ধনপুর ইউনিয়নের কাঠাখালী বাজার থেকে আনন্দ বাজার হয়ে ধনপুর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করতে হবে। বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়নের শক্তিয়ারখলা বাজার থেকে মিছাখালী রাবারড্যাম হয়ে মিয়ারচর পর্যন্ত গ্রামীণ সড়ক প্রশস্ত করতে হবে।
শাহ্ আরেফিন (র.) মাজার কমিটির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, সড়ক দিয়ে একটি লেগুনা চললে, আরেকজন হেঁটেও যেতে সমস্যা হয়, এই সড়ক দিয়ে লাখো মানুষের যাতায়াত চলে কীভাবে। সড়ক প্রশস্ত করতে হবে। মাজারে আরও স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে, যাতে মানুষ এসে কিছুটা সময় নিরাপদে অবস্থান করতে পারে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘অদ্বৈত বাড়ী ও শাহ্ আরেফিন (র.) মাজারে যাওয়া-আসার সকল সড়ককে প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। গত বছরের ২৮ জুলাই বারুণি স্নানস্থলের এবং অদ্বৈত বাড়ী’র উন্নয়নের জন্য স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ৩৩ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। কিন্তু এর কোন অগ্রগতি এখনো হয়নি।’ একই সঙ্গে শাহ্ আরেফিন (র.) আস্থানা উন্নয়নের জন্যও উদ্যোগ গ্রহণের দাবি করেন তিনি।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, তাহিরপুরের অদ্বৈত বাড়ী এবং শাহ্ আরেফিন (র.) যাতায়াত সড়কের কাজ চলছে। তবে এই সড়ক প্রশস্তকরণের বড় কোন উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই তাঁর।
গেল বারুণি উৎসবে যাতায়াত দুর্ভোগের অবর্ণনীয় চিত্র তুলে ধরে গত ২৭ জুলাই দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর আয়োজিত ‘উন্নয়ন ভাবনা: সুনামগঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জেলার বিদায়ী পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ্ খান বলেন, যাদুকাটার বারুণি উৎসব এবং শাহ্ আরেফিন (র.) উৎসবকে ঘিরে ১০ লাখ মানুষ বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন। সারা রাত অসংখ্য নারী-পুরুষ পথেই কাটিয়েছেন। জেলা পুলিশের সকল সদস্যই সারা রাত পথে ছিলেন মানুষকে নিরাপত্তা দেবার জন্য, আমরা উদ্বিগ্ন এবং উৎকণ্ঠায় রাত কাটিয়েছি, কী জানি কী ঘটে, এভাবে হওয়া কোনভাবেই কাম্য নয়। এই যাতায়াত পথকে প্রশস্ত করতে হবে। বিকল্প সড়কও থাকতে হবে। দিনে দিনে পণতীর্থের ¯œানোৎসবে ও শাহ্ আরেফিন (র.) ওরস উৎসবে মানুষের সমাগম বাড়বে। এখনই এই বিষয়ে উদ্যোগী না হলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে এখানকার প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে।
গত শুক্রবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জের সন্তান বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, পণতীর্থের গঙ্গা¯œানে আসা পূন্যার্থী এবং শাহ্ আরেফিন (র.) ভক্তদের আগমনকে নির্বিগ্ন করতে হলে সড়ক প্রশস্তকরণের পাশপাশি, রক্তি ও যাদুকাটা নদী খনন করতে হবে, যাতে নদীগুলোর নব্যতা বাড়ে এবং বড় বড় লঞ্চ চলতে পারে। তাহলে নৌ-পথে উৎসবে যেতে পারবে মানুষ। সড়কের উপর চাপ কমবে।