‘হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ’

শাহরিয়ার বিপ্লব
সুবেহ সাদিকের লাল আভা ছড়াচ্ছে আকাশে। অন্ধকার কিছুটা কেটে যাচ্ছে। রাত্রি দূর হবে। সূর্য উঠবে। পাখি ডাকবে। ফুল ফুটবে। এই তো ছিল স্বাভাবিক প্রকৃতি।
কিন্তু বাংলাদেশের ভোরে সেদিন সুর্য উঠে নাই। পাখি ডাকে নাই। ফুল ফোটে নাই। আলো আসে নাই।
অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল পুরো আকাশ। রাত্রির চেয়েও অন্ধকার ছিল সেদিনের সকাল। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে ছিল রক্তের গন্ধ। বারুদের গন্ধে সেদিন ভারী হয়ে গিয়েছিল ঢাকার বাতাস।
ধানমন্ডির ৩২ নং রোডের ৬৭৭ নং বাড়িতে সেদিন থেমে গিয়েছিল পৃথিবীর সময়। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। পিছনে ঘুরে যায় বাঙালির ভাগ্যের চাকা।
মুয়াজ্জিনের আযানের শব্দ শোনা যায়নি সেদিন গুলির শব্দে। ৩২নং এর বাড়ির সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েছিল বাংলার ভাগ্য বিড়ম্বিত রাজা, ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যর্থ ভালবাসার কাঙাল, বিশ্বাসে বোকা রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নিথর দেহ।
বঙ্গবন্ধুর নির্বাক দেহের নাক, মুখ, বুক, পেট গড়িয়ে বিদ্রোহের রক্ত চুইয়ে চুইয়ে বাড়ি ছেড়ে রাজপথ, ধানমন্ডি লেক, লেক থেকে বুড়িগঙ্গা, আর বুড়িগঙ্গা থেকে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বোকা বোকা, বিশ্বাসী বিশ্বাসী, কিন্তু টগবগ টগবগ করা বিপ্লবী রক্ত¯্রােত।
এ রক্ত থেকে কখোনো ঢেউ উঠে, কখনো উত্তাপ ছড়ায়, বিপ্লব ফুটায়।
কিন্তু খুনীরা জানে না বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়া রক্ত কোনদিন বিপ্লব বা বিদ্রোহকে নিঃশেষ করে দিতে পারে না। তাই তো ‘৭৫ এর পরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শ্লোগান উঠেছে, ‘আমরা সবাই মুজিব হবো- মুজিব হত্যার বদলা নেবো।’ ‘মুজিব হত্যার পরিণাম- বাংলা হবে ভিয়েতনাম ‘। ‘এক মুজিবের রক্ত থেকে- লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে’। ‘ এক মুজিব লোকান্তরে – লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’।
আজকে যখন এই লেখা লিখছি। তখন অবশ্যই লক্ষ কোটি মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে। মুজিবের রক্তের উত্তরাধিকার বহন করা কন্যা আজ বাংলার আকাশ ভেদ করে বিশ্বব্রহ্মান্ডে উড়াচ্ছেন বাংলার পতাকা।
ইতিহাস এমনি হয়। প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেয় নিজের মতো করে। জোর করে প্রকৃতিকে কেউ ফিরাতে পারে না। যারা করতে চায় প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার শিকার তারা কোনও না কোনও ভাবে নিজেরাই হয়।
খুনীরা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে ফিজিক্যালি তাঁকে চোখের আড়াল করতে পেরেছে মাত্র। কিন্তু তারা জানে না, ইতিহাসের যারা ¯্রষ্টা, যারা ইতিহাসের সন্তান, তাদেরকে শুধু হত্যাই করা যায়, কিন্তু মৃত্যু ঘটানো যায় না। পৃথিবীর ইতিহাস, ধর্মীয় ইতিহাসও তাই বলে।
বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার হয়েছে এটা যেমন সত্য, অনেকে বিচারের বাইরে রয়ে গেছেন এটা আরো বড় সত্য। আদালতের রায়েই বলা হয়েছে, এই হত্যাকান্ডের দুইটি দিক রয়েছে। দুটি পর্যায়ে হত্যাকারী এবং হত্যাকান্ডের প্রেক্ষাপটকে বর্ণনা করা যায়। মূলতঃ বাহ্যিক হত্যাকারীদের বিচার আমরা করতে পেরেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক হত্যাকারী বা রাজনৈতিক খুনীদের আমরা বিচারের আওতায় আনতে পারি নাই।
সেটা হয়তো কোনওদিন সম্ভবও নয়। আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সুখময় দাশগুপ্ত তার “মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা” বইতে লিখছেন, মুজিব হত্যাকান্ডের প্রকৃত বর্ণনা সবসময় রহস্যে আবৃত থাকবে।
জানি না কতদিন রহস্যাবৃত থাকবে এই রাজনৈতিক হত্যাকা-ের অজানা উপাদান। উপাদান যাই থাকুক। সময় একদিন সব রহস্যের উন্মোচন ঘটাবে।
হিমালয় সমান সাহস আর বঙ্গোপসাগরের মতো ভালোবাসা নিয়ে বড় হওয়া বালক। ১৯৩৯ সালেই বালকের সাহস দেখেছিলেন, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছে। সাথে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনিই দেখেছিলেন পৃথিবীর জলন্ত আগ্নেয়গিরি বুকে নিয়ে বড় হচ্ছ্র যে বালক, সেই বালকের কাছেই দিয়েছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির দায়িত্ব। তখন থেকেই আজন্ম বিরুদ্ধবাদিতার সাথে পথচলা একদিকে, অন্যদিকে জয় করেছিলেন সকল প্রতিকূলতা। যে কারণে একদিকে জনপ্রিয়তা অন্যদিকে শত্রুতা সমান্তরাল ভাবে বেড়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর দুই পাশে।
আজ এই হিমালয়ের জন্মদিন। হিমালয়ের বক্ষজুড়ে জমুক আগুন। ঘরে ঘরে জলুক আগ্নেয়গিরি। লাভা নির্গত হোক বঙ্গোপসাগরে। আক্ষরিক অর্থেই জন্ম নিক লক্ষ লক্ষ মুজিব।
তবেই উন্মোচিত হবে মুজিব হত্যার অজানা ইতিহাস। উন্মোচন হবে কালো অধ্যায়।
তবেই হবে মুজিব হত্যার প্রকৃত প্রতিশোধ।।