হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতো হচ্ছে নবান্ন উৎসব

বিশেষ প্রতিনিধি
পহেলা বৈশাখ উদযাপন কিংবা বাঙালিদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান বাঙালি জাতির সার্বজনীন অনুষ্ঠানের অন্যতম। গ্রামীণ কৃষক সমাজের ঘরে ফসল তোলা আর খাজনা আদায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য আনয়নের জন্য এই বঙ্গাব্দের শুরু। পহেলা বৈশাখে কৃষকরা জমিদারকে খাজনা দিয়ে মিষ্টিমুখ করে বাড়িতে ফিরতেন। এখনও হাওরাঞ্চলে কিংবা বাঙালি গ্রামীণ সমাজে পহেলা বৈশাখে হালখাতা ও মিষ্টিমুখের প্রচলন আছে।
হাওরাঞ্চলে একসময় বর্ষবরণের দিন কবি গান, গাজীর গান, পুতুল নাচ, ভাটিয়ালী, মুর্শীদি, বাউল গান, যাত্রাপালাসহ লাঠি খেলা, বলি খেলা, ষাঁড়দৌড়, ঘৌড়দৌড় ইত্যাদি অনুষ্ঠান হতো, এখন আর এমন হয় না।
জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের ৭ বারের চেয়ারম্যান করুণা সিন্দু তালুকদার বললেন,‘দিনটি হাওরাঞ্চলে একসময় সার্বজনীন উৎসবের মত ছিল, এখন আর সেরকম নেই। হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা পহেলা বৈশাখের আগের দিন (১৪ এপ্রিল সরকারি বর্ষবরণের দিন) চড়ক পূজা করেন। আমাদের এলাকার ছয়হারা এবং খোজারগাঁওয়ে চড়ক পূজা হয়। পহেলা বৈশাখে হয় বিষু পূজা। চালের গুড়া দিয়ে বসত ঘরে আল্পনা করা হয়। নতুন ধানের চাল দিয়ে ভাত এবং পাঁচ প্রকার তরকারি দিয়ে পূজার ভোগ লাগানো হয়। ফসল ভালভাবে যাতে গোলায় ওঠে সেই কামনায় হয় বিষু পুজা। কেউ কেউ পিঠা পায়েস করে পাড়া পড়সিদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ান।’
বিশ্বম্ভরপুরের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্বপন কুমার বর্মন ও সালেহ আহমদ বলেন,‘বিশ্বম্ভরপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ১৪ এপ্রিল। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামাঞ্চলে এদিন নতুন কাপড় পড়া, বৈশাখী ফসলকে সামনে রেখে মসজিদে মসজিদে দোয়া, হিন্দু ধর্মালম্বীরা ১৪ এপ্রিল (চৈত্র সংক্রান্তির দিনে) শ্রীধরপুর কৃষ্ণথলা ও বিশ্বম্ভরপুর শিবমন্দির প্রাঙ্গণে চড়ক পূজার আয়োজন করেন। পরদিন (১৫ এপ্রিল) হিন্দুরা বিষু পূজা বা বৈশাখী ব্রত করে থাকেন। জমিতে গিয়ে লক্ষী দেবীর কাছে কেউ কেউ ফসল ভালভাবে ওঠার জন্য আরাধনা ও মঙ্গল কামনা করেন।
বিশ্বম্ভরপুরের মুক্তিখলা গ্রামের ইউছুফ আলী বলেন,‘দুই সম্প্রদায়েই নতুন ধানের চালে পিঠা-পায়েশ করে পরস্পরকে খাওয়ানোর আয়োজন রয়েছে আগে থেকেই। মসজিদে মসজিদেও দোয়া হয়।’
বিশ্বম্ভরপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সোহেল আহমদ বলেন, ‘হালখাতা অনুষ্ঠান অর্থাৎ পুরাতন বছরের লেনদেন শেষ করে নতুন খাতায় নতুন ব্যবসা করার অনুষ্ঠান এই উপজেলায় একদিনেই হিন্দু-মুসলিমসহ সকল সম্প্রদায়ের মানুষ করে থাকেন। সেটি সরকারি অনুষ্ঠানের পরদিন ১৫ এপ্রিল হয়। সকলকে মিষ্টি খাওয়ানো হয়। দোকানে বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে দোয়া মাহ্ফিল হয়। হিন্দুরা করেন গণেশ পূজা, আমরা একে অন্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সম্পর্ক সুদৃঢ় করি।’
ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগরের ধানের আড়তের আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জ্যোতির্ময় রায় বলেন, ‘আমরা বেশিরভাগ ব্যবসায়ীই একদিনে হালখাতা করে থাকি। এবার সেটি হবে ১৫ এপ্রিল। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গণেশ পূজা করেন। মুসলিমরা দোয়া ও মিলাদ মাহ্ফিল করেন। পাওনাদাররা পুরাতন লেনদেন শেষ করে নতুন করে ব্যবসা শুরু করেন।’
জামালগঞ্জের সাচনা বাজারের ব্যবসায়ী আকবর হোসেন বলেন,‘জামালগঞ্জের ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগেই হালখাতা করবেন ১৫ এপ্রিল। আদিকাল থেকেই ছোটদের খেলনাসহ নানা পণ্যের মেলা এদিন বসে বাজারের বটতলায়।’
শাল্লার এয়ারাবাদ গ্রামের ব্যবসায়ী মো. উজ্জ্বল তালুকদার বলেন,‘১৫ এপ্রিল-ই আমাদের হালখাতা অনুষ্ঠান। এইদিনই গান-বাজনা আয়োজন হবে। হালখাতা উপলক্ষে মিলাদ-দোয়া এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা গণেশ পুজা করবেন।’
শাল্লার ছায়ার হাওরপাড়ের আনন্দপুরের কৃষক রবীন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন,‘চৈতের শেষ এবং বৈশাখের শুরু উপলক্ষে বিষু সংক্রান্তি’র উৎসব হয়। ঘরে নতুন চালের গুড়া দিয়ে আল্পনা আঁকা হয়। নতুন ধানের চালে পিঠা-পায়েস করে আনন্দ করা হয়।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের আব্দুল্লাপুরের অভয় দাস বলেন,‘ চৈত্রের শেষ এবং বৈশাখের শুরুতে জমি থেকে পাঁকা ধান কেটে এক মুঠা ধান ঘরের মধ্যম খুঁটিতে বেঁধে হিন্দু বাড়িতে প্রতীকী অর্থে লক্ষী বেঁধে রাখা হয়। এই উৎসবকে নবান্ন উৎসবই বলে।’
আব্দুল্লাপুর গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষানী বিনোদিনী দাস, লক্ষী রানী দাস, ছবি রানী দাস ও শিপ্রা দেব বললেন, ‘বৈশাখের প্রথম দিন, কিংবা এর আগে পরে ভাল দিন দেখে এই উৎসব হয়। জমির ধান পাঁকা শুরু হলে ধান কাটার আগে খাগের (নল খাগরা) আগা, কাঁচি, ফুল, দুর্বা রুমাল দিয়ে বেঁধে মহিলারা দলবদ্ধ হয়ে একটি ছেলে শিশুকে নিয়ে জমিতে যান, ওখানে কলা-সাবু ফল দিয়ে লক্ষীর উদ্দেশ্যে ভোগ লাগিয়ে ছেলে শিশুকে দিয়ে একমুঠা ধান কেটে তাকে কোন কথা বলতে না দিয়ে ধানের মুঠা বাড়িতে এনে ঘরের মধ্যম খুঁটিতে বাঁধার সময় বলা হয়-‘কিতা বান্দো রেবো? উত্তরে শিশুটি বলে ‘আগ’ বান্দি (বাঁধা) বারে বারে, লক্ষী বান্দি এক বারে’। এভাবে ৭ বার প্রশ্ন এবং উত্তর দেবার পর এ পর্ব শেষ করা হয়। দ্বিতীয় পর্বে নতুন ধান কুটে পানি মিশিয়ে সাদা রং করে ঘরের মেঝেতে আল্পনা (আরগ দেওয়া হয়) করে মধ্যম খুঁটিতে লক্ষীর ঘট বসানো হয়। এরপর কলা, সাবু, সুজি, লুচি, ফলসহ ভোগ লাগিয়ে আশপাশের অন্যদের নিমন্ত্রণ করে প্রসাদ খাইয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয়। যে বাড়িতে যেদিন ধান কাটা হবে, সে বাড়িতে ঐদিন হয় নবান্ন উৎসব।’ কৃষাণীরা জানালেন, পহেলা বৈশাখেই বেশির ভাগ কৃষক পরিবারে নবান্ন উৎসব হয়।
হাওরের দরিয়াবাজ গ্রামের রফনা বেগম, হালিম বেগম ও ছালেকুন নেছা বললেন, ‘পূর্ব কাল থেকেই আমাদের রেওয়াজ রয়েছে প্রথম যেদিন ধান কাটা হবে এবং ধান বাড়িতে আসবে সেদিন হাঁস-মুরগিকে ডেকে এনে খাওয়ানো হবে, নতুন ধানের চাল গুড়ি কুটে (গুড়া করে) পিঠা তৈরি করে আশপাশের সবাইকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হবে। কেউ বৈশাখের প্রথম দিন, কেউ বা ধান না পাকলে অন্যদিনে এই উৎসব করেন।’
দিরাইয়ের উজান ধলের বাসিন্দা দোলন চৌধুরী বলেন,‘ হাওরাঞ্চলে একসময় বর্ষবরণের দিন কবি গান, গাজীর গান, পুতুল নাচ, ভাটিয়ালী, মুর্শীদি, বাউল গান, যাত্রাপালাসহ লাঠি খেলা, বলি খেলা, ষাঁড়দৌড়, ঘৌড়দৌড় ইত্যাদি অনুষ্ঠান হতো, এখন আর এমন হয় না।’
শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস বলেন,‘চৈত্রের শেষে বৈশাখের শুরুতে নতুন ধান কাটার আনন্দে উদ্বেল থাকেন কৃষকরা। আর যদি পহেলা বৈশাখে হয় ধানা কাটা তাহলে এই উৎসবে আনন্দের মাত্রা বেড়ে যায়।’