‘হাওরবান্ধব’ খালের দাবি কৃষকদের

বিশেষ প্রতিনিধি
‘দেখার হাওরের মাঝখানে আছে রাঙাপাটি বিল, এই বিলের চতুর্দিকে ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে গ্রাম বা জনবসতি। রাঙামাটি বিলের আশপাশে যে সব গ্রামের কৃষকের জমি আছে, তাদের ওখানে জমি করার জন্য যেতে ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগে। আবার আসতে ২-৩ ঘণ্টা। বিশেষ করে ধান কেটে খলায় আনতে বড় বিপাকে পড়তে হয় কৃষকদের। খেতের (জমির) আইল দিয়ে ধানের ভার নিয়ে দিনে একবারের বেশি আসা যাওয়া কঠিন। হাওরের এমন দূরত্বের জমিতে অনেকে চাষাবাদই করেন না, জমি পতিত থাকে। হাওরে যদি পরিকল্পিতভাবে খাল খনন হতো, তাহলে মানুষের যাতায়াত সুবিধা হতো, সারা বছর খালে থাকা পানি সেচের কাজে লাগতো, বৃষ্টির পানিতে জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়ে খালে পানি চলে আসতো। এসব খালে সারা বছর মাছও থাকতো।’ দেখার হাওর পাড়ের জলালপুর গ্রামের কৃষক ফজলু মিয়া শুক্রবার দুপুরে এই প্রতিবেদকের কাছে এমন মন্তব্য করেন।
এই গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন,‘দেখার হাওরের ছাতনি বিলের পাড়ে আমার কিছু জমি আছে। এই জমিতে যেতে দুই তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আগে হাওরের উপরের অংশ থেকে থেকে লামার নদী পর্যন্ত খাল ছিল, এখন খাল ভরাট হওয়ায় উপরের অংশের মানুষের সেচেরও সমস্যা হয়, যাতায়াতেরও সমস্যা হয়।’
দেখার হাওর পাড়ের নাগের গাঁওয়ের কৃষক সচিন্দ্র কুমার দাস বললেন,‘দূরের জমির ধান ভাগালো বা নাইয়ারা কাটে না। এতো দূরে তারা যেতে চায় না। নিজে নিজে চাষাবাদ করে নিজেই কেটে আনা লাগে। বড় হাওরগুলোতে পরিকল্পিত যাতায়াত সুবিধা হলে চাষাবাদ বেড়ে যেতো।’ তিনি জানান, অনেক সময় কৃষকরা কাটা ধান যখন বাড়িতে আনতে পারে না, তখন নৌকা চালানোর জন্য বাঁধ কেটে দেবারও চেষ্টা করে।
সুনামগঞ্জের কেবল দেখার হাওরে এই সমস্যা নয়। বৃহৎ ৩৬ টি হাওরেই এমন সংকট রয়েছে। হাওরের মাঝখানে পৌঁছাতে পায়ে হাঁটা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তাও আবার সড়ক পথে পায়ে হাঁটা নয়। খেতের আইল (সীমানার জন্য সরু করে দেওয়া মাটি) দিয়ে পায়ে হাঁটা।
সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবির সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন,‘হাওরের মাঝখানের জমি চাষাবাদ করা খুবই কষ্টসাধ্য হওয়ায় অনেক জমিই পতিত থাকে। দূরে যেসব কৃষকরা জমি চাষাবাদ করেন তাঁদেরকে অবর্ণনীয় কষ্ট করতে হয়। আমি মনে করি বড় হাওরগুলোর গোপাটকে (হাওরের চলাচলের সড়ক) ডুবন্ত সড়ক করা যেতে পারে। সব মিলিয়ে পৌঁনে তিন’শ কিলোমিটার গোপাটকে ডুবন্ত পাকা সড়ক করলেই হাওরের এই সমস্যা দূর হয়ে যাবে। চাষাবাদের জমি আরো বাড়বে। ফসল সহজে ঘরে ওঠবে, জমি থেকে সরাসরি ক্রয় কেন্দ্রে চলে যাবে ধান।’
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বললেন,‘বড় হাওরগুলোতে যাতায়াত উপযোগি পরিকল্পিত খাল করা যেতে পারে। খালের পাড় দিয়ে ছোট ডুবন্ত সড়কও হতে পারে। তাতে হাওরের ফসল নৌকায় কিংবা অন্য পরিবহনে যাতায়াত করা যাবে। হাওরের পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়বে। সেচের সুবিধা হবে। এসব খালকে পরিচর্যাও করতে হবে।’
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী খুশী মোহন সরকার বলেন,‘বিএডিসি, পাউবো ও এলজিইডি’র উদ্যোগে সমন্বিতভাবে হাওরবান্ধব খাল হতেই পারে। যা যাতায়াত সুবিধাসহ সেচের কাজে আসতে পারে।’



আরো খবর