হাওরের উন্নয়নে আগে হাওর নীতি হোক

হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের সুরম্য ভবনটি মূলত মাকাল ফল। এই ভবনটিকে বন্ধ্যাও বলা চলে। কারণ এই ভবন থেকে কোন কিছু উৎপন্ন হয় না। এ হলো ইট-পাথরের অহেতুক এক জঞ্জাল। অথচ অবস্থা এমন হবার কথা ছিল না। হাওরাঞ্চলের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সার্বক্ষণিক গমগম করার কথা ছিল এ ভবনের। সরকার হাওরের উন্নয়ন ও বিদ্যমান সংকট নিরসনের উপায় উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়েই একটি পৃথক অধিদপ্তর করেছিল। এই অধিদপ্তরের ঢাকায় একটি প্রধান কার্যালয় আছে। হাওরের আরেক জেলা কিশোরগঞ্জেও রয়েছে সুনামগঞ্জের মত আরেকটি ভবন। এই ভবনগুলো তৈরি করতে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এখন এই তিন হাতি পালতেও প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সবই অপব্যয়। উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে না যে ব্যয়, তাকে অপব্যয় ছাড়া আর কিছু বলার উপায় নেই।
দেশের একটি বৃহত্তম অংশ হাওরাঞ্চল। এই হাওর খাদ্যশস্যের ভা-ার। এখানে উৎপাদিত হয় প্রচুর মিঠা পানির মাছ। এই অঞ্চল উদ্ভিজ ও প্রাণিজ বৈচিত্র সমৃদ্ধ। হাওরকে ঘিরে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। বিশাল হাওরাঞ্চল হতে পারে পরিকল্পিত পর্যটন এলাকা। এইসব সম্ভাবনার পাশাপাশি হাওরের রয়েছে নানা সংকট। অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা, শিলাবৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিয়মিত এই অঞ্চলের ফসল হানি ঘটে। বজ্রপাতে মৃত্যুজনিত দুর্ঘটনায় হাওরাঞ্চল সবার উপরে অবস্থিত। হাওর মধ্যবর্তী গ্রামগুলো ঢেউয়ের ভাঙ্গনের ঝুঁকির সামনে। বোরো ফসল তোলার পর হাওরের কৃষকের বছরের ছয় মাস কোন কাজ থাকে না। অবাধে যত্রতত্র ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচলের কারণে হাওরের পানি দূষণের শিকার। এই বিশাল ও সমৃদ্ধ মৎস্যভা-ার ক্রমশ মৎস্য শূন্য হতে চলেছে। হাওর এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা টাঙ্গুয়ার হাওর, যা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত ঐতিহ্যিক নিদর্শন, সেই টাঙ্গুয়া আজ আপন বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অকাল বৈধব্য বরণ করেছে। হাওরের এইসব সম্ভাবনা ও সংকট নিয়েই কাজ করার কথা ছিল নবগঠিত হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের। কিন্তু অধিদপ্তর গঠনের কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও কার্যত এটি এখনও কোন কাজে লাগতে পারেনি।
শুধু একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমেই যে কেবল হাওরের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে তা আমরা বিশ্বাস করি না। এই অধিদপ্তর ছাড়াও হাওরের উন্নয়নে নিয়োজিত রয়েছে সরকারের আরও বহু প্রতিষ্ঠান। কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। হাওর এলাকাকে ঘিরে তাদের রয়েছে নিজস্ব প্রচুর প্রকল্প ও কর্মসূচী। কিন্তু হাওরের মৌলিক উন্নয়ন কই? আসল কথা হলো, দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করা এবং লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা। যদি উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয় তাহলে কোন প্রতিষ্ঠান হওয়া না হওয়া নিয়ে উন্নয়নকে আটকানো সম্ভব নয়। অন্যভাবে বলা যায় ওই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে যেয়েই প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে যাবে। সুতরাং হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করল কি করল না তার আগে আমরা নিশ্চিত হতে চাই হাওরের উন্নয়নে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী সেটি জানতে। এই জায়গায় আমরা মনে করি সরকারের একটি হাওর নীতি প্রণয়ন করা উচিৎ। এই হাওর নীতিতেই থাকবে হাওরের সম্ভাবনা ও সংকট নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী। হাওর নীতি হয়ে গেলে হাওরের উন্নয়নে সরকারের কাজ করাও সুবিধাজনক হবে। এলোপাথাড়ি কাজ করার পরিবর্তে সুসংবদ্ধভাবে কাজ করা যাবে তখন। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড এ কাজটিই প্রথমে করতে পারে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সংবাদে দেখা গেল এই অধিদপ্তর ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্পও প্রণয়ন করেছে। যে প্রতিষ্ঠান এখনও হাওরে কাজই শুরু করল না তারা প্রকল্প প্রণয়ন করে ফেলেছে। বিষয়টি আশ্চর্যজনক নয় কি? এই হলো এলোপাথাড়ি কাজের নমুনা।