হাওরের কৃষকরা ধানে ধনী

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরে এবার ধানে ধনী কৃষকরা। নৌ-চলাচল শুরু হতেই ধানের দাম বেড়েছে গ্রামে গ্রামে। হাওরাঞ্চলের বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরে এখন গভীর রাত পর্যন্ত ধান কেনা-বেচা চলছে। গত এক সপ্তাহ হয় প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ হাজার মণ ধান কৃষকদের কাছ থেকে কিনছেন আড়ৎদাররা। ২৮-২৯ জাতের চিকন ধান এই মোকামে (হাটে) আড়ৎদাররা কিনছেন ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে। এছাড়া যেখানেই বড় নৌকা বা ট্রলার পৌঁছাচ্ছে সেখানেই ধান কিনতে যাচ্ছে ব্যাপারী। আড়ৎদার ও ব্যাপারীরা বলছেন, চাতাল বা মিলাররা এবং সরকারও এবার ধান আগে ভাগে কেনায় বাজারে ধানের দাম ওঠেছে।
শাল্লার আনন্দপুর গ্রামের কৃষক শহীদ মিয়া সোমবার ৭০ মণ মোঠা ধান ব্যাপারী’র কাছে বিক্রি করেছেন ৭২০ টাকা মণ দরে।
শহীদ মিয়া বললেন, গত ৮-১০ বছর এই সময়ে কোন ব্যাপারী গ্রামের ঘাটে নৌকা নিয়ে ধান কিনতে আসেনি, গত কয়েকদিন হয় ঘাটে ঘাটে ৭-৮ হাজার মণের ব্যাপারী’র নৌকা গ্রামের ঘাটে ঘাটে ভিড়ছে ধান কেনার জন্য। সোমবার আমি ৭০ মণ ধান বিক্রি করেছি ৭২০ টাকা দরে। আমার বাড়ি নদীর ঘাট থেকে একটু দূরে, না হয় আরেকটু বেশি পেতাম ধানের দাম।
একই এলাকার নোয়াগাঁওয়ের ঝন্টু দাস সোমবার মোটা ধান বিক্রি করেছেন ৭৭০ টাকা মণ দরে।
ঝন্টু দাস জানালেন, পাল্লায় না মেপে মিটারে মেপে বাড়ির ঘাটেই ব্যাপারীর কাছে ধান বিক্রির সুযোগ পেয়েছি, এজন্য বিক্রি করে দিলাম ধান।
এই গ্রামের বড় কৃষক মাখন লালা দাস সোমবার ২০০ মণ মোঠা ধান বিক্রি করেছেন বাড়ির ঘাটে আসা ব্যাপারীর কাছে। তিনি বললেন, মিটারে মেপে ৭৭০ টাকা মণে ধান বিক্রি করেছি। অন্যান্য বছর পাল্লায় মেপে বিক্রি করতাম। নানা কারসাজী করে ব্যাপারীগণ ওজনে ঠকে ৪২ কেজিতে মণ নিতো। বাড়িতে এসে মিটারে মেপে ৭৭০ টাকা মণে নিচ্ছে এবার এজন্য ২০০ মণ ধান একসঙ্গে বিক্রি করলাম।
হাওরাঞ্চলের বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরে সোমবার ২৯ জাতের শুকনা ধান বিক্রি হয়েছে ৮৫০- ৮৬০ টাকা মণ দরে। ২৮ জাতের চিকন ধান বিক্রি হয়েছে ৯০০ টাকা মণ দরে।
এই আড়তের আড়ৎদার সমিতির সাবেক সভাপতি জ্যোতির্ময় রায় জানালেন, ৪-৫ দিন হয় পানি বাড়ার পর থেকে এই হাটের ৩০ জন আড়ৎদার দিনে ১০ হাজার বস্তা অর্থাৎ ২০ হাজার মণ ধান কিনছেন কৃষকদের কাছ থেকে। নৌকায় বা ট্রলারে করে বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান বিক্রির জন্য নিয়ে আসছেন কৃষকরা।
তিনি জানালেন, ধানের মোকাম বা বেশি বেশি চাতাল মালিকদের এলাকা নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জ, আশগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুরের আড়ৎদাররা ধান কিনছে বেশি করে। সরকারও ১০৪০ টাকা মণ দরে সঠিক সময়ে এবার ধান কিনছে এজন্য ধানের বাজার ভালো। কৃষকরা ধানের দাম পাচ্ছেন।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের বাসিন্দা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, ২৯ জাতের ধান এই সময়ে ৮১০ থেকে ৩০ টাকা এবং ২৮ জাতের ধান ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে পাইকাররা কিনছে। কিন্তু অনেক প্রান্তিক কৃষক জমির ধান কাটা মাড়াইয়ের সময়ই আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায় কী-না, পরে বিক্রি করলে দাম পায় কী-না, মহাজনের ঋণের টাকা দেবার ভয়ে কাছা অবস্থায়ই ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে দিয়েছে। এবার যেভাবে প্রকৃতি সুযোগ দিয়েছে, আবহাওয়া ভালো ছিল, সরকার আগে ধান কেনা শুরু করেছে, সর্বোপরি কৃষকরা ভূর্তকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশক কিনতে পারলে, সহজভাবে কৃষি ঋণ পেলে হাওরে সম্ভাবনার দ্বাড় উন্মোচন হবে। হাওরের পতিত জমি সবই চাষের আওতায় চলে আসবে। উৎপাদন বেড়ে যাবে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী বললেন, গত ১০ বছরের মধ্যে এমন ভালো অবস্থায় দেখিনি কৃষকদের। কান্নাই কৃষকদের সঙ্গী। কিন্তু এবার ফলন হয়েছে ভালো, বড় বড় ব্যাপারী নৌকা নিয়ে ধান কিনতে আসছে বাড়ির ঘাটে। নদীর কাছে বাড়ি হলে মোটা ধানই ৮০০ থেকে ৮২০ টাকায় বিক্রি করতে পারছেন কৃষকগণ। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান দেওয়া নিয়েও থেমন আগ্রহ নেই কৃষকদের।
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জাকারিয়া মোস্তফা বলেন, সুনামগঞ্জের কৃষকদের কাছ থেকে এবার ৩২ হাজার ৬৬৪ মণ ধান কেনা হবে এবং জেলার ৩০০ মিলারের কাছ থেকে আতব সিদ্ধ মিলে ২৮ হাজার ৯৯৬ টন চাল কেনা হবে। কৃষকরা সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে আসছেন, তবে অন্যান্য বছরের মতো চাপ নেই। মিলাররা চাল দেই দিচ্ছি করছেন। এই জেলার মিলারদের মধ্যে প্রফেসনাল ব্যবসায়ী কম। এক বছরে সব লাভ করতে চান তারা। এবার লাভ কম, এজন্য আগ্রহ কম তাদের।