হাওরের ঘরে ঘরে সমাজতন্ত্রের বীজ বপন করেছেন শ্রীকান্ত দাশ-সেলিম

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ছিলেন চারণ কমরেড, বিশুদ্ধ মানুষ, মাটির মানুষ, বর্ষার পলি মাটি আবার চৈত্রের শক্ত মাটির ন্যায় আদর্শিক মানুষ। যিনি ভাটির হাওরের ঘরে ঘরে সমাজতন্ত্রের বীজ বপন করেছেন যিনি অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল। তাঁর জীবন, কর্ম ও ত্যাগ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমার পক্ষ থেকে সর্বোপরি সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে তাঁকে রেড স্যালুট।
তিনি রবিবার কমরেড শ্রীকান্ত দাশের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
শ্রীকান্ত সংহতি পরিষদ যুক্তরাজ্যের আয়োজনে লন্ডনে অনুষ্ঠিত শ্রীকান্ত দাশের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীর ভার্চুয়াল স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন শ্রীকান্ত সংহতি পরিষদের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং কমিউনিস্ট পার্টির যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ শাখার সভাপতি কমরেড অ্যাডভোকেট আবেদ আলী আবিদ।
স্মরণসভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, শ্রীকান্ত দাশ আমাদের জন্য অনুকরণীয়, অনুস্মরণীয়। আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম ও দাঁড়ানো জন্য এক খুঁটি ছিলেন।
স্মরণসভার শুরুতে সূচনা ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন শ্রীকান্ত সংহতি পরিষদের অন্যতম সংগঠক সাংবাদিক জুয়েল রাজ।
কমরেড শ্রীকান্ত দাশের ১৩তম প্রয়াণ দিবসের স্মরণসভায় আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে। তিনি বলেন, কমরেড শ্রীকান্ত দাশ পাঠ করলে দেখা যায় তিনি রাজনীতির বক্তব্য, কবিতা, গান লিখে থেমে যান নি। তিনি গান করে শোষক ও নিপীড়কদের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত, উদীপ্ত, উদ্দীপনা যোগিয়ে আন্দোলনের দানা বাঁধতে রাস্তায় নেমেছেন। উদাহরণ ভাটি অঞ্চলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। শুধু তাই নয় তাঁর প্যারোডি গানের ভাষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে, ভেজালের বিরুদ্ধে, অধিকার আদায়ের, সমাজ পরিবর্তনে নিপীড়িত মানুষকে জাগিয়ে সংগঠিত করতে আহ্বান করে।
যুক্তরাজ্য সিপিবির সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য ও উদীচীর কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি রফিকুল হাসান খান জিন্নাহ বলেন- ‘সত্যেন সেনের প্রতিচ্ছবি হচ্ছেন কমরেড শ্রীকান্ত’।
আরও বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সংগঠক ও লেখক মাহমূদ এ রউফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর জোবাইদা নাসরীন কণা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সুমন, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক উত্তম চৌধুরী, কবি ও রাজনৈতিক নেতা মুজিবুল হক মনি, সিলেট উদীচী সংসদের সভাপতি কবি এনায়েত হাসান মানিক, সিলেট প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্রত দাস, কবি ও লেখক নীলকান্ত দাশ, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিক হারুন অর রশীদ, যুক্তরাজ্যের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাবেক সভাপতি সৈয়দ এনাম, সিলেট জাসদ’র সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য ও ঢাকা দক্ষিন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সুকান্তি ভট্টাচার্য মনি,বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি শাল্লা শাখার সাধারণ সম্পাদক অনাদি তালুকদার, সাংস্কৃতিক কর্মী শিক্ষক এনায়েত সারোয়ার, শাল্লা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক চম্পা তালুকদার, কবি ও লেখক নীলকান্ত দাস, কমরেড শ্রীকান্ত দাশের পতœী ছায়া রাণী দাশ ও সন্তান দুরন্ত দাশ প্রমুখ।
স্মরণসভায় শ্রীকান্ত দাশের স্মরণ সহ গণসংগীত শিল্পী কমরেড ভবতোষ চৌধুরীর নাম উল্লেখপূর্ক এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। স্মরণসভায় কমরেড শ্রীকান্ত দাশের ‘কাউয়ায় ধান খাইলো রে খেদানোর মানুষ নাই’ গণসংগীত পরিবেশন করে শাল্লা উদীচীর সঙ্গীত শিল্পীরা। এছাড়া সঙ্গীত পরিবেশন ও স্মৃতিচারণ করেন সুনামগঞ্জের ‘শান্তিগঞ্জ সাংস্কৃতিক পরিষদ’র পক্ষ থেকে বাউল লাল শাহ ও তাঁর দল। শাল্লা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী পক্ষে থেকে গণসঙ্গীত করেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশের ছাত্র ওস্তাদ ইন্দ্রজিৎ দাশ, অধ্যাপক তরুন কান্তি দাশ, চম্পা তালুকদার ও উদীচীর সহশিল্পীবৃন্দ। এছাড়াও স্মৃতিচারন করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত কন্ঠে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন সিলেট উদীচী সংসদের সভাপতি কবি এনায়েত হাসান মানিক।
স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডক্টর বহ্নি শিখা দাশ পুরকায়স্ত, গণসঙ্গীত শিল্পী গোপাল দাস, সাংস্কৃতিক কর্মী শাহাব উদ্দীন বাচ্চু, শাল্লা উদীচীর সভাপতি অধ্যাপক তরুণ কান্তি দাশ, উদীচী সুনামগঞ্জ জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, সাংস্কৃতিক কর্মী বিমান তালুকদার, আজমিরীগঞ্জ কলেজের সহযোগি অধ্যাপক ও উদীচী কর্মী মানিক লাল চৌধুরী, যুক্তরাজ্য উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আখতার সোহেল, জাকির হোসাইন, শাল্লা উদীচীর সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য প্রাণকৃষ্ণ দাশ, শিল্পী আজিজ রেজা, সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা খালেদ টুটুল, দীপক দাস, হামিদা ইদ্রিস মুক্তা, কমরেড শ্রীকান্ত পুত্র সুশান্ত দাশ, পার্থ সারথি দাস, মান্না তালুকদার, টিংকু দাশ, শ্রীপান্থ দাশ, সুকান্ত দাশ, মুহিত সরকার, মিল্টন তালুকদার, সানী সরকার, ক্লিন্টন সরকার, রেমী তালুকদার, মৌসুমী তালুকদার প্রমুখ।
তাছাড়াও জাপান, জার্মান, ফ্রান্স, ইন্ডিয়া,নাইজেরিয়া সহ বিশ্বের নানা প্রান্তহতে অনেক গুণিজনেরা সম্পৃক্ত ছিলেন।
উল্লেখ্য, কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ১৯২৪ সালের ৫ জুলাই সুনামগঞ্জের শাল্লা থানার আঙ্গারুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা যোগেন্দ্র কুমার দাশ ও মাতা জ্ঞানদায়িনী দাশ। ৮ মাস বয়সে মাকে হারান। বাবার কাছ থেকেই মূলত সমাজতান্ত্রিক দর্শনের প্রতি অনুরক্ত হয়ে উঠেন।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন হলেও বড় আকারে ৫২র ভাষা আন্দোলন,৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার হঠাও আন্দোলনে চোখ রাখলে সমগ্র আন্দোলন সংগ্রামে কমরেড শ্রীকান্ত দাশের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। কিন্তু তার আগে ১৯৩৯ সালে হবিগঞ্জে কৈশোর কমরেড শ্রীকান্ত নেতাজী সুভাষ বসুর গলায় মালা পড়িয়ে এবং ১৯৪৩ সালে সুরমা উপত্যাকায় ৮ম কৃষক সম্মেলনে লালা শরদিন্দু দে, করুনাসিন্ধু রায়, অজয় ভট্টাচার্য, সুরত পাল, বীরেশ মিশ্র, ইরাবত সিংহ, কমরেড মনি সিংহ, রাখাল বাবু, কমরেড আদম আলী, কমরেড তারা মিয়া, প্রবোধ নন্দ কর, সত্যেন সেন, রনেশ দাশগুপ্ত, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী মতো মানুষের সান্নিধ্য পান। আর সেখান হতেই কমরেড শ্রীকান্ত দাশ পার্টির বিশ্বস্ত কর্মী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করার উৎসাহ পান।
প্রেসবিজ্ঞপ্তি