হাওরের পানির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে

সহযোগী দৈনিক সুনামকণ্ঠে হাওরের মিঠা পানিকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে অত্রাঞ্চলের অর্থনীতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এরকম সম্ভাবনা নিয়ে প্রাক্তন জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম ২০১৭ সনের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রস্তাব প্রেরণ করেছিলেন মর্মে তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। হাওরের স্বচ্ছ নীলাভ পানি উৎকৃষ্ট পানযোগ্য উপাদান যা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। আমরা জানি পৃথিবীতে বোতলজাত বার প্রক্রিয়াজাত পানির ব্যবসা ক্রমবর্ধমান একটি অর্থনৈতিক কর্মকা-। এই ব্যবসায় অনেক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানি নিয়োজিত রয়েছে। এখানে যদি হাওরের পানিকে এরকম বাণিজ্যিক কর্মকা-ের উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করা যায় তাহলে নিঃসন্দেহে এটি হাওর অর্থনীতির জন্য হবে বৈপ্লবিক ঘটনা।
গত ২২ মার্চ ছিল বিশ্ব পানি দিবস। দিবসটি বাংলাদেশে পালিত হয় ১১ এপ্রিল, অর্থাৎ গতকাল। এ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আমাদের পানি সম্পদের সম্ভাবনা বিষয়ে বলছেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে পানির জন্য হাহাকার চলে। সেসব দেশে পানির খুব অভাব। আমরা সেসব দেশে আমাদের সুপেয় পানি বিক্রি করতে পারি’। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৭৬ কোটি মানুষ সুপেয় পানির অভাবে ভুগছেন যা ২০৫০ সাল নাগাদ ৭০০ কোটি মানুষে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বে নিরাপদ পানির সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এমতাবস্থায় একসময়ে পানি জ্বালানি তেলের মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে একমত হয়েছেন। ক্রমাগত নদী হত্যা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়া, ভূ উপরিভাগের পানির মাত্রাতিরিক্ত ক্যামিকেল দূষণে আক্রান্ত হওয়া প্রভৃতি কারণে প্রতিনিয়ত সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে। সুপেয় পানির বিষয়ে আন্তর্জাতিক দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। এইরকম অবস্থায় আমাদের বিশাল হাওরের পানির ভিতরে যে অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে সেটি এখনই উপলব্ধি করতে হবে।
হাওরের ধান চাষ কৃষকদের জন্য লোকসানী কর্মকা-ে পর্যবসিত হতে যাচ্ছে। একসময় হাওরের মিঠা পানির মাছের ভা-ারও আজ উজাড় হওয়ার পথে। এরকম অবস্থায় হাওর অঞ্চলের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের হাওর নির্ভর জীবন ও জীবিকা যে হুমকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে এই পানিসম্পদ বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। হাওরকে জীবিত রাখতে তথা এই অঞ্চলের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন ধান নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা ও মৎস্য সম্পদকে গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি হাওরের নতুন নতুন সম্ভাবনাগুলো নিয়েও কাজ করতে হবে। আমাদের একজন জেলা প্রশাসক ২০১৭ সনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর মাধ্যমে যে সম্ভাবনার কথা জানান দিয়েছিলেন আমলাতান্ত্রিক ঘেরাটোপে সেই প্রস্তাব আটকে গেলেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী গতকাল যে সম্ভাবনার কথা জানালেন সেটি অন্তত যথাযথ গুরুত্ব পাক নীতিনির্ধারকদের কাছে এইটুকু আমাদের কামনা। প্রকৃতপ্রস্তাবে মানুষের সভ্যতা নিত্য নতুন সৃজনশীলতার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায়। সভ্যতা যেমন চলিষ্ণু বিষয় তেমনি এর টিকে থাকাও নির্ভর করে সৃজনশীলতার উপর। এক জায়গায় আটকে থাকলে এক সময় বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। বাংলাদেশ নামক ভূভাগটি প্রকৃতির অপার দানে সমৃদ্ধশালী। সমৃদ্ধশালী এবং অল্পতেই আমরা পেয়ে যাই বলে আমাদের জাতিগত সংগ্রামশীলতার জায়গাটি একান্তই দুর্বল। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে মহাবিশ্বে নিজেদের উচ্চতর জায়গা করে নেয়ার জন্য। তাই প্রকৃতি আমাদের যে ঐশ্বর্য দিয়েছে আসুন তা ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা এগিয়ে যাই।
এই প্রসঙ্গে ফেসবুক সহ বিভিন্ন মাধ্যমে কিছু বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ ও মতামত আমাদের দৃষ্টি কেড়েছে। অনেকেই বলছেন এইচএসসি বা ১৮ বছরের শিক্ষা সমাপনের পর সরকারের পক্ষ থেকে আর কাউকে শিক্ষা দান করার প্রয়োজন নেই। এইচএসসি পাস করার পর সবাই যার যার কর্মক্ষেত্র পছন্দ করে ফেলবেন এবং তাদেরকে সেভাবে সংশ্লিষ্ট পেশাগত শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করবে সরকার। এক্ষেত্রে তাঁরা সেনাবাহিনির কমিশন্ড পদে এইচএসসি পাস করার পর নিয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন, এখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের পরবর্তীতে সমরবিদ্যাকে প্রাধান্য দিয়ে ইন-সার্ভিস স্নাতক বা তদুর্ধ পর্যায়ের শিক্ষা দান করা হয়। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও বিশেষায়িত শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। তাঁরা ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন বা ব্যাচেলর ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, এইচএসসি পাস করার পরই শিক্ষক পদে প্রার্থী বাছাইর কাজ শেষ করে তাদেরকে প্রয়োজন মাফিক বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাঠানো। বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ এবং সেখানে সন্তোষজনক ফলাফলের ভিত্তিতে তাদের চাকুরি স্থায়ী করণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এরকম হলে স্নাতক বা এর চাইতে বেশি শিক্ষা দানে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ যেমন কমে আসবে তেমনি চাকুরি প্রাপ্তদের বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। সরকার বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। পৃথিবীর বহু দেশেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষা দান করা হয়ে থাকে। এই পর্যায়ে অতি মেধাবীদের রাষ্ট্রই উচ্চতর শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়ে যাবে। সকলেরই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন নেই।
শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রের মূল দর্শন কী সেটি স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর আজও স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশে নানান ধারার এক জগাখিচুরি মার্কা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এখানে যেমন মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না তেমনি এখানে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্তও প্রায় বিনা পয়সায় শিক্ষা দান করা হয়ে থাকে। আমরা মনে করি এইচএসসি পর্যায়ের পরবর্তী শিক্ষা গ্রহণের ধাপগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করা হোক। এতে প্রকৃত মেধাবীরাই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।