হাওরের রাজনীতিতে প্রাণসঞ্চার

বিশেষ প্রতিনিধি
ঈদের ছুটিতে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের চার উপজেলার (সুনামগঞ্জ—১ আসন, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর, তাহিরপুর) রাজনীতিতে প্রাণসঞ্চার ঘটেছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে নির্বাচনী অগ্রিম গণসংযোগ নেমেছেন। বিএনপির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ঘুরছেন হাওরের পাড়ে পাড়ে। এজন্য এই চার উপজেলায় ঈদের ছুটিতে রাজনৈতিক আলাপচারিতা রাজনৈতিক দলের অফিস থেকে চায়ের দোকান পর্যন্ত গড়িয়েছে।
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার বড় নির্বাচনী আসন সুনামগঞ্জ—১ (ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলা নিয়ে আসন) আসন। এই আসনের বেশিরভাগ এলাকা পড়েছে পাহাড়ের পাদদেশে এবং হাওরবেষ্টিত। জাতীয় নির্বাচনের প্রায় দেড় বছর বাকি থাকলেও ঈদের দীর্ঘ ছুটি কাজে লাগিয়েছেন এই আসনের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। ঈদের পরদিন থেকে শুক্রবার পর্যন্ত নির্বাচনী আসনের বিভিন্ন এলাকায় ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশপাশি ভোটারদের আগামী নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীতা জানান দিয়েছেন তাঁরা। এলাকার নেতা—কর্মীরা ব্যস্ত সময় পাড় করছেন নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক নেতার সান্নিধ্যে থেকে।
নির্বাচনী আসনের তিন বারের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ঈদের আগের দিন থেকে এলাকায় রয়েছেন। তিনি ঈদের ছুটিতে নির্বাচনী আসনের বিভিন্ন এলাকায় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি ঈদের দিন তাঁর আয়োজনে বাদশাগঞ্জ মাঠে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করেন। নিজে খেলায়ও অংশ নেন।
সংসদ সদস্য ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এই আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য। বললেন, আমার নির্বাচনী আসনের বেশিরভাগই হাওর এলাকা। বৃহৎ এই নির্বাচনী আসনে গণসংযোগে সময়ও বেশি লাগে। ঈদের ছুটিতে আমার চেষ্টা ছিল বেশি মানুষের সঙ্গে মেশার খেঁাজ খবর নেবার। আমি প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানাই। তবে সেটি যেন হিংসার পর্যায়ে না যায়।
এই আসনে গেল তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল। আগামী জাতীয় নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন প্রত্যাশী। ঈদের ছুটিতে তিনিও উপজেলার আনোয়ারপুর, বাদাঘাট, বালিজুরি ও তাহিরপুর সদরের বাসিন্দাদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, তিনবার মনোনয়ন চেয়ে মনোনয়ন বোর্ড ফেস করেছি। আগামী জাতীয় নির্বাচনেও চাইবো। ঈদে—পরবে মানুষ উচ্ছ্বসিত থাকেন। এই সময়ে কাছে গেলে স্মরণে থাকবে সকলের। এজন্য শনিবার পর্যন্ত গণসংযোগেই থাকবো।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রঞ্জিত সরকার গেল জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে দলের মনোনয়ন চেয়ে পান নি। আগামী জাতীয় নির্বাচনেও মনোনয়ন প্রত্যাশী তিনি।
রঞ্জিত সরকার জানালেন, ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর পাশপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণের আকাঙ্খার কথা জানাচ্ছেন নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের। তিনি জানান, বুধবার থেকে শুরু করেছিলেন শনিবার পর্যন্ত এলাকায় থাকবেন। তাহিরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর এবং জামালগঞ্জের কিছু অংশে শুভেচ্ছা জানানোর পাশপাশি দলকে চাঙা করার কাজ করবেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামিমা আক্তার খানমও এই আসনের জামালগঞ্জের ভোটার। তাঁর শ^শুর আলী আমজদ চৌধুরী আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এই আসনে একবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন। গেল নির্বাচনে তিনি এই আসনে দলের মনোনয়ন পেতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। এবারও তিনি এই আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানিয়েছেন তার সমর্থকরা। ঈদের ছুটিতে তিনি ঘুরেছেন হাওরের পাড়ে পাড়ে।
শামিমা আক্তার খানম বললেন, আমি কোন উদ্দেশ্য নিয়ে ঘুরছি না। দলের জন্য কাজ করে দলীয় সভানেত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে চাই। সরকারের উন্নয়ন মানুষের কাছে তুলে ধরাও আমার লক্ষ্য।
এছাড়া ধর্মপাশার বাসিন্দা আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাড. মো. গোলাম কিবরিয়াও পুরো নির্বাচনী এলাকায় ঈদ শুভেচ্ছার পোস্টার সাঁটিয়েছেন।
এই নির্বাচনী এলাকায় ঈদের ছুটিতে সাংগঠনিক তৎপরতায় পিছিয়ে নেই বিএনপির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও। গেল নির্বাচনে বিএনপির মনোনয় নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সাবেক সংসদ সদস্য নজির হোসেন ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই আছেন নির্বাচনী এলাকায়।
নজির হোসেন জানালেন, নির্বাচনী এলাকার মধ্যনগর, তাহিরপুর ও বংশিকুন্ডায় ঘুরে ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ’ ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে সকলকে যুক্ত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। এই সময়ে কয়েকটি হাওররক্ষা বাঁধেও গিয়েছেন তিনি।
জেলা বিএনপির সহসভাপতি, জেলা কৃষকদলের সভাপতি আনিসুল হক ঈদের দিন থেকেই গণসংযোগ শুরু করেছেন। মধ্যনগর, ধর্মপাশা ও তাহিরপুরে গণসংযোগ করেছেন তিনি। এ রিপোর্ট লেখার সময় (শুক্রবার দুপুরে) ধর্মপাশায় দলীয় নেতা—কর্মীদের ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর পাশপাশি মতবিনিময় করছিলেন এই বিএনপি নেতা।
আনিসুল হক বললেন, সংগঠনের তৃণমুলের নেতা কর্মীদের সংগঠিত করাই উদ্দেশ্য। ইউনিটে ইউনিটে গিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি সংগঠনের খেঁাজ খবর নিচ্ছি।
প্রসঙ্গত. ২০০৮’এর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য নজির হোসেনকে হারিয়ে এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।