হাওরে চলছে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন

গোলাম সরোয়ার লিটন

টাঙ্গুয়ার হাওরসহ তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে পোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছ নিধন চলছে। এলাকাবাসী বলছেন, নতুন ধানের গরম ভাতের সাথে কাঁচা মরিচ দিয়ে রান্না করে টাকি ও শোল মাছের পোনা খাওয়ার সংস্কৃতি হাওরাঞ্চলে দীর্ঘদিনের। তবে এক সময় তা সীমিত আকারে থাকলেও দিন দিন বেড়ে চলেছে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনামাছ ধরার প্রবণতা। হাওরপাড়ের সচেতন লোকজনের দাবি প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ রক্ষায় হাওরে পোনা মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ ধরা বন্ধে জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

মৎস্য আইনানুযায়ী , ১ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পোনা ঝাঁক, দম্পতি মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ ধরা নিষেধ। কেউ এ আইন অমান্য করলে অর্থদন্ড ও জেল কিংবা উভয়দন্ড হতে পারে।

তবে জেলে ও কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন , শুষ্ক মৌসুমে হাওরজুড়ে চলে বিভিন্ন বিল সেচে মাছ ধরা। তাই এখন ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা মাছ নিধনকে অপরাধ হিসাবে মনে করেন না তারা। উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যাতায়াতে দুর্গম বিশাল হাওরাঞ্চলে বিল সেচে মাছ ধরা ও পোনা মাছ নিধনে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। মৎস্য নিধনের অবৈধপন্থা বন্ধে সবাইকে সামাজিক উদ্যোগে শরিক হতে হবে ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার ২৩ টি হাওরের ধান কাটা ও মাড়াই এখন শেষ। শ্রমজীবী অনেকেই সকাল বেলা ঠেলা জাল নিয়ে বিভিন্ন হাওরে মাছের পোনা ধরতে বের হয়। তাছাড়া জেলেরাও হাওরে বিভিন্ন ধরণের জাল দিয়ে মাছ ধরে। ঠেলা জালে শোল, টাকি, কই, গজার, ঘনিয়া, লাছ মাছের পোনা ধরা পড়ে। তবে পোনার মায়ার কারণে এ সময় দম্পতি মাছও ধরা পড়ে। তাছাড়া জেলেদের বিভিন্ন ধরণের জালে ধরা পড়ছে ডিমওয়ালা রুই, ঘনিয়া ও কার্পজাতীয়সহ দেশি প্রজাতির টেংরা, মিনি ও লাছ মাছ।

উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের ইন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্য অখিল তালুকদার জানান, রামসার সাইট হিসাবে অন্তর্ভুক্ত টাঙ্গুয়ার হাওরের মুল অভয়াশ্রম লেউচ্চামারা, রুপাবই, হাতিরগাতা, তেঘুনিয়া, বেরবেরিয়া ও রৌয়াতে চলছে ডিমওয়ালা মা মাছ নিধন। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক জেলে টাঙ্গুয়ার হাওরে ডিমওয়ালা মা মাছ ও পোনা মাছ ধরে। এমনিতেই কমছে রুই মাছের সংখ্যা। আর এভাবে যদি চলতে থাকে তবে হাওরের রুই বিলুপ্ত হতে পারে।

হাওরপাড়ের বাসিন্দারা জানান, হাওর যদি পানিতে একদিনে ডুবে যায় তবে পোনা মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ কম ধরা পড়ে। তবে যদি ধীরে ধীরে পানিতে ডুবে তবে পোনাসহ সবধরণের মাছ ব্যাপকভাবে ধরা পড়ে। তাছাড় এখনো কোন হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করেনি। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে হাওরে পানি ঢুকলে ¯্রতো তৈরী হবে। আর এতেই রুই, ঘনিয়াসহ বিভিন্ন মাছ ডিম ছাড়বে। কারণ পানির ¯্রােত না থাকলে এসকল মাছ ডিম ছাড়তে পারেনা।

টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের মন্দিয়াতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সান্জু মিয়া বলেন, যদি আমরা মৎস্য আইন মেনে মাছ ধরি তবে হাওরবাসীর মাছের চাহিদা পূরণ হবে। জেলেরাও বৈধ উপায়ে মাছ ধরে প্রচুর পরিমাণে অর্থ আয় করতে পারবে।

হাওর বাঁচাও সংগঠনের উপজেলা যুগ্ম আহবায়ক ফেরদৌস আলম বলেন, এক সময় স্বল্প আকারে পোনা মাছ কৃষকরা শখের বসে ধরত। এ সময় দম্পতি মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ ধরা নিষেধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সব ধরণের মাছ নিধনের উৎসব চলছে। মৎস্য সম্পদ রক্ষায় এটা বন্ধ হওয়া উচিত। যদি প্রতি বছর আইন মেনে হাওরে মাছ ধরা হয় তবে মিঠা পানির মাছের কোন অভাব পড়বেনা হাওরবাসীর।

তাহিরপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সারওয়ার আলম বলেন, আমরা পোনা মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ নিধনে জনসচেতনতামুলক কার্যক্রমসহ নানামুখী কার্যক্রম নিয়ে থাকি। এসব কাজ প্রতিহত করতে জেল ও জরিমানাও করা হয়।