হাওরে দুর্নীতি : ৩৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

সু.খবর ডেস্ক

হাওরে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি, অনিয়ম ও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে করা মামলায় ৩৪ জনকে বাদ দিয়ে ৩৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) অনুমোদন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

রবিবার দুদক থেকে নতুন ছয়জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে ৩৩ জনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগপত্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য জানিয়েছেন।

অভিযোগপত্র থেকে বাদ যাওয়া অন্যতম আসামিরা হলেন- পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট অঞ্চলের প্রাক্তন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হাই (পিএলআর), প্রাক্তন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম (বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী), স্থানীয় যুবলীগের নেতা ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইব্রাহিম অ্যান্ড শামিম আহসান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. বাচ্চু মিয়া।

২০১৭ সালের ২ জুলাই হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে সুনামগঞ্জ জেলা পাউবোর ১৫ কর্মকর্তা এবং ৪৬ ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানসহ ৬১ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক মো. ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় এ মামলা দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের দিনেই আসামিদের মধ্যে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরখাস্তকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফছার উদ্দীন ও মো. বাচ্চু মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছিল তদন্তকারীরা।

মোট ৩৩ জন আসামির মধ্যে ২৭ জন হলেন- বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দপ্তর) মো. আফছার উদ্দীন, সহকারী প্রকৌশলী (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) মো. খলিলুর রহমান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ঢাকা) মো. শহিদুল্লা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (নেত্রকোনা) ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ খান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (কক্সবাজার) খন্দকার আলী রেজা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ঢাকা) মো. শাহ আলম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সাতক্ষীরা) মোহাম্মদ মাহমুদুল করিম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ঢাকা) মো. মোছাদ্দেক ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ঝালকাঠি) সজিব পাল।

অন্যদিকে, ঠিকাদাররা হলেন- মো. আফজালুর রহমান, পার্থ সারথী পুরকায়স্থ, শেখ মো. মিজানুর রহমান, আবুল মহসীন মাহবুব, নিয়াজ আহমেদ খান, মিলন কান্তি দে, খান মো. ওয়াহিদ রনি, মো. সোয়েব আহমেদ, মো. ইউনুস, মো. আব্দুল কাইয়ুম, মো. আতিকুর রহমান, মো. গোলাম সরোয়ার, মো. নুরুল হক, মো. শাহরিন হক মালিক, মোকসুদ আহমেদ, মো. সাইদুল হক, কাজি হাসিনা আফরোজ ও শেখ আশরাফ উদ্দিন।

এছাড়া তদন্তের পর নতুন করে যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন- পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট সার্কেলের সহকারী প্রকৌশলী লিংকন সরকার, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) রঞ্জন কুমার দাস, সহকারী প্রকৌশলী (সুনামগঞ্জ) অনিক সাহা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইমরান হোসেন, নীহার রঞ্জন দাস ও ঠিকাদার মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রাইভেট) লিমিটেডের পরিচালক (কন্সট্রাকশন) মো. শরিফুল ইসলাম।

চার্জশিট থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ৩৪ জন হলেন- পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম সরকার, প্রাক্তন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হাই, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দিপক রঞ্জন দাস, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পুর)/শাখা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম, মো. বরকত উল্লাহ ভূঁইয়া, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, ঠিকাদার খন্দকার শাহিন আহমেদ, মো. জিল্লুর রহমান, সজীব রঞ্জন দাস, এম এ হান্নান, খাইরুল হুদা চপল, কামাল হোসেন, কাজি নাছিমুদ্দিন, খন্দকার আলী হায়দার, মো. আকবর আলী, মো. রবিউল আলম, মো. আবুল হোসেন, শুভব্রত বসু, মোজাম্মেল হক মুনিম, মো. বাচ্চু মিয়া, বিপ্রেশ তালুকদার বাপ্পি, মো. জামিল ইকবাল, চিন্ময় কান্তি দাস, মো. খাইরুজ্জামান, ম. মফিজুল হক, মো. মোখলেছুর রহমান, মো. রেনু মিয়া, মো. শামসুর রহমান, আব্দুল মান্নান, মো. মাহতাব চৌধুরী, লুৎফুল করিম, হাজি মো. কেফায়েতুল্লা, হুমায়ন কবির ও ঠিকাদার মো. ইকবাল মাহমুদ।

২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল দুদকের পরিচালক বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে টিম কাজ শুরু করে। এই টিমের সদস্যরা হলেন উপ-পরিচালক আবদুর রহিম, সহকারী পরিচালক সেলিনা আক্তার মনি, সহকারী পরিচালক মো. ফারুক আহমেদ এবং উপ-সহকারী পরিচালক নেয়ামুল কাজী।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

২০১৭ সালের এপ্রিলে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪টি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। হাওরে ফসলহানির পর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরপর দুদক ১৩ এপ্রিল হাওরের ফসলহানি ও বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের তদন্তে দুদকের পরিচালক বেলাল হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে। এরপর ১৫ এপ্রিল পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফছার উদ্দিনকে সুনামগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ফসলহানির ঘটনায় ৩০ মে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২ মে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (উত্তর-পূর্বাঞ্চল) মো. আবদুল হাই, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম ও সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান শেষে ২ জুলাই মামলা হয়। মামলায় পাউবোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, ঠিকাদারদের সঙ্গে অবৈধ যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়ে। আর ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ঠিক সময়ে কাজ শেষ না করে কৃষকদের ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

পরের মাসে ৩ আগস্ট আরেকটি মামলা করে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি। সুনামগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতে জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে মামলাটি করেন সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল হক। এ মামলায় আসামি করা হয় ১৩৯ জনকে। দুদকের মামলার ৬১ আসামি এই মামলারও আসামি। এর বাইরে ৭৮ জন হলেন ৩৯টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর থেকে দুই মামলার অভিযোগসহ আসামির তালিকা একীভূত করে তদন্ত করে দুদক।

দুদক মামলা করার পরদিনই ঢাকা থেকে পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের বরখাস্ত হওয়া সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফছার উদ্দিন ও ইব্রাহিম ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. বাচ্চু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর দেড় মাস পর ১৫ আগস্ট রাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঠিকাদার খায়রুল হুদা ওরফে চপলকে গ্রেপ্তার করে দুদক। খায়রুল হুদা সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ও সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি। তিনি এবারের উপজেলা নির্বাচনে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া বাচ্চু মিয়া ও খায়রুল হুদা তদন্ত শেষে আসামির তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

জেলা প্রশাসনে হিসাব অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে ওই সময় ১৫৪টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১২ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৯০ কৃষক পরিবার।