‘হাওরে বাঁধ নির্মাণ এখন লাভজনক ব্যবসা’

স্টাফ রিপোর্টার
হাওরে ফসল রক্ষার নামে বাঁধ নির্মাণ এখন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক শ্রেণির কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রভবাশালীরা এখন এসব নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রভাবশালীরা আবার রাজনৈতিক মদদপুষ্ট। হাওরের যেখানে-সেখানে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এখন বাঁধ দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। এক সময় এসব অপ্রয়োজনীয় বাঁধই হাওরবাসীর জন্য গলার কাঁটা হয়ে দেখা দেবে।
হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ পর্যবেক্ষণ শেষে বুধবার সুনামগঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়কালে এসব কথা বলেছেন হাওর এডভোকেসী প্লাটফরমের (হ্যাপ) নেতারা।
গত ১৫ মার্চ থেকে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং সুনামগঞ্জ জেলার হাওরে সংগঠনের পক্ষ থেকে বাঁধের নির্মাণ কাজ পর্যবেক্ষণ করেন তারা।
এরপর বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরিতে এই অভিজ্ঞতা বিনিময় হয়। এতে মূল বক্তব্য তুলে ধরের আয়োজক সংগঠনের যুগ্ম আহবায়ক শরিফুজ্জামান শরিফ।
শরিফুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বলেন, হাওরে এক সময় বাঁধের কাজে বরাদ্দ একেবারে কম ছিল। কিন্ত এখন ইতিবাচক দিক হলো সরকার হাওরবাসীর প্রতি আন্তরিক। বাঁধ নির্মাণের জন্য যা বরাদ্দ চাওয়া হয় সরকার সেটি
দিয়ে থাকে। সমস্যা হলো স্থানীয়ভাবে যারা প্রকল্প নির্ধারণ ও বস্তবায়নের যুক্ত আছেন তাদের মধ্যে। দেখা গেছে যেখানে দরকার নেই, সেখানে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। অক্ষত বাঁধেই আবার নতুন করে বরাদ্দ ধরা হয়েছে। এবার সুনামগঞ্জে প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দ দুটোই বেড়েছে। গত বছর যেখানে ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, এবার বরাদ্দের চাহিদা আছে ১৩১ কোটি টাকা। তাই হাওরে বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে (পিআইসি) যুক্ত হতে রীতিমত লড়াই চলে। এটা এখন হাওরে বড় ব্যবসা।
হাওরে বাঁধের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে শরিফুজ্জামান বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বাঁধে মাটির কাজ প্রায় শেষ। কিন্তু প্রতিটি বাঁধের ঘাস লাগানো এবং মাটি শক্তকরণের কাজ বাকি আছে। অনেক বাঁধে আমরা এসব কাজের ঘাটতি লক্ষ্য করেছি। আবার কোথাও কোথাও বাঁধের উচ্চতা বেশি হওয়ায় বর্ষায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।
শরিফুজ্জামান বলেন, হাওর এবং হাওরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নালাগুলো ভরে যাচ্ছে। প্রতি বছর বাঁধ দেওয়ার কারণেই এটা হচ্ছে। এখন হাওর থেকে পানি ধীরে নামে। এর কারণ হচ্ছে হাওর ভরাট হয়ে যাওয়া। পরিকল্পিতভাবে যেখানে দরকার সেখানে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমরা সেটি গত তিন বছর ধরে বলে আসছি। এটি না করতে পারলে এক সময় এসব বাঁধই হাওরবাসীর গলার কাঁটা হিসেবে দেখা দিবে। হাওর আর হাওর থাকবে না।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আয়োজক সংগঠনের সদস্য জুলফিকার আলী রানা।
সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলায় এবার ৭৪৫টি প্রকল্পে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ হচ্ছে। বাঁেধর কাজে সময়সীমা ছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। পরে আরও ১৫দিন সময় বাড়ানো হয়।
জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, হাওরে বাঁেধর কাজ ৯৫ ভাগ শেষ। ৭৪৫ প্রকল্পের মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭৩৭ টি প্রকল্পের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। এখন বাঁধে ঘাস লাগানোসহ আনুসাঙ্গিক কাজ হচ্ছে। তিনি বলেন,‘প্রকল্প নির্ধারনের জন্য উপজেলা কমিটি আছে। যাচাই-বাছাই করেই প্রতিটি প্রকল্প নেওয়া হয়। যেখানে প্রয়োজন সেখানেই বাঁধের কাজ হয়। কোনো অপ্রয়োজনীয় কাজ হচ্ছে না।’