হাওরে ব্লাস্ট ছত্রাকের প্রাদুর্ভাব- আক্রমণের আগেই প্রতিরোধের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

বিশেষ প্রতিনিধি
ব্লাস্ট ছত্রাক জনিত রোগ। এটি প্রাণ রোগের ছত্রাক। বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায় এই ছত্রাক। এটি ফসলের বিপজ্জনক রোগ। আন্তর্জাতিকভাবে ফসলের এ রোগকে বিপজ্জনক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ছত্রাক এখন গ্রামেও ছড়াচ্ছে। এই জাতীয় ছত্রাকের আক্রমণ ঠেকাতে সতর্ক থাকতে হবে। ভবিষ্যতে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি তত্ত্ববিদ প্রফেসর নজরুল ইসলাম ও উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ ড. আব্দুল মুকিত সোমবার দিনভর সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের শনি ও মাটিয়ান হাওরে ব্লাস্টে আক্রান্ত জমির ধান সরেজমিনে ঘুরে দেখার পর এই প্রতিবেদকের কাছে এমন মন্তব্য করে বললেন,‘কৃষকরা যে সময়ে ব্লাস্টের প্রতিরোধক জমিতে স্প্রে করেন, ঐ সময়ে ছত্রাকনাশক কোন কাজে আসবে না। মনে রাখতে হবে এই ছত্রাকের আক্রমণের প্রতিকার করা যায় না। এটি আক্রমণ হবার আগেই প্রতিরোধ করতে হবে।’
কৃষি তত্ত্ববিদ নজরুল ইসলাম বললেন,‘এই ছত্রাক পাতায়ও ধরে, আবার শীষেও আক্রমণ করে। ব্লাস্টের আক্রমণের পর মনে হবে ধান পাকা শুরু হয়েছে। কিন্তু শীষ হাতে নিয়ে চাপ দিলে দেখা যাবে চিটা। ভেতরে চাল নেই। তাহিরপুরের শনি ও মাটিয়ান হাওর ঘুরে এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা হয়েছে এই দুটি হাওরের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ফসল ব্লাস্টে নষ্ট হতে পারে। তবে এখনই এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে না, ধান বের হলে বুঝা যাবে কী পরিমাণ ক্ষতি হবে।’
তিনি জানালেন, বিভিন্ন কারণে এই রোগ হতে পারে। বীজের কারণে হতে পারে। আবহাওয়ার কারণে হতে পারে। দিনের বেলা তাপমাত্রা বেশি থাকলে এবং রাতে যদি অপেক্ষাকৃত
ঠান্ডা বেশি থাকে বা তাপমাত্রা কম থাকে কিংবা দিনে তাপমাত্রা বেশি রাতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি বা কুয়াশা থাকলে এই রোগ ছড়ায় বা দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে। বাতাসের মাধ্যমে রোগ ছড়ায় বেশি।’
তিনি জানালেন এই রোগ প্রতিরোধ করতে হলে ধান বের হবার আগেই ছত্রাক নাশক স্প্রে করতে হবে। রোগাক্রান্ত হবার পর ছত্রাক নাশক স্প্রে করলে কোন লাভ হবে না।
এই কৃষিবিদের মতে ভবিষ্যতের সতর্কের জন্য ভাল বীজ নিতে হবে। এক বস্তা বীজে ৫ টি ছত্রাক আক্রান্ত বীজ থাকলেই জমিতে রোগ ছড়াতে পারে। যে এলাকার ধানের জমি ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়নি ঐ এলাকার জমির ধান বীজের জন্য সংগ্রহ করে রাখলে ভাল হবে। একই জমিতে পরের বছর একই জাতের ধান না করে অন্য জাতের ধান করলে ভাল হয়। এই রোগ ঘাসের মধ্যেও থাকে। এজন্য জমি সব সময় পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।’
গত কয়েক দিন ধরে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে এই রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রচারপত্র বিলি হচ্ছে। এই প্রচার পত্রে উল্লেখ রয়েছে পাইরিকুলারিয়া গ্রিসিয়া নামের একটি ছত্রাকের আক্রমণে ব্লাস্ট রোগ হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এটি ধানের প্রধান রোগ হিসেবে পরিচিত। অনুকূল আবহাওয়া এবং ব্যাপক এলাকায় রোগ সংবেদনশীল জাত চাষ করলে অনেক সময় এ রোগ মহামারী আকারে দেখা দিতে পারে। তখন এ রোগ ধানের ফলনের ৮০ ভাগ পর্যন্ত ক্ষতি করতে পারে। রোগটি ধানের পাতা, গিঁট, শিষের গোড়া বা শাখা প্রশাখা এবং বীজে আক্রমণ করে থাকে। আক্রান্ত পাতায় প্রথমে হালকা ধুসর বা সাদা ও কিনারা বাদামি রঙ ধারণ করে। দাগগুলো একটু লম্বাটে হয় এবং দেখতে অনেকটা চোখের মত। একাধিক দাগ মিলে বড় দাগের সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত পুরো পাতা এমনকি পুরো গাছটি মারা যেতে পারে। গিঁট আক্রান্ত হলে আক্রান্ত স্থান কালো ও দুর্বল হয়। আক্রান্ত গিঁটের উপরের অংশ মারা যায়। শিষের গোড়া আক্রান্ত হলে বাদামি দাগ পড়ে। আক্রান্ত অংশ পঁচে যায় এবং ভেঙে পড়ে। ধান পুষ্ট হওয়ার আগে আক্রমণ হলে ধান চিটা হয়ে যায়। ব্লাস্ট রোগ বীজের মাধ্যমে এক মৌসুম থেকে অন্য মৌসুমে ছড়ায়। তাছাড়া রোগাক্রান্ত গাছের জীবাণু বাতাস ও পোকার মাধ্যমেও এক জমি থেকে অন্য জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। রোগাক্রান্ত বীজ ও আশপাশের আক্রান্ত গাছ থেকেও এ রোগের জীবাণু এসে থাকে। মূলত সংবেদনশীল ধানের জাত চাষ করলে এ রোগ বেশী হয়। বেলে মাটিতেও এ রোগ বেশী হয়। জমিতে মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সার এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম পটাশ সার দিলে এ রোগের আক্রমণ বেশী হয়। দীর্ঘদিন জমি শুকনা অবস্থায় থাকলেও এ রোগের আক্রমণ হতে পারে। তাছাড়া রাতে ঠান্ডা, দিনে গরম ওসকালে পাতায় শিশির জমা হলে এ রোগ দ্রুত ছড়ায়।’
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ রোগ তত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. আব্দুল লতিফ বলেন,‘বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত এই রোগ ছড়ায়, আক্রমণের ৫ দিনের মাথায় চিটা হয়ে যায় ধান। রোগ দেখা দেবার পর দমন করা যায় না। বসন্ত বা কলেরার যেমন প্রতিরোধক আবিস্কার হয়েছে। রোগ দেখা দেবার আগেই প্রতিরোধক টিকা নিতে হয়। ঠিক তেমনি এই ছত্রাক রোগ দেখা দেবার আগেই টুপার, নাটিভো, ভিসা, ঝিল, মেকটিভো ওষুধ স্প্রে করতে হয়। ধানের ফুল হবার পর্যায়েই বিকাল বেলা সঠিক জাতের ছত্রাক নাশক স্প্রে করতে হবে। ৭ দিন পর একইভাবে আরেকবার স্প্রে করতে হবে। দুইবার স্প্রে করলে এই ছত্রাক প্রতিরোধ করা যাবে।’
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন,‘সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরে মার্চ মাসে ব্লাস্ট ছত্রাকে ১২০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছিল। নতুন করে এই মাসে ৭৮ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে। এই সপ্তাহে অনেকটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে এই ছত্রাক।’



আরো খবর