হাওরে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ এবং মৃত্যু ঝুঁকির এলাকা সুনামগঞ্জ। এ বছরের মে মাসের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিনই এ জেলায় কৃষক, জেলেসহ শিক্ষার্থীদেরও বজ্রপাতে মৃত্যু ঘটেছে। বজ্রপাত গবেষক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ময়মনসিংহের) পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. এম.এ ফারুখ জানালেন, সুনামগঞ্জের উত্তরে মেঘালয় ও খাসিয়া পাহাড় থাকায় ঐ দিক থেকে আসা ঠান্ডা এবং শুকনো বাতাস এবং দক্ষিণের গরম ও ভেজা বাতাসের সঙ্গে সংমিশ্রণ ঘটে বজ্রপাত তৈরির অনুকূল পরিবশে তৈরি করে। এজন্য সুনামগঞ্জে বজ্রপাত বেশি হয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সুনামগঞ্জই দেশের সবচাইতে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ জেলা।’
ছয় বছর আগে ২০১২ সালের ১১ আগস্ট সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার সরস্বতীপুর গ্রামের একটি মসজিদের পাশে বজ্রপাতের ঘটনায় ১৩ মুসুল্লি নিহতের ঘটনা ঘটে। এরপর প্রতিবছরই এপ্রিল, মে এবং জুন মাসে এই অঞ্চলে অসংখ্য মানুষের বজ্রপাতে মৃত্যু ঘটছে। মঙ্গলবারও সুনামগঞ্জের ৩ উপজেলায় ৩ কৃষক ও ২ কৃষাণি নিহত এবং আরও ৭ জন আহত হয়েছেন। গত পহেলা মে থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৫জনের মৃত্যু ঘটেছে।
দেখার হাওরপাড়ের জগন্নাথপুরের কৃষক আসকর আলী জানালেন, চোখের সামনে গত পহেলা মে চাচাতো ভাই আব্দুর রশিদ বজ্রপাতে নিহত হওয়ার পর আকাশে মেঘ দেখলেই আতঙ্কে ঘর থেকে বের হন না তারা।
কেবল আসকর আলীর এমন আতঙ্ক নয়, পুরো হাওরাঞ্চলেই এই অবস্থা দেখা দিয়েছে।
দেখার হাওরপাড়ের জলালপুরের কৃষক ফজলু মিয়া বললেন,‘হাওরে ধান থাকলে ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করেই হাওড়ে ছুটেন কৃষকরা। পেটের ক্ষুধার কাছে মৃত্যু ভয় তুচ্ছ হয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিককালের বজ্রপাতের ঘটনায় ভয় পেয়েছে সকলেই।’
দেখার হাওরপাড়ের জগন্নাথপুরের কৃষক ছুরত মিয়ার দাবি এক সময় (ব্রিটিশ শাসনামলে) বজ্র নিরোধক মৌজার পিলার ছিল। এ কারণে বজ্রপাত কম হতো, এই পিলারগুলো চুরি করে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ কারণে বজ্রপাত বেড়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. এম এ ফারুখ বললেন.‘সীমানা পিলার চুরি করে নিয়ে যাওয়ায় বজ্রপাত বেড়েছে এমন মন্তব্যের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সীমানা পিলার এখন হাঁটু সমান বিধায় এটির বজ্রনিরোধক হিসাবে কাজে আসার কথা নয়। বজ্রনিরোধক পিলার কমপক্ষে ৫০ থেকে ৬০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন হতে হবে। সেই পিলার অবশ্যই ধাতব পিলারের এবং পিলারের সঙ্গে আর্থিং তার মাটির নিচ পর্যন্ত থাকতে হবে। এমন পিলার স্থাপন করলেও আশপাশের কতটুকু অংশ নিরাপদ হবে সেটি বলা মুশকিল।’
এই বিজ্ঞানী বললেন,‘ধাতব পিলার স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয় সাপেক্ষে। ধাতব পিলারের নীচে কংক্রিটের আস্তরণও দিতে হবে। কেউ কেউ প্রস্তাব দিচ্ছেন ফোন কোম্পানীগুলোর টাওয়ারে বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র (ষরমযঃরহম অৎবংঃবৎ) বসানোর। সেটি যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ বজ্রপাতে ঐ টাওয়ারের ক্ষতি হবার ভয়ে তারা নিশ্চয়ই তাদের টাওয়ার ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।’
এই বিজ্ঞানীর মতে বজ্রপাত প্রতিরোধের জন্য জমির আইলে (সীমানায়) ৩০ ফুট দূরে দূরে তালগাছ এবং মাঝখানে সুপারী গাছ লাগানো যেতে পারে। এই তাল গাছগুলো বজ্রপাত প্রতিরোধের মতো উচ্চতা সম্পন্ন হতে কমপক্ষে ১৬ বছর লাগবে।’ তিনি বলেন,‘বজ্রপাতকে নিয়ন্ত্রণের কোন উপায় নেই, যেকোন সময় যেকোন ভাবেই ঘটতে পারে। বজ্রপাতের সংখ্যা নিরোপন প্রযুক্তিও বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে না। বায়ু দূষণে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে বজ্রপাত বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। এবার জুন জুলাই মাসে অন্যান্য বছরের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে বজ্রপাত বাড়ার আশংকা আছে।’
বজ্রপাত প্রবণ এলাকার মধ্যে এবার মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা রয়েছে জানিয়ে এই বিজ্ঞানী বলেন,‘গত ৮ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বজ্রপাতে দেশে যত প্রাণহানি ঘটেছে এরমধ্যে মে মাসেই ৩২ শতাংশ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।’
বজ্রপাতে প্রাণহানি বিষয়ে করণীয় বিষয়ে ড. এম এ ফারুক বলেন,‘মানুষকে সচেতন করা ছাড়া আপাতত কোন উপায় নেই। মে-জুন মাসে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন বা কালো হয়ে যেতে দেখলে কৃষক, শ্রমিক- জেলেরা যাতে নিরাপদ অবস্থানে থাকেন সেটি প্রচার করতে হবে। হাওরে এই সময়ে আবহাওয়া খারাপ দেখলে ভারী কৃষিজ যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ ভারী কৃষি যন্ত্রপাতি বজ্রপাত আকর্ষণ করে।’
সাম্প্রতিককালে হাওরে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ড. এম এ ফারুখ বলেন,‘হাওরের বড় বড় বৃক্ষরাজি কেটে ফেলা হয়েছে। এক সময় উঁচু গাছে গিয়ে বজ্র পড়তো। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এ কারণে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে।’
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস বলেন,‘একসময় জেলার প্রায় সকল অঞ্চলে বৃক্ষরাজি ছিল, তালগাছ ছিলো, এখন সেগুলো নেই। বজ্রপাতে এজন্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে আহতদের চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। এখানে বার্ন ইউনিট না থাকায় আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সিলেটে পাঠাতে হয়। সিলেটে যেতে যেতে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। এখন যেভাবে সুনামগঞ্জে প্রতিদিনই বজ্রপাত হচ্ছে সেখানে এই জেলা সদরে বার্ন ইউনিট থাকা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার বদ্ধপরিকর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বজ্রপাতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বজ্রপাত নিরোধে বিগত মৌসুমে সুনামগঞ্জে ৩০ হাজারের মতো তালগাছ রোপন করা হয়েছে। মানুষকে সচেতন করারও নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোন কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে মানুষ উপকৃত হবে।’