হাওরে সোনালী উৎসব- কৃষকের আনন্দকে স্থায়ী করুন

এক মৌসুমের বোরো ধান প্রকৃতির আশির্বাদ ধন্য হওয়ায় হেসে উঠেছে পুরো হাওর- হাওরাঞ্চল। হাওরের হাসি ছড়িয়ে গেছে কৃষক কৃষাণীর মুখে, তাদের সন্তান সন্ততির চেহারায়। এই বোরো ধানই হাওরের মেরুদ-। গত দুই বছর পরপর ফসল হানি ঘটায় কৃষকের মেরুদ- ভেঙে গিয়েছিল। এবার অনেক কষ্টে তারা চাষাবাদ করেছেন আর প্রতিক্ষণ আকাশের দিকে চেয়ে থেকেছেন। যাবতীয় প্রাযুক্তিক প্রসারের মাঝেও বোরো ধানের প্রাণ এখনও প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি এমনসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিক্ষণ লড়াই করে অবশেষে গোলায় তুলতে হয় এই সোনার ফসল। সুতরাং যে বছর প্রকৃতি সহায় থাকে এবং কৃষকরা গোলা ভরা ধান দেখতে পাওয়ার আশাবাদ দেখেন মাঠের কাঁচা পাকা ধানের দিকে তাকিয়ে, সেবছর তো আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার বছরই বটে। এবার সেই বছর। এখন পর্যন্ত ব্লাস্ট নামক এক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগের আক্রমণ ভিন্ন আর কোন বিপদের দেখা মিলেনি হাওরে। হাওরে এখন পুরোদমে চলছে ধান কাটা। আর এই ধান কাটা, মাড়াই, শোকানো, বস্তায় ঢোকানো; সবকিছু মিলিয়ে হাওরে এখন চলছে উৎসব। ধান কাটার শ্রমিক সংকট এবারকার একটি বিপর্যয়ের নাম। তবে শ্রমিক সংকটের কারণে পাকা ধান মাঠে পড়ে থাকতে দিতে পারেন কি কোন কৃষক ? পারেন না বলেই বহু কৃষক পরিবারের সকল সদস্য মিলে নেমে পড়েছেন হাওরে। যারা কলেজে স্কুলে পড়ছেন তারাও ছুটি নিয়ে চলে এসেছেন এলাকায়, ধান কাটায় পরিবারের অন্যদের পাশে সহায় হতে। এই উৎসবের আনন্দ থেকে বাদ যেতে চায় না শিশুরাও। তারাও স্কুলের ফাঁকে, টিফিন পিরিয়ডে দৌঁড়ে চলে আসে বাড়ির আঙ্গিনায় অথবা মাঠের খলায়। ধান শোকানো সহ অন্যান্য হালকা কাজে সহায়তা করছে তারা। শ্রমজীবীরা এই মৌসুমে হাওরেই বসতি গড়েছেন। গতকালকের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জগন্নাথপুরের হাওরে হাওরে হোড়া বাঁধার ছবি সমেত একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। হাওরের দূরবর্তী অঞ্চলের ধান কাটার সুবিধার্থে শ্রমিকরা অস্থায়ীভাবে হাওরেই থাকছেন। সেখানেই খাওয়া দাওয়া, সেখানেই ঘুম। এমন উৎসব হাওরে চলবে পুরো বৈশাখ জুরে। শহরে থেকে এ লৌকিক উৎসবের প্রকৃত স্বরূপ বোঝা সম্ভব নয়। এটি কোন ধরনের নাগরিক আয়োজন দ্বারা প্রদর্শনও সম্ভব নয়। এ কেবলই প্রাণের সাথে প্রাণের মিলন আর অনুভবের বন্ধন। হাওরের কৃষক ও কৃষির সাথে সম্পৃক্ত বৃহত্তর জনসমাজ জাতীয় উন্নয়নে এইভাবে রেখে যাচ্ছেন সবচাইতে বড় অবদান।
ধান কাটা শেষ হওয়ার পর এই কৃষকরা যখন ধানের ন্যায্যমূল্য পাবেন না, যখন সরকারি গোদামে গিয়ে প্রকৃত কৃষকরা ফিরে আসবেন ব্যর্থতা নিয়ে, তখন আসলে কৃষকসমাজের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ ঘটে সেটি আসলে বাংলাদেশেরই দুঃখ। আমরা প্রতিনিয়ত এমন রক্তক্ষরণের হাত থেকে বাঁচার আকুতি প্রকাশ করি। প্রতিবছর প্রকৃত কৃষকদের নিকট থেকে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচীর আওতায় ধান ক্রয়ের অনুরোধ জানাই। কিন্তু সেসব বঞ্চনা আর দীর্ঘশ্বাসের কাহিনি হয়েই পুঞ্জিভূত হতে থাকে। তারপরেও আমাদের আকুলতার শেষ নেই। এবারও একই আকুলতা আমাদের। সাহস বাড়ে, যখন দেখি, এবার এই প্রথম হাওরে বাঁধ হয়েছে বাঁধের মতো। তাই আশাও বাড়ে এবারই নাহয় সেই প্রথম বছরটিই হোক যেবছর সবগুলো সরকারি খাদ্যগোদাম প্রকৃত কৃষকদের নিকট থেকে ধান কিনবে। যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তাঁরা কর্ণপাত করুন এই আকুলতায়।