হাওরে সৌন্দর্য্য বাড়াচ্ছে কৃষকের ৩ হাজার করচ গাছ

ধর্মপাশা প্রতিনিধি
বৃক্ষ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাওরের কান্দায় তিন হাজার করচ গাছ রোপন করে রীতিমত তাক লাগিয়ে দিয়েছেন গোপেশ চন্দ্র সরকার নামে এক কৃষক। বছর দুয়েক আগে রোপন করা গাছগুলো কয়েক কিলোমিটার জায়গা জুড়ে মাথা উচু করে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। যা এর অদূরে দক্ষিণ দিক দিয়ে চলে যাওয়া সড়কের পথচারীদের আকৃষ্ট করছে সহজেই। শীতের বিকেলে অনেকেই বেড়াতেও যান সেখানে। মধ্যনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের বোয়ালা হাওরের মাইজপাড়ার উত্তর থেকে পশ্চিম দিকে রাজেন্দ্র খলা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার জায়গাজুড়ে এসব করচ গাছ দেখতে পাওয়া যায়। গোপেশ চন্দ্র সরকারের এমন উদ্যোগ একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে তুলছে অন্যদিকে হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গোপেশ চন্দ্র সরকারের বাড়ি মধ্যনগর সদর ইউনিয়নের জমশেরপুর গ্রামে। পাশেই বোয়ালা হাওর। বর্ষায় পুরো হাওর পানিতে নিমজ্জিমত থাকে। তখন কান্দার ওপরেও ৫/১০ পানি থাকে। তিনি ২০১৯ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ওই স্থানে ১০০ করচ গাছের চারা রোপন করেন। পরবর্তী বর্ষায় চারাগুলো তলিয়ে যায়। কিন্তু ছয় মাস পর হাওরের পানি শুকিয়ে গেলে তিনি দেখেন যে চারাগুলো সতেজ রয়েছে। ফলে পরের বছর তিনি তিন হাজার করচ গাছের চারা সংগ্রহ করেন এবং ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মৌখিক অনুমতি নিয়ে বোয়ালা হাওরের ওই কান্দার প্রায় তিন কিলোমিটার জায়গাজুড়ে চারাগুলো রোপন করে দেন। গোপেশ জেলার তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রাম থেকে প্রতিটি ৮০ টাকা দরে করচ গাছের চারাগুলো সংগ্রহ করেন। আর তা বহন থেকে শুরু করে রোপন পর্যন্ত প্রতিটি চারার পেছনে খরচ পড়েছে ১২০ টাকা করে। রক্ষণাবেক্ষণসহ আনুসাঙ্গিক কাজে এখন পর্যন্ত তাঁর সাড়ে চার লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। আর এ অর্থের যোগান দিতে নিজের সঞ্চয় ভাঙতে হয়েছে তাঁর। লাখ খানেক টাকা ধার ও তাঁর মেয়েকে বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত শখের মোটরসাইকেলটি বন্ধক দিতে হয়েছে ৪৫ হাজার টাকায়। এরই মধ্যে বন্ধকের ৩০ টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু এখনও ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় মোটরসাইকেল ফেরত পাননি তিনি। এছাড়াও চারাগুলো রোপনের পর ধারের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে এলাকার বাইরে গিয়ে কাজও করতে হয়েছে তাঁকে।
গোপেশ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘হাওর এলাকায় প্রচুর খাস জমি রয়েছে। কান্দাগুলোতে হাওর উপযোগী গাছ লাগিয়ে বৃক্ষরোপন কর্মসূচিকে সফল করা যেতে পারে। প্রতিটি কৃষক যদি ১০০ করে করচ গাছের চারা রোপন করেন তাহলে কান্দাগুলো যেমন একদিকে বনায়নে পরিপূর্ণ হবে অন্যদিকে গাছগুলো বড় হলে প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে শুধুমাত্র ডালপালা বিক্রি করে কৃষকের বিকল্প অর্থ উপার্জনের সুযোগ করা যেতে পারে।’
ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না বলেন, ‘করচ গাছ পানি সহনশীল। এসব গাছ হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে তাকে (গোপেশ) আমাদের পক্ষ থেকে পরামর্শ প্রদান ও সর্বাত্মক সহযোগীতা করা হবে।’
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ হাসান খান বলেন, ‘গোপেশ চন্দ্র সরকারের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এমন উদ্যোগের ফলে হাওরের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পাশাপাশি বর্ষায় মাছের বংশ বৃদ্ধি ও খাদ্য যোগানে সহায়ক হবে। আরও কেউ এমন উদ্যোগ নিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।’