হাওর অঞ্চলের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা নিরসনে প্রস্তাবনা

হিরন্ময় রায়
উন্নয়নের অভিযাত্রায় এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। নেতৃত্বের ইতিবাচক ভূমিকায় বিভিন্নমূখী উন্নয়ন কর্মকান্ডে দ্রুত বদলে যাচ্ছে দেশের চারপাশের দৃশ্যপট। অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন গ্রামীণ পটভূমিকেও পাল্টে দিচ্ছে। স্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্ধনশীল অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশকে। দরিদ্র দেশের তকমা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে নি¤œমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ। একটি হল ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন এবং অন্যটি হল বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করা ।
এ দু’টি লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান সরকার তাঁর সকল কর্মকান্ড পরিচালনা করে চলেছে। এ দু’টি লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হল জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের দু’টি অর্জন নিশ্চিত করা। এ দু’টি অভীষ্টের একটি হল টেকসই উন্নয়ন অর্থাৎ ‘সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্রের অবসান’। অন্যটি হল ‘লিঙ্গ সমতা অর্জন এবং নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন’। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থাও এ দু’টি অভীষ্ট অর্জনে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে দেশের পাহাড়ী অঞ্চল এবং হাওর অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের উন্নয়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এ নিবন্ধে আমরা বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা ও সেই প্রতিবন্ধকতা জয় করে উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোকপাত করব।
বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা মূলত হাওরাঞ্চলে অবস্থিত। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫% রয়েছে এ হাওর অঞ্চলে। ফলে হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত না করতে পারলে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে না। হাওর জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল সুনামগঞ্জ জেলা। এ জেলার মানুষের জীবিকা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হল কৃষিকাজ। বোরো ফসল হল এ জেলার অন্যতম ফসল। এ জেলায় রয়েছে ২,৭৬,৪৩৪ হেক্টর আবাদি জমি এবং এ জেলার মোট জনসংখ্যার ৪৩.৮৬% লোক কৃষির উপর নির্ভরশীল। বছরের ৬/৭ মাস সময় উত্তরের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল ও মৌসুমী ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে এ জেলার সিংহভাগ অঞ্চল পানির নীচে তলিয়ে থাকে। ফলে বছরের ঐ সময় এ অঞ্চলের মানুষদের মাছ ধরা ছাড়া আর তেমন কোন আয়ের উৎস থাকে না। বছরের অবশিষ্ট সময় কৃষিকাজ, বালু ও পাথর কোয়ারিতে শ্রমিকের কাজ ও দিনমজুরি ইত্যাদি অন্যতম পেশা। বেশীর ভাগ সময়ই আগাম বন্যায় একমাত্র বোরো ফসলও তলিয়ে যায়। ফলে স্বাধীনতার এতো বছর পরও কৃষকদের কাংক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। ভূ-প্রাকৃতিক বৈরীতায় যেখানে পুরুষদের কর্মসংস্থানই অপ্রতুল সেখানে হাওরের নারীদের কর্মসংস্থান রীতিমতো দু:স্বপ্ন। পরিবারে একদিকে পুরুষ সদস্যদের একমুখী অনিশ্চিত আয় ও অন্যদিকে নারীদের বেকারত্ব পরিবারের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ডেকে এনেছে, যার অনিবার্য পরিণতি হল দারিদ্র ও আর্থিকভাবে ভূমিকা পালনে ব্যর্থ নারীদের জন্য লিঙ্গ বৈষম্যের অভিশাপ। ফলে ১ নং অভীষ্ট অর্থাৎ “সর্বত্র সব ধরণের দারিদ্রের অবসান’’ এবং ৫নং অভীষ্ট “লিঙ্গ সমতা অর্জন এবং নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন” এখানে চ্যালেঞ্জের
এখানে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এ দু’টি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমবায় অধিদপ্তর রাখতে পারে কার্যকরি ভূমিকা, কিন্তু কিভাবে? আসছি সে কথায়। বাংলাদেশের সংবিধানে ৫৯(২) অনুচ্ছেদে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি সংস্থাসমূহকে জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একই ভাবে একই সংবিধানে ২৯(৩) সরকারকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে দেশের অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের এবং ১৪ -১৬ নং অনুচ্ছেেেদ কৃষক ও শ্রমিকের ভাগ্যেন্নয়নে নির্দেশনা দেয়া আছে।। তাঁর উপর সরকারের সামনে রয়েছে আরও দু’টি অভীষ্ট-২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন ও ২০৪১-এ উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর। এই প্রেক্ষাপটে সমবায় অধিদপ্তর হাওর অঞ্চলের জন্য দুটি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে এ অঞ্চলের অনগ্রসর দু’টি জনগোষ্ঠী মৎস্যজীবী এবং নারীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের দারিদ্র নিরসন ও নারী ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারে।
হাওর অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম জেলা হল সুনামগঞ্জ। ২৬টি নদী, ১৩৩ টি হাওর, ৪২০টি ২০ একরের উপরের জলমহাল এবং ৬২৫ টি ২০ একরের নীচের জলমহাল নিয়ে এ জেলার হাওর অঞ্চল বিস্তৃত। এ জেলায় রয়েছে ৯২ হাজার নিবন্ধিত জেলে ও ৭৬ হাজার কার্ডধারী জেলে। এছাড়া কৃষকরাও মৌসুম ভিত্তিক মাছ ধরে তাদের জীবকায়ন করে থাকেন। বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে অনগ্রসর মৎস্যজীবীদের দারিদ্র দূরীকরণের জন্য ‘সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি’২০০৯’ প্রণয়ন করেন এবং সরকারি জলমহালগুলো মৎস্যজীবীদের সংগঠন মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি এবং সংস্থাকে ইজারা দেয়ার বিধান করেন। ফলে মৎস্যজীবী ছাড়া এ জলমহালগুলো অন্য কেউ ইজারা নিতে পারে না। এই বিশাল সুযোগ মৎস্যজীবীদের সামনে খোলে দেয় অপার সম্ভাবনার দ্বার। কিন্তু জলমহালগুলোর ইজারামূল্য পরিশোধের জন্য আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় এই সুযোগ তারা কাজে লাগাতে পারেনি। এখানে জন্ম নেয় একশ্রেণির মধ্যসত্ত্বভোগী যাদের স্থানীয় ভাবে “মহাজন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই মহাজন শ্রেণীর লোকজন হল স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, যারা সমিতিকে জলমহালের ইজারা মূল্য, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ফিসিং এর ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থের যোগান দেয় এবং জলমহাল থেকে প্রাপ্ত আয়ের সিংহভাগ ( প্রায় ৯০%) তাদের পকেটস্থ করে। ফলে মৎস্যজীবীদের ভাগ্য সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সমবায় অধিদপ্তর রাখতে পারে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা। সমবায় অধিদপ্তর মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়ন শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে সরকারি জলমহাল নীতি’২০০৯ এর ৩(ক) মোতাবেক সমবায় অধিদপ্তর ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ( গঙট) সম্পাদন করতে পারে। এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় এই হাওর জেলার একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক জলমহাল দীর্ঘমেয়াদে (১২ বছরের জন্য) ভূমি মন্ত্রণালয় সমবায় অধিদপ্তরকে হস্তান্তর করবে। সমবায় অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলা সমবায় কার্যালয় এর মাধ্যমে এই জলমহালগুলোর তীরবর্তী মৎস্যজীবীদের নিয়ে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি গঠন ও নিবন্ধন করবে। নিবন্ধন শেষে প্রকল্পের আওতায় ঐ সকল মৎস্যজীবীদের সমবায় ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ, মৎস্যচাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। প্রশিক্ষণ শেষে এ সকল সমবায় সমিতির বিপরীতে জলমহালগুলো ইজারা দেয়া হবে এবং জলমহালগুলোর ইজারা মূল্য পরিশোধ, সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও ফিসিং এর জন্য প্রথম দুই বছরের যাবতীয় ব্যয় পরিশোধের জন্য সমিতিগুলোকে স্বল্প সুদে প্রকল্প তহবিল হতে ঋণ সরবরাহ করা হবে। প্রকল্প তহবিলে প্রাথমিক ভাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেবে, যা হতে হবে ফেরতযোগ্য। তৃতীয় বছরে ফিসিং করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সমিতিগুলো এ ঋণ পরিশোধ করবে এবং অবশিষ্ট টাকা দিয়ে জলমহালের খাজনা পরিশোধের জন্য একটি তহবিল গঠন করবে এবং উদ্বৃত্ত টাকা নিজেদের মধ্যে বন্টন করবে। এভাবে ধাপে ধাপে সমিতিগুলো জলমহালের খাজনা নিজেদের তহবিল হতে পরিশোধ করতে সক্ষম হবে এবং জলমহাল হতে সৃষ্ট সুবিধা নিজেরাই ভোগে সক্ষম হবে। ফলে মৎস্যজীবীদেও দারিদ্র বিমোচনের প্রকল্প উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব হবে।
(২)
হাওড় অঞ্চলের মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা পঞ্চাশ ভাগ (৫০%) নারী। এই নারীদের জন্য ভূ-প্রকৃতিগত প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বোরো ধান তোলার দুই মাস সময় ছাড়া বছরের প্রায় দশ মাস সময় কোন উৎপাদনমুখী বা আয়মূলক কাজ থাকে না। নারীদের দ্বারা বহিরাঙ্গনে কোন কাজ না থাকায় নারীরা আয়মূলক কর্মকান্ডে জড়িত হতে পারেন না। তাছাড়া গ্রামগুলোতে পর্যাপ্ত উঁচুভূমি না থাকায় ও গো-খাদ্যের অভাব থাকায় গবাদি পশুপালনও সম্ভব হয় না। এ সমস্যা দূরীকরণের জন্য সুনামগঞ্জ জেলার হাওড় অঞ্চলে বসবাসকারী নারীদের আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলে জীবিকায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকল্প থেকে নারীদের কুটির শিল্পজাত পণ্য যেমন বাঁশ, বেত ও পাট থেকে পণ্য তৈরী, সেলাই, বাটিক, বুটিক, নকশী কাঁথা তৈরী, ধাত্রী সেবা, গোবাদি পশু ও হাঁস মুরগি পালন, আঙ্গিনা কৃষি, হাওড়ের কান্দায় রবি শস্য চাষাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে তাদের আয়সক্ষম জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে। একই সাথে তাদের কাজ করার পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রকল্প তহবিল হতে নারীদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান করে প্রশিক্ষণ শেষে সংশিষ্ট ক্ষেত্রে তাদের বিনামূল্যে উপকরণ সহযোগিতা প্রদান, তাদের উৎপাদনক্ষেত্র হিসেবে প্রতিটা গ্রামে বিদ্যুত সংযোগসহ ও স্যানেটারীসুবিধা সম্পন্ন একটি করে নারীসেবা কেন্দ্র নির্মাণ করা যায় যেখানে এক সাথে ১৫০/২০০ জন নারী একই সময়ে কাজ করতে পারবেন।
লেখক: সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা।