হাওর কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হাসান হামিদ
কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বারবার উঠে এসেছে হিজলের কথা। তিনি লিখেছেন,
‘পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;
পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;
পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু’জনার মনে;
আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে।’
আমি জন্মেছি সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের হিজল ঘেরা এক গ্রামে। আমার জেলার প্রায় সবটাই বিস্তীর্ণ হাওরবেষ্টিত বিশাল নিম্নভূমির ভাটি অঞ্চল। এখানকার সবুজ প্রকৃতিজুড়ে খেলা করে অপার সৌন্দর্যের মুগ্ধবিস্ময়। হাওরের বিশাল গভীর জলরাশির মাঝখানে চিরহরিৎ বর্ণের হিজলের সারি সারি বৃক্ষ ভ্রমণপিয়াসী যে কোনো পর্যটকের দৃষ্টিকে শুধু সচকিতই করে না, সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় হৃদয়ের গভীরে তৈরি করে ভালোলাগার অসাধারণ অনুভূতি। বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশের প্রকৃতি ও অর্থনীতিতে হাওর অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার লেখার আজকের বিষয় সেটাই।
হাওর হলো সাগরসদৃশ পানির বা জলের বিস্তৃত প্রান্তর। প্রচলিত অর্থে হাওর হলো বন্যা প্রতিরোধের জন্য নদীতীরে নির্মিত মাটির বাঁধের মধ্যে প্রায গোলাকৃতি নিচুভূমি বা জলাভূমি। তবে হাওর সব সময় নদী তীরবর্তী নির্মিত বাঁধের মধ্যে নাও থাকতে পারে। হাওরের কথা বলতে গেলে সাগরের দৃশ্য মনে ভেসে উঠে। অভিধান ও শব্দের ইতিহাস বলে সাগর শব্দের অপভ্রংশ শব্দ হাওর। কালক্রমে উচ্চারণ বিবর্তনে সাগর থেকে সায়র এবং সায়র থেকে হাওর শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে প-িতগণ ধারণা করেন। বর্ষাকালে বড় বড় হাওরে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যোগাযোগের জন্য পাড়ি জমালে এবং নৌকা ভাসালে মনে হয় অকুল দরিয়ার কূল নাই কিনারা নাই। হাওরের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতি বছরই মৌসুমী বর্ষায় বা স্বাভাবিক বন্যায় হাওর প্লাবিত হয়, বছরের কয়েক মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে এবং বর্ষা শেষে হাওরের গভীরে পানিতে বা জলে নিমজ্জিত কিছু স্থায়ী বিল জেগে উঠে। গ্রীষ্মকালে হাওরকে সাধারণত বিশাল মাঠের মতো মনে হয়, তবে মাঝে মাঝে বিলে পানি বা জল থাকে এবং তাতে মাছও আটকে থাকে। সমগ্র বর্ষাকাল জুড়ে হাওরের পানিকে সাগর বলে মনে হয় এবং এর মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলোকে দ্বীপ বলে প্রতীয়মান হয়। বছরের সাত মাস হাওরগুলো পানির নিচে অবস্থান করে। শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ পানি শুকিয়ে গিয়ে সেই স্থানে সরু খাল রেখে যায় এবং শুষ্ক মৌসুমের শেষের দিকে সম্পূর্ণ শুকিয়ে যেতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে হাওরের পুরো প্রান্তর জুড়ে ঘাস গজায় এবং গবাদি পশুর বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠে। হাওরে আগত পানি প্রচুর পলিমাটি ফেলে যায় যা ধান উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
প্রাচীনযুগে হাওরাঞ্চলের ইতিহাস আমরা খুব একটা খুঁজে পাই না। সেই সময়ে হাওরের অবস্থান কী ছিল তা স্পষ্টভাবে জানা যায়না। তবে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, প্রাচীন কালে বাংলাদেশ বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল। যেমন- পুন্ড্র, বরেন্দ্র, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, গৌড় ইত্যাদি। তবে এসব জনপদের অবস্থান নিয়ে পন্ডিতদের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ অনুমান করেন হরিকেল নামে জনপদে সিলেটসহ হাওরাঞ্চলের অবস্থান ছিল। বিখ্যাত পর্যটক মেগাস্তিনিসের খ্রিঃ পূর্ব ৩০২ অব্দে ভারত ভ্রমণের অনন্য দলিল “ইন্ডিকা” গ্রন্থ ও মানচিত্র থেকে জানা যায়, হাওরাঞ্চল বিশাল কামরুপ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। যোগিনীতন্ত্র অনুসারে কামরুপ (বর্তমান আসাম) রাজ্যের এলাকা ছিল দৈর্ঘ্যে ৮০০ মাইল এবং প্রস্থে ২৪০ মাইল। বিখ্যাত পরিভ্রাজক হিউ এন সাঙ সম্ভবত ৬৫০ খিষ্টাব্দে এবং ইবনে বতুতা ১৩৩৩ ও ১৩৪৫/৪৬ খিষ্টাব্দে তার ভ্রমণ কাহিনী কিতাবুল রেহালা লিখেন। তাতে তিনি হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্যে কতোটা মুগ্ধ হয়েছিলেন বা বৈরী আবহাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন তার বিবরণ পাওয়া যায়।
আমাদের দেশের হাওর অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান নিম্ন এবং অসমতল। এ এলাকা জুড়ে শিরা-উপশিরার ন্যায় পেঁচিয়ে আছে অনেক নদ-নদী ও খাল-বিল। বর্ষাকালে সাগরের ন্যায় বিশাল জলরাশি দূর থেকে গ্রামগুলি ভাসমান দ্বীপের ন্যায় পানির উপর টলমল করে। এ সময় নৌকা এলাকার একমাত্র যানবাহন। তবে হাওরাঞ্চলে শুকনো মৌসুমে ধু-ধু মাঠ কৃষকের কলকাকলীতে মুখরিত হয়। মাঠের পর মাঠ, মাঝে মাঝে গ্রাম। কোনো সময় সবুজ, কোন সময় সর্ষে ফুলের হলুদ দৃশ্য যেন সবুজ রঙে মিশ্রিত হলুদের সমারোহ। আবার বৈশাখে মাঠ ভরা পাকা ধান সোনালী রঙের বাহার। এ দৃশ্য কত যে নয়নাভিরাম, যা প্রকৃতির নৈস্বর্গিক লীলাক্ষেত্র। কৃষি এ এলাকার প্রধান জীবিকা এবং মৎস্য চাষ উপজীবিকা। কিন্তু সীমাহীন সমস্যা ও বৈরী আবহাওয়া সত্বেও এ অঞ্চল খাদ্য ও মৎস্য ভান্ডার নামে পরিচিতি লাভ করে। এভাবে হাওরের সম্পদ জাতীয় অবদানে উজ্জল স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে ছোট-বড় ৪১৪টি হাওর, জলাশয় ও জলাভূমি রয়েছে। জলমহাল রয়েছে ২৮ হাজার। বিল রয়েছে ছয় হাজার ৩০০। এর মধ্যে হাওরের আয়তন ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর। ভাটির দেশ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জে রয়েছে ১৩৩টি, সিলেটে ৪৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে ৪টি; কিশোরগঞ্জে ১২২টি, নেত্রকোনায় ৮০টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩টি হাওর রয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিয়দংশ প্রভৃতি জেলার প্রায় পাঁচ হাজার হাওর-বাঁওর, বিল-ঝিল নিয়ে গঠিত হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। সে তুলনায় হাওরাঞ্চলের শিক্ষা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের সরকারের নজর চাহিদার কাছাকাছি নয়। হাওরাঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি, মতান্তরে আরো বেশি। হাওরবাসীর প্রায় ৯০ ভাগ জনগোষ্ঠী কৃষিকাজ করে। বাকি ১০ ভাগের ৫ ভাগ মৎস্যচাষ আর ৫ ভাগ ব্যবসা, চাকরি ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত।
আমাদের হাওরাঞ্চলে একটি মাত্র ফসল- বোরো। বছরে একটি মাত্র ফসল হলেও বিরল বিচিত্র দেশি জাতের অনেক ধান এখনো এ হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়। বছরে প্রায় তিন লাখ টন ধান উৎপাদন করে দেশের খাদ্য চাহিদা মেটায় হাওরবাসী। হাওর ভাটি বাংলা হচ্ছে এমনই সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র, যেখানে ৩৭৩টি হাওরে রয়েছে ০.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর চাষযোগ্য জমি যা থেকে বছরে একটি ফসল আবাদ করে উৎপাদন হয়- ৫.২৩ মিলিয়ন টন ধান। বছরের বাকি ছ’ মাস প্রায় অব্যবহৃত থেকে এ বিশাল সম্ভাবনার সুফল থেকে জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। কৃষিবিদদের মতে, দেশে আবাদযোগ্য পতিত জমিসহ উপকূল ও হাওর অঞ্চলের জলাবদ্ধ এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত করতে পারলে বছরে ৫০ লাখ টন বাড়তি খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব। মতানুযায়ী, দেশের বিস্তীর্ণ জলাবদ্ধ এলাকা চাষের আওতায় আনার পাশাপাশি জলাবদ্ধ সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করা গেলে বছরে আরো ৫ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। মাননীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এখনই হাওর নিয়ে ভাবুন।
হাওরাঞ্চলের মানুষ একসময় গর্ব করে বলতো, মাছ আর ধান হাওরের প্রাণ। হাওরাঞ্চলের জলরাশিতে পাওয়া যায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নানা জাতের মাছ যেমন- কৈ, সরপুঁটি, পুঁটি, তিতপুঁটি, কাতলা, মাগুর, খৈলসা, বাঁশপাতা, আইড়, টেংরা, বাইম, চিতল, ভেদা, পাবদা, গজার, শোল, মহাশোল, চাপিলা, কাকিলা, বোয়াল, মৃগেল, রুই, কালবাউস প্রভৃতি। বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশে ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে হাওরগুলোতে ১৩০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতো। তবে গত প্রায় এক দশকে এসব মাছের মধ্যে প্রায় ৬২ প্রজাতি অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। যেমন- বাঘাড়, পিপলা, তিলা শোল, ঘাউড়া, বাচা, বাটা, নান্দিনা, ঘোড়া মুইখ্যা, পাঙাশ, সরপুঁটি, রিটা, শিশর, মহাশোল, একথুটি, বামোশ, রানি, চাকা, গজার, কাশ খাউড়া, কালাবাটা, কালিয়া, ঘইন্যা, শাল বাইম, কুমিরের খিল, গুইজ্জা, চিতল, কানি পাবদা, মধু পাবদা, পাবদা, নেফতানি, ডানকুনি, ঢেলা, বিষতারা, শিলং, গুজি আইড়, ছেপ চেলা ও রায়েক। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর, সিলেটের চার জেলায় চার লাখ ৭০ হাজার ৫৫৬ হেক্টর হাওর-বিল-জলাশয়, এক হাজার ৯৮৯টি বিল এবং এক লাখ ১৬ হাজার ৪২৯টি পুকুর রয়েছে। এ সব উৎস থেকে প্রতিবছর এক লাখ ২৩ হাজার ৮৩৫ দশমিক ৩৬ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়।
শুধু মাছ আর ধান নয়- পাখির জন্য হাওর অভয়ারণ্য এলাকা। শুকনো মৌসুমে বিশেষত শীতকালে দেশের বিরল প্রজাতির বহু পাখির দেখা মিলবে হাওরের বদ্ধ জলাশয়ে। হাওরের হিজলবাগে বসে পাখিদের মিলনমেলা। সুনামগঞ্জের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ছোট বড় ৫১টি বিলের সমন্বয়ে গঠিত টাঙ্গুয়ার হাওরকে সম্পদ ও সৌন্দর্যের রাণী হিসেবে অভিহিত করা হয়। টাঙ্গুয়ার হাওর পরিযায়ী পাখির জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান। ২০০০ সালের ৬ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘রামসার সাইট’ ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক রামসার কনভেশনে স্বাক্ষর করেন কর্তৃপক্ষ। এতে রামসার তালিকায় বিশ্বের ৫৫২টি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরের নাম উঠে আসে। পরিবেশবাদীদের গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে বিপন্ন প্রায় বিরল প্রজাতির ২ শতাধিক পাখির অভয়াশ্রম এবং বিপন্ন ১৫০ প্রজাতির মাছের সমাগম এ টাঙ্গুয়া হাওরে। টাঙ্গুয়ায় রয়েছে স্তন্যপায়ী দুর্লভ জলজ প্রাণী গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক), খেঁকশিয়াল, উঁদ, বনরুই, গন্ধগোকুল, জংলি বিড়াল, মেছো বাঘ। আরো রয়েছে- নলখাগড়া, হিজল, করচ, বরুণ, রেইনট্রি, পদ্ম, বুনো গোলাপসহ ২০০ প্রজাতিরও বেশি গাছগাছড়া। যা থেকে জ্বালানি কাঠ, আসবাবপত্রসহ গৃহসামগ্রী ও সৌখিন শোপিস তৈরির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় হয়।
কৃষি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক মেরুদ-। ঐতিহাসিকদের মতে নব্য প্রস্তর যুগে পশু পালন ও মৎস্য শিকার এবং ফলমূল সংগ্রহ করে খাওয়া থেকে মহিলারা প্রথম কৃষি কাজের সূচনা করে। বেদ ও মহাভারতের বর্ণনায় খ্রিষ্টের জন্মের ৫০০০ বছর পূর্বে বাংলাদেশের পটভূমিতে কৃষি কাজ মানুষের জীবিকা ছিল। আবহমান বাংলার কৃষিকর্ম ঐতিহ্য বহন করে আসছে। তবে ভৌগলিক অবস্থার কারণে হাওরাঞ্চলে ৮০% লোক কৃষিজীবি, কিন্তু শুধু একটি মাত্র উৎপাদিত খাদ্য শস্য ধান এ অঞ্চলের প্রধান শস্য। পলি গঠিত উর্বর এ অঞ্চলে প্রচুর ধান জন্মে। বছরে মাত্র একটি ফসলের উপর কৃষকের সুখ-দঃখ নির্ভর করে শতাব্দির পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে গভীর পানিতে ভাসমান বিভিন্ন জাতের আইশনা, খামা ও লাকী প্রভৃতি আমন ধান এবং পাট, তিল, তিষি ইত্যাদি চাষ করা হত। কালক্রমে বার বার আমন ধান ডুবে গেলে উনবিংশ শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং ক্রমে অগ্রহায়নের স্থান দখল করে বোর মৌসুমের বোর, টোপা, শাইল ইত্যাদি ধান। কিন্তু তখন উন্নত সেঁচ ব্যবস্থা না থাকার কারণে মাঠের পর মাঠ খরায় বিরান হয়ে যেত। পরে ১৯৬৫ সাল থেকে পাওয়ার পাম্পে সেঁচ ব্যবস্থা চালুর ফলে দেশে কৃষি কর্মে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে এবং ধীরে ধীরে কৃষিকর্মে উচ্চ ফলনশীল ধান ইরি ৮ এবং ক্রমে চলতি সময় পর্যন্ত ব্রি-ধান ২৮, ২৯ বিভিন্ন প্রজাতির উচ্চ ফলনশীল ধান ফলানোর মাধ্যমে হাওরাঞ্চল খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে এবং উৎপাদিত ধানের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ধান দ্বারা জাতীয় ঘাটতি পূরণে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু দু;খের বিষয় এত চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে হাওরাঞ্চলের কৃষক জাতীয় উন্নয়নে সহায়ক হলেও কৃষকের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হল না।
হাওলাঞ্চলকে ভাত ও মাছের ভান্ডার বলা হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রায় ২৫% এলাকা জুড়ে হাওর বিস্তৃত। এদেশে ছোট বড় মিলে প্রায় ৪১১ টি হাওর রয়েছে, যা প্রায় ৮ হাজার বর্গ কি.মি. এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে ২৬০ প্রজাতির মাছ ও ২৪ প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। হাঁস উভচর প্রাণী বলে, হাঁস চাষে খুবই উপযোগি স্থান হাওরাঞ্চল। শামুক ঝিনুকসহ অনেক জলজ কীটপতঙ্গ প্রভৃতি প্রাকৃতিক খাদ্য খেয়ে হাঁসগুলি বেড়ে উঠতে পারে। এতে কৃত্রিম খাদ্য কম লাগে এবং লাভ বেশি হওয়ার কথা। হাওরাঞ্চলের সাতটি জেলাতে ঝিনুক চাষ করে প্রাকৃতিক সম্পদ মুক্তা উৎপাদন করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জাতীয় বেকার সমস্যা দুরীকরণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। হাওরাঞ্চলে খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে প্রচুর শামুক, ঝিনুক ছড়িয়ে, ছটিয়ে থাকে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এ শামুক ঝিনুক মাঠে ঘাঠে পরে থাকতে দেখা যায়। শামুক ঝিনুকের গুড়া ও নাড়ি ভূড়ি মিল মালিকরা হাঁস মুরগি ও মৎস্য খাবার হিসেবে বিক্রি করে প্রচুর টাকা উপার্জন করে। এতে অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। কথা হচ্ছে আমাদের যত প্রাকৃতিক সম্পদ আছে এর মধ্যে শামুক ঝিনুক হতে পারে অন্যতম আরেকটি সম্পদ। তবে এ ব্যাপারে প্রকৃতি বিশেষজ্ঞদের ব্যাপক গবেষনার প্রয়োজন। চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে শামুক ও ঝিনুকের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়, এ ব্যাপারেও গবেষনা প্রয়োজন। বাংলাদেশে মোট ২ কোটি গবাদি পশু রয়েছে। এতে ৩০ লক্ষ বায়ুগ্যাস প্লান্ট নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু গবাদি পশু সংখ্যা হাওরাঞ্চলেই বেশি দেখা যাওয়া সত্বেও বায়ুগ্যাস প্লান্ট অল্পই চোখে পরে। বলা যায় হাঁস মুরগির বিষ্ঠা ও গরু গোবর তুলনামূলক বায়ুগ্যাস প্লান্ট তৈরি হলে বিদ্যুৎ এবং পরিবেশ বান্ধব গ্যাস ব্যবহারে অধিক ফলনসহ সার্বিক উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়াও বারি জাতের মিষ্টি আলু, বাদাম, সরিষা এবং গ্রীষ্মকালীন পিঁয়াজ উৎপাদন পদ্ধতি কষকের মধ্যে অজনা রয়েছে। এসকল উদ্ভাসিত নতুন প্রযুক্তি সম্বন্ধে কৃষককে সচেতন করা।
হাওরাঞ্চলে পরিকল্পিত কোন রাস্তা নেই। ফলে যোগাযোগ ও ফসল উঠানোর সময় রাস্তা ঘাটের অভাবে মাঠের ফসল ঘরে তুলতে খুবই ক্ষতি সাধিত হয়। বন্যার ক্ষতি থেকে হাওরাঞ্চলকে রক্ষার জন্য খাল খনন, নদীর বাঁক সোজা করে খনন কার্য সাধন করা। নদীর পাড় উঁচু করে হাওরের গুরত্বপূর্ণ পয়েন্টে বেরী বাঁধ ও সুইচ গেইট নির্মাণ করা। পরিকল্পিতভাবে সাবমার্চেবল রাস্তা তৈরি করলে এক এলাকার সঙ্গে অন্য এলাকার যোগযোগ ও মাঠের ফসল ঘরে তুলার সহায়ক ব্যবস্থা হবে।কৃষকরা অশিক্ষিত এবং রাস্তা ঘাটের যোগাযোগ না থাকায় উদ্ভাবিত উন্নত কৃষি প্রযুক্তি কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌছায়না। রাসায়নিক সারের অধিক ব্যবহার কিংবা কম ব্যবহার করে উচ্চ ফলন থেকে কৃষক বঞ্চিত হয়। সুষম সার ব্যবহার এবং উন্নত বীজের জাত নির্বাচন করতে জানেনা বলে অধিক খরচ করে উচ্চ ফলন থেকে কৃষকরা বঞ্চিত হয়। তাছাড়া শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য ও উপবৃত্তির পরিমান বৃদ্ধি করতে হবে এবং বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে দারিদ্রতা হৃাস করেত হবে এবং পিতা-মাতাকে সচেতন করতে হবে।
প্রায় বছরই হাওর অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অকাল বন্যা ফসলকে কৃষকের হৃৎপিন্ড ছিড়ে কেড়ে নিয়ে যায়। কৃষক প্রকৃতির সাথে লড়াই করে পরাভূত হয়ে অসহায়ের মত চেয়ে থাকে আর বন্যার পানি ধুয়ে নেয় কৃষকের অশ্রুজল। একই সাথে বয়ে আসে বিশাল ঋণের বোঝা। চলতে থাকে দুর্বিসহ জীবন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কত কৃষক যে দিন মুজুরে হয়েছে কিংবা রাজপথে ঠেলা গাড়ি চালক বা র্গামেন্ট শ্রমিক হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে তার হিসাব কেউ রাখে না। কৃষকরা টাকার অভাবে সময়মত সার, তেল, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে মহাজনী কিংবা এনজিও ঋণের ফাঁদে পরে সর্বশান্ত হয়। সল্প সুদে সহজ শর্তে কৃষি কাজের প্রয়োজনানুযায়ী কৃষি ঋণ দাদন করা প্রয়োজন। লক্ষ্যণীয় যে অপ্রতুল কৃষি ঋণ প্রাপ্ত হয়ে কৃষকরা কৃষি কাজ সমাধান করতে পারেনা। ফলে বাধ্য হয়ে এনজিও কিংবা মহাজনী একাধিক ঋণ গ্রহণ করে থাকে এবং পরিশোধকালে কৃষি ঋণে তারা খেলাপি হয়।
হাওর বাঁচলেই বাঁচবে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল বিশাল জনগোষ্ঠী, তাদের জীবন ও জীবিকা। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু নানাবিধ কারণে তা হচ্ছেনা। আমরা হাওর রক্ষায় কোন উদাসীনতা আশা করি না। সরকার ও জনগণ মিলে হাওর রক্ষায় সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। লেখাটি শুরু করেছিলাম হিজল নিয়ে কবিতা দিয়ে। শেষ করছি হিজল ফুলের কথা দিয়ে। হিজল ফুল সাধারণত সন্ধ্যার পর ফুটতে শুরু করে। রাত যত বাড়তে থাকে, ফুলের সমারোহ ততই বাড়ে। সকালে আলো ফোটার মধ্য দিয়েই ঝরতে থাকে হিজলের ফুল। কবি জীবনানন্দ দাশ সম্ভবত হিজল ফোটার এই মাদকতাপূর্ণ মিষ্টি ঘ্রাণের স্মৃতি নিয়েই লিখেছেন তার কবিতার চরণ,
‘আজ তারা কই সব? ওখানে হিজল গাছ ছিল এক
পুকুরের জলে বহুদিন মুখ দেখে গেছে তার;
তারপর কি যে তার মনে হলো কবে
কখন সে ঝ’রে গেল, কখন ফুরাল,
আহা-চলে গেল কবে যে নিরবে, তাও আর জানি নাকো’।
লেখক- গবেষক সদস্য, জাতীয় গ্রন্থাগার।