হাওড়াঞ্চলে পুষ্টিগত উন্নয়নে উদ্যোগ নিন

বিশেষ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যময় হাওড়াঞ্চলের মানুষের পেশা মূলত কৃষি। মাছ ধরেও জীবিকা নির্বাহ করেন অনেকে। কিন্তু গত বছরের এপ্রিলের আগাম বন্যায় ব্যাপক ফসলহানির পাশাপাশি কর্ম হারায় বিপুলসংখ্যক মানুষ। এর প্রভাব পড়ে ওই অঞ্চলের সার্বিক পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর। মায়েদের পুষ্টিকর খাবারের অভাবে স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম আগের চেয়ে বেড়েছে সেখানে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে সংরক্ষিত তথ্যের দিয়ে সেখানে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গেল বছরের বন্যার পর মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জন্ম নেয়া ৩ হাজার ৯৯০টি শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৭ জনই স্বল্প ওজনের। অর্থাৎ এ সময়ে শুধু হাসপাতালেই ৫০ শতাংশের বেশি শিশু স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মেছে। বন্যার আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে এ হার অনেক বেশি। নিশ্চয়ই হাওড়ের অন্য জেলাগুলোর তথ্য খতিয়ে দেখলেও অনেকটা একই প্রমাণ মিলবে। এটি স্পষ্টত আলোচ্য অঞ্চলে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপ্রাপ্যতার প্রকট ঘাটতিরই ইঙ্গিতবাহী। এ অবস্থা দীর্ঘতর হলে সেখানকার পুষ্টি পরিস্থিতির আরো অবনমন ঘটবে। কাজেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মগ্রহণের সময় আড়াই থেকে চার কেজি ওজনকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়। জন্মের পর নবজাতকের ওজন আড়াই কেজির কম হলে তাকে স্বল্প ওজনের শিশু বলে। স্বাভাবিক ওজনের শিশু জন্মদানে গর্ভাবস্থায় মায়েদের সাধারণ সময়ের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ অতিরিক্ত খাবারের প্রয়োজন হয়। সে খাবার হতে হয় অবশ্যই পুষ্টিসমৃদ্ধ। এর ব্যত্যয় ঘটলে স্বল্প ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি তৈরি হয়। হাওড়াঞ্চলে যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্বল্প ওজনের শিশু জন্ম বেড়েছে, তার বড় কারণ অপুষ্টি। এটিকে হেলায় দেখার সুযোগ নেই। আমরা চাইব, হাওড়াঞ্চলের অপুষ্টি মোকাবেলায় পুষ্টিকর খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করবে সরকার।
লক্ষণীয়, পুষ্টি কেবল স্বাস্থ্যগত ইস্যু নয়। এর সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ও তার বৈচিত্র্য, নারীর ক্ষমতায়নসহ পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্যও সম্পর্কিত। কৃষি উন্নয়ন ছাড়া সার্বিক পুষ্টি উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশে এখনো প্রাণিসম্পদ ও বেশকিছু পণ্যের ব্যাপক ঘাটতি হয়েছে। এছাড়া দানাদার খাদ্যশস্য প্রতিদিন গ্রহণের পরিমাণ প্রয়োজনের কাছাকাছি হলেও তা এক দশকের ব্যবধানে কমে গেছে। ফলে সামনের দিনে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় পুষ্টিকর খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বেশি হারে বাড়াতে হবে। এটি পুরো দেশের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি হাওড়াঞ্চলের জন্য আরো প্রযোজ্য। কেননা গেল বন্যার কারণে সেখানে কৃষি কর্মকান্ড অনেকটা গতিহীন। আবার মাছ ধরা বাদে অন্য কোনো কর্মসংস্থানও খুব একটা নেই। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক নিচে নেমে গেছে। এতে ক্রমে বেড়ে চলেছে দারিদ্র্য, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সেখানকার পুষ্টি পরিস্থিতিতে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত ও কৃষিতে শস্য বহুমুখীকরণে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। উল্লেখ করা দরকার যে, হাওড়াঞ্চলের পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে। এটি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের অন্তরায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে হাওড়াঞ্চলের অপুষ্টি সংক্রান্ত ব্যাপক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ওই জরিপের ফলাফলের আলোকে বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সেখানকার মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনেও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় হাওড়ের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়ন কঠিন হবে বৈকি।



আরো খবর