- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - http://sunamganjerkhobor.com -

হাছন রাজার শিকারী কুড়াপাখি ও আমার পিতামহী

কিশোর রঞ্জন দে
পিতামহী বলা হতো আগে।
এরপর ঠাকুরমা। তারপর ঠাকুমা। ঠামা। এরমই চলে আসছে। কিন্তু আমি আমার পিতামহীকে ‘মা’ বলে ডাকি। আমার বাবাও তাকে ‘মা’ ডাকেন। অথচ আসলে ইনি না আমার মা, না আমার বাবার মা। আসলে ইনি আমার বাবার জ্যেষ্ঠমা বা জেঠিমা।
আমার পিতামহী মানে আমার বাবার আসলি মা মারা গেছেন তার জন্মের সময়ে। সুনামগঞ্জের গা ঘেঁষা বারঘর গ্রামের হাওড়ে জল ও বাতাস বেশি ছিল সে রাতে। ধাইমাকে ডেকে আনতে যে নৌকা গেছিল সেই নৌকা টালমাটাল দোল খাবার পর পূর্ণিমার রাতে তলিয়েই গেল।
তাই তো শ্রীযুক্তা অনঙ্গমোহিনী তার দেওরের ছেলেকে অর্থাৎ আমার বাবাকে বড় করেছেন। বাবা তাকে মা-ই ডাকতেন। আমার বাবার এই মা আমাকে লালন পালন করে আমাকে অদ্ধেকটা বড় করেছেন। আমার বয়স এখন এগারো। আমার বাপ বেটা একজন মহিলাকেই ‘মা’ ডাকি এ নিয়ে মিকির পাহাড়ের ছোট জনপদে চর্চা হয়। আগে বাবা বাড়ি এলে আমাকে শিখাতে চাইতেনÑমা নয় আমি যেন ঠামা ডাকি। জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখে আসছি ইনিই আমাকে খাইয়ে দিচ্ছেন, কোলে করে বেড়াচ্ছেন, চান করিয়ে দিচ্ছেন, হাগু করলে পরিস্কার করে দিচ্ছেন, অর্থাৎ কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেনÑএরকম একজন-যিনি না থাকলে আমি বাঁচতামই নাÑতাকে কি বলে ডাকবোÑসে তো আমিই ঠিক করবো। তোমার জেঠিমাকে তুমিও তো মা বলে ডাক? তাহলে? তাই শ্রীযুক্তা অনঙ্গমোহিনী আমারো মা আমার বাবারও মা।
আমার সবচে ঘনিষ্ট বন্ধু বকনা। আমাকে একবার পেছন থেকে আচমকা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলÑ আমার দুটো দাঁতই ভেঙে গেছিল তবুও সে আমার প্রিয় বন্ধু। বকনা প্রথম প্রথম বলতোÑএরকম হয় না। দেখিস না আমার মা আর আমার বাবার মা আলাদা। একই মহিলা বাবা আর ছেলের মা হবার কোনও ঘটনা পৃথিবীতে আর নেই। বকনার শহরে থাকা কাকাও একথা বলেন। মজার কথা হলো বকনাও মাঝে মাঝে আমার মাকে মা ডেকে ফেলে। অথচ তার তো বাড়িতে একজন মা আছেই। সেই হিসেবে অনঙ্গমোহিনীর তিন ছেলেÑএক বাবা, এক পুত্র আর সেই পুত্রের বন্ধু।

(খ)
‘কান্দে হাছন রাজার মন মইনা রে।’
পক্ষকাল হয়ে গেল টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে জলমুরোগদের বন্দি করা হয়েছিল কৌশলে। প্রশিক্ষণ শেষ হয়নি বলে এখনো তারা কুড়া পাখির মর্যাদা পায়নি। তবুও হাছন রাজার নৌ শক্তি হাওরের জলে তরতর করে আরো জল মোরগকে বন্দি করার চেষ্টা করে। মাঝিদেরই তাড়া বেশি। মশাল হাতে লোকলস্করেরা নেমে গেলে তবেই তারা শীতের বাতাসে বাড়ি ফিরে যাবে। নৌকা বাঁধতে হবে। সামান্য মেরামতও করতে হবে। সবকিছু গোছাতে সময় লাগবে। ভেতরে ভেতরে খুব ভয় পায় তারা। সুনামগঞ্জের বাঘ হয়তো ঘাটে কোথাও ওঁত পেতে আছে। হাওরের জলে মাছেদের মন ভুলানো প্রণয় আর কানাকানি, শীতে বাঘের ডর। সব মিলিয়ে তাদের মনমইন্যা কাঁদে।
আর হাছন রাজার রূপসী পরিচারিকাদেরও মন মইন্যা কাঁেদ। কারণ সদ্য তোলে আনা বনমোরগগুলোকে আদরে আদরে এখনো তারা শিকারী কুড়াপাখিতে বদলাতে পারেনি।
আজম নামের একজন বহুজন হত্যাকারী নিষ্ঠুর গুপ্তঘাতক গভীর রাতে গোপনে হাছন রাজার অন্দর মহলে প্রবেশ করে। হাতের রামদা দিয়ে রাজাকে দিখÐিত করবে। শোবার ঘরে বিস্মিত হয়ে দেখে, তিনি তার সামনে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে গান রচনা করছেন। তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর চেহারার দীপ্তিতে এবং ঋষিসুলভ ধ্যানে মুগ্ধ হয়ে আজম তাকে হত্যা না করে ফিরে আসে। বাড়ি ফেরার পথে বিশাল বটগাছের নীচে অকস্মাৎ বজ্রপাত হয়ে আজম মারা যায়।
সুফিপ্রেমে ডুবে যাওয়া মিষ্টি মিষ্টি সুনামগঞ্জের জমিদার হাছনরাজার জীবনের এই সব মণিমুক্তা হাওরের জলে ও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আর সুনামগঞ্জ থেকে উঠে আসা অনঙ্গমোহিনী মিকিরপাহাড়ের বড় পাথার নামের বস্তিতে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে ঘুরে গুণগুণ করেনÑ‘পিরীতের মানুষ যারা আউলাবাউলা হয়রে তারা।’ খুব কাছে গেলে শোনা যায় গানটা হঠাৎ সামনে কাউকে দেখলে বদলে গেছেÑ‘প্রেমের মানুষ নয় যারা, হাছন রাজার গান শুনিস না।’

(গ)
লাটাই বদলাতে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বাড়িতে ঢুকলাম যখন আমার মা দেখলাম দীনা বুড়িকে দেখে চেঁচাচ্ছেÑ‘এই খবরদার কইলাম। আমার বাড়িত আইস না। ঠেঙ ভাঙ্গি লাইমু নু।’
বাড়ির গেইট বলতে দুপাশে বাঁশের বেড়ার খুঁটির মধ্যে গোলপোস্টের মধ্যে লটকে থাকা একটা বাঁশ। ওটাকে সরিয়ে বড় মানুষেরা বাড়িতে ঢুকে। আমি মোটেই বাঁশ সরাতে যাই না। বাঁশের নীচে মাথা সামান্য নোয়াতে হয়। দৌঁড়ে দৌঁড়ে বাড়িতে ঢুকি আবার বেরিয়েও যাই দৌঁড়ে দৌঁড়েই। দীনাবুড়ি এক সময়ে মায়ের সই ছিল। প্রিয় সখি। আট বছর থেকে তারা সই হন। তাকে দেখলেই মায়ের মাথার তার ছিঁড়ে যায়। গলা তুলে গালিগালাজ করেন, ঠিক যেমন এখন দীনাবুড়ি আমাদের বাড়ির সামনের মাটির রাস্তা দিয়ে কোথাও যাচ্ছে। হয়তো সে আমাদের বাড়ির এই মজার গেটটার দিকে তাকিয়েও দেখেনি। তবু মা চেঁচাচ্ছে। আমার তিন বছর বয়সের ঘটনাটার কথা আমি বড় হয়ে শুনেছি। আমার বয়স এগারো এখন। দুজনের ঝগড়ার কারণটা সবাই জানে আর এটা খুব লজ্জার কথা আমার জন্য।
তখন নাকি দুই সই একজন আরেক জনকে না দেখলে থাকতেই পারত না। আমাকে বারান্দার বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে রেখে মা স্নান করতে গেছে কুঁয়োর দিকে। এদিকে দীনাবুড়ি গতকালকে আমাদের বাড়িতে আসেইনি। আমি একা আছি আর প্রিয় সখির দেখা পায়নি গত রাতে এগুলোই মাথায় পাক খাচ্ছিল মায়ের। মুলি বাঁশের মাথায় বাঁধা দু’বালতি জল মাথায় ঢেলেই প্রায় দৌঁড়ে উঠে আসছিল। আমাকে এরকমভাবে বেঁধে না গেলেও উপায় নেই। আবার বেঁধে রাখলেও আশঙ্কা থেকেই যায়।
এদিকে দীনাবুড়ি এসে বারান্দায় বসেছে। গামছার বাঁধন থেকে খুলে আমাকে চটকে দিয়েছে। গ্রামের বাড়িতে তিন বছরের বাচ্চা ন্যাংটোই থাকে। একটু চটকানোর পরই মা এসে হাজির।
‘কিতা রে দীনা। কাইল আইলায় না। আরে ইটারে খুললে কিতা বে? ভাগি যাইব নু?’
‘না না। ভাগত না। নাগররে বন্দি করি রাখছি দেখরায় না নি?’
‘উত্তর দিলে না? কাইল যে আইলে না বড়? ইতা কিতা রে? তোর বাম চইখো ইতা কিতা?’
‘অহন ঠিক অই যাইবো।’
দেখি দেখি তোর চউখো গুটার লাখান কিতা বে ইটা?’
‘এঞ্জেলা অইছে গো।’
‘এঞ্জেলা?’
‘এললাগি তো নাগরের কাছে আইলাম। তুমি তো ল্যাংটা করি রাখছই আমার লাগি। তার নুংকুটা লাগাইতাম আমার চউখোর এঞ্জলাত। অখন বালা অই যাইবো?’
‘কিতা করছস কইলে? অউ গোটাত আমার নাতির নুংকু লাগাইছস। তর এত সাহস? তারপর একটা ভুমিকম্প হলো যেন। তুলকালাম ঝগড়া হলো দুজনে।
‘বুড়ি অই গেছস। জানস না। আয়ু কমে ইতা করলে?’
‘মা মরা বাইচ্চা। বাবা আছইন না মরছনইন, বাড়িত আইলেয়ে খবর পাইতায়। অখন আমি কই যাইতাম। হালির হালি।’
ঝগড়াটা এক সময়ে গালাগলি আর পরে প্রহারে পরিণত হয়। তারপর গত আট বছরে এক সময়ে প্রিয দুই বান্ধবীর মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
পরের মাসে নেফা থেকে বাবা ছুটিতে এসে ঘটনা শুনে রাগ করেছিলেন বাচ্চাদের শরীরের ওই নরম অংশে জীবাণু লাগালে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। মার ইনফেকশন কথাটার মানে বোঝার কথা নয়। কিন্তু তার ছেলে বা ভাসুরপুত্রের সমর্থন পেয়ে কলহ করার সময়ে আরো তেজীয়ান হলেন।

(ঘ)
মরমী পল্লী কবি সুনামগঞ্জের হাছন রাজার কথা মিকির পাহাড়ের ধানসিঁড়ি নদীপাড়ের বাঙালি গ্রামে অনঙ্গমোহিনীই বাড়ি বাড়ি প্রতিদিন বলে বেড়াতেন। আর বারবার শোনা কথাতে লোকজন বিরক্তই হতো।
হাছন রাজার পূর্বপুরুষেরা ছিলেন হিন্দু। কিংবদন্তি রয়েছে যে, তাঁদের পূর্বপুরুষ অযোধ্যার অধিবাসী ছিলেন এবং বৃত্তিতে ক্ষত্রিয়। এক সময় তারা বর্ধমান ও পরে কাকদিঘি গ্রামে বসবাস করতে করতে কয়েক পুরুষ পর একশো শতাংশ বাঙালি হয়ে যান। সৈনিক বৃত্তি ত্যাগ করেন। হাছন রাজার উর্ধ্বতন অষ্টম পুরুষ
বিজয় সিংহ দেবের গোত্র ছিল ভরদ্বাজ। ভ্রাতৃবিরোধের জন্য তিনি চলে আসেন শ্রীহট্ট জেলার জঙ্গলাকীর্ণ ভূমি কুলাউড়াতে। বিজয় সিংহ দেবের প্রতিষ্ঠিত দিঘি ও গড়ের ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়।
একসময় অধস্তন পুরুষ রাম সিংহ দেব কুলাউড়া থেকে সিলেটের রামপাশা গ্রামে চলে আসেন। তার বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা থেকে যান কুলাউড়াতে। তার ছেলে বাবু সিংহ দেব রায় ইসলাম ধর্মের প্রতি সুগভীর আকর্ষণ অনুভব করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাবু খান নামে পরিচিত হন। এই বাবু খানের পৌত্র হলেন মরমী কবি হাছন রাজা। এই কবি ও জমিদারের পিতামহ ছিলেন হিন্দু। আর কুলাউড়া গ্রামে থেকে গেছিলেনÑহাছনরাজার প্রপিতামহের সৎভাইয়ের সংসারে একদিন জন্ম হলো এক কন্যার, অনঙ্গমোহিনীর।
(ঙ)
আমাদের গ্রামের বুক চিঁড়ে যে নদীটা চলে গেছে তার নাম ধানসিঁড়ি। নাগাপাহাড়ের লাইমাংপাহাড় থেকে বেরিয়ে এসে আসামের তিনটে জেলায় পাক খেয়ে খেয়ে সে ধানসিঁড়ি মুখে পৌঁছে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিশে যাবার চেষ্টা করেছে।
ভূগোলের স্যার খুব মারেন। তার পড়া শিখতেই হয়। তাই নদীর কথা জানি।
কাজিরাঙ্গাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নানা নোংরামি করে সে যখন আমাদের গ্রামে পৌঁছেছে তখনো তার রাগ কমেনি। যতো সাঁতার জানো না কেন তার চোরা স্রোত তোমাকে আটকে দেবে। ‘দহ’ বলে একটা গোপন শক্তি আছে নদীটার
প্রাণ কেড়ে নিয়ে লাশটাকে দুদিন পর ফেরত দেয় দূরের নেপালী বস্তির ঘাটে। পরিবারের মানুষ দুদিন যাবৎ পাগলের মতো লাশ খুঁজতে থাকে। যেমন আমার মাকে ফেরত দিয়েছিল নদী। ফুলে ঢোল হয়ে গেছিল মা। আমি ততোদিনে হাঁটতে শুরু করেছি। মায়ের লাশ যখন খোঁজা হচ্ছিল কখন ক্ষিদের জ্বালায় অনঙ্গমোহিনীর কোলে কাঁদছি। আর সেই থেকে তার উপরে দায়িত্ব এসে পড়ল দ্বিতীয় মাতৃহারা শিশুকে মানুষ করার। সেই থেকে এই মায়ের কোলেই মানুষ। নদীটা আমার জন্মদাত্রী মাকে শুধু মেরেই ফেলেনি তার শরীরের কাপড় সব খুলে নিয়েছিল। মায়ের দেহটা নাকি পাওয়া গেছিল শুধু বøাউজ পরা অবস্থায়। এতো গোপন ঘূর্ণির জন্যই এই মাÑআর বাবা এলে বাবাও Ñনদীর ধার ঘেঁষতে দেন না আমাকে।
কিন্তু আমি আর বকনা যাই বিকেল বিকেল। তবে অন্য ঘাটে। যে ঘাটে গ্রামের মেয়ে বউরা স্নান করে আমরা সেদিকটা মাড়াই না। কে কোথায় দেখে নালিশ করে দেবে মায়ের কাছেÑঅনঙ্গমোহিনীর কাছে। আর বুড়ি কুরুক্ষেত্রে বাঁধাবে।
আমরা দুজন যাই শ্মশানের ঘাটে। কেউ মারা না গেলে ওদিকটাতে কেউ আসে না। পেন্ট খুলে জলে ঝাঁপ দেই দুজন। জলে পরেই ডুব দিই। অনেক অনেকক্ষণ জলের নিচে থাকি। যার দম বেশি সেই জিতে। বকনার সঙ্গে জোর টক্কও হয়। আমি তো চুরি করি। ভেসে উঠে দেখি বকনার এখনো দেখা নেই। বুক ভর্তি দম নিয়ে আবার ডুব মারি। ন্যাংটো হয়ে জলে নামলে দুটো সুবিধা এক-মায়ের কাছে ভেজা পেন্ট নিয়ে হাজির হয়ে মার খাবার সম্ভাবনা থাকে না। দ্বিতীয় সুবিধাটা ঠিক বুঝিয়ে বলা যাবে না। ন্যাংটো শরীরে নদীর জলে শরীরে ও মনে কীরকম একটা শিরশিরানি হয়।
স্কুলে যাই দুজনেই। বকনা আমার এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে। আমরা মিকির পাহাড় জেলার বাঙালি বস্তিতে থাকি। আমাদের জেলার নামটা বেশ বড়। আসামের সব জেলার মধ্যে সবচেয়ে লম্বা নাম উত্তর কাছাড় ও মিকির পাহাড় জেলা। জেলা সদর ডিফু। গ্রামের নাম পুরানা বড়পাথার বাজার। বাজার টাজার কিছু নেই। সপ্তাহে একদিন হাট বসে তিনআলিতে। বাঙালি অসমিয়া আর মিকির পাহাড়ের মানুষজন আসে। তিন-আলি মানেÑযেখানে তিনটে রাস্তা মিশেছে। আর বড়পাথার বলে বাজারটা রেলস্টেশনের পাশে শহরের চেহারা নিতে শুরু করেছে।
ঐ যে বলছিলাম, বকনার সঙ্গে নদীর ঘাটে স্নান করাটা বেশ মজার। স্কুল থেকে ফিরে মুখে কিছু একটা দিয়েই Ñ দে দৌঁড়-দে দৌঁড়। গা শিরশির করাটা বেশ মজার। ঝিমঝিম করে শরীরটা। ন্যাংটো হয়ে আছি কেউ দেখছে না। বকনার এক কাকা থাকেন গোলাঘাট শহরে। তার মেয়ে তিরি এলে ¯œান বন্ধ থাকে। শহরে থাকে বলে সমীহ করি তাকে। দীনাবুড়ি ছোট বয়সে আমার সঙ্গে যে ঘটনাটা ঘটিয়েছিল সেটা যাতে বকনা তার শহরের বোনটাকে না বলে দেয় তার জন্য সতর্ক থাকতে হয়। বাড়ির পাকা কামরাঙ্গা দিয়ে তার মুখ বন্ধ করে রাখি কায়দা করে। প্রায়ই তো বকনাদের বাড়িতে খেতে বসি আমি। একদিন খাচ্ছি যখনÑতিরি বললোÑ‘আরে তুমি এতো তাড়াতাড়ি খাচ্ছো কেন? এরকম খেলে অসুখ করে। চিবিয়ে চিবিয়ে খাও।’
শহরের মেয়েরা কত কী জানে। আমাকে তুই বলে না। ‘তুমি’ বলে।
সে রাতে মা যখন ভাত বেড়ে দিলÑআমি তিরির কথা ভাবতে ভাবতে চিবিয়ে চিবিয়ে আস্তে আস্তে খাচ্ছিলাম। খেয়াল করিনি মা বুড়িটার কখন খাওয়া হয়ে গেছে। অবাক হয়ে আমাকে দেখছে।
‘কিতাবে খাইরে না কেনে? তর লাগি বই রইছি নু আমি। ইতা মাজতাম কুন সময়ে?’

(চ)
হাছন রাজা বড় জমিদার। প্রাণোচ্ছল প্রকৃতির মানুষ। প্রবল উৎসাহে ঘোড়ায় চড়তেন। বুনো হাতিরা এসে প্রজাদের ফসল নষ্ট করছে। তাদের তাড়াতে হবে লোকালয় থেকে। ঘোড়ায় চড়ে লোকলস্কর নিয়ে প্রথম সারিতে তিনি। পোষও মানাতে হবে। পরের বছর ওই হাতিই মানুষের হয়ে বুনো হাতি তাড়াবে। কুড়াপাখি ছিল তার বিলাস। কিন্তু পাখি হত্যা নয়। জীবন্ত অবস্থায় ধরে পোষ মানাতেই তো আনন্দ। চলার পথে অসহায় তাড়িয়ে দেয়া বিড়ালছানাকে লোকজনদের দিয়ে প্রতিপালনের ব্যবস্থা করা হতো তার আদেশে। পাখিদের পরিচর্চা আর প্রশিক্ষণের জন্য ছিল বিশেষ বিশেষ পরিচারিকা। পৃথিবীটা যে শুধু মানুষের জন্য নয় ইতর প্রাণীদের একটা বিশিষ্ট ভূমিকা আছেÑএই কথা তার মুখে বারবার শোনা গেছে।
সম্পন্ন জরিদাররা যেমন হয় দাম্ভিক, বদখেয়ালি, উড়নচণ্ডি এইসব ধারণাকে নস্যাত করে দিয়ে একেবারে গরিব চাষাভুষোর মতো জীবনযাপন তার। তবে নিজের সখের জন্য প্রচুর খরচও করতেন।
তিনি কোনওদিন কোনও মেয়েকে জোর করে তার অন্দর মহলে নিয়ে আসেনি। মেয়েরা তার কাছে স্বঃপ্রবৃত্ত হয়ে আসত। এর মধ্যে নানা শ্রেণির ও নানা জাতের মেয়ে সুপুরুষ হাছন রাজার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। তার নিজস্ব ষোলজন রূপসী পরিচারিকা ছিল। ‘দিলাবরের মা কেন আইলে বাজারে। কি জিনিস কিনিলে তুই, বল্লে না আমারে।’
দিলাবরের মা গঞ্জ থেকে ঠিক একশো বছর আগে হাছন রাজার জন্য কি কি সওদা করেছিল? তৈজসপত্র, লবণ ও গুড় ছাড়া মনিহারি দ্রব্য কি কি তখন পাওয়া যেত সুনামগঞ্জের হাটে? এগুলো জানা যায়নি। কবির মন বসাতে দিলাবরের মা ঠিক কি সওদা করেছিল একশো বছর আগে?
ফেরার পথে নদীর পাড়ে দিলাবরের মায়ের জন্য অপেক্ষায় ছিল নৌকা। মাঝিরা সানন্দে অপেক্ষা করে তার জন্য। নদীর নৌকা হাওরে প্রবেশ করবে এবার। দিলাবরের মায়ের নাকে নথের কাজ ছিল। ছিল বিন্দু বিন্দু জমা ঘাম। হাছন রাজা ছাড়া অন্যরাও দেখেছিল নাকছাবির উপর ঠিকরে পরা আলো। তবু জানা যায়নি সে কি কি কিনেছিল দুপুরের হাটে। হাওরের জলে তার নৌকা সন্ধ্যায় পৌঁছালেও সে বাঘের ভয় পায়নি। কারণ তার কাছে লুকানো ছিল হাছন রাজার মন বসানোর সওদা।

(ছ)
আমার বাবা যৌবনেই তার স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন। যৌবনে স্ত্রী হারালে আরেকবার বিয়ে করতে হয়। কিন্তু অজয়কান্তির মা, আত্মীয়বন্ধুদের শত অনুরোধেও আর বিয়ে করলেন না। তিনি নেফাতে চাকরি করেন। আসাম রাজ্যের ঠিক উত্তরে চিন দেশের নিচে পূর্ব পশ্চিমে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে যে লম্বা ভূখÐ তার নাম নেফা। তার ঠিক উপরেই চিন দেশ। তাই নেফা দেশটাকে শাসন করেন দিল্লির জহরলাল নেহেরু। তার নাম জানি। আমাদের এই গ্রাম থেকে বাবার কর্মস্থলে যেতে সময় লাগে তিনদিন।
বাবা যে আরেকবার বিয়ে করতে রাজি হলেন না এই জন্য তার মা এবং আমারও মা শুরু থেকেই রেগে আছেন। যদিও আমি অর্ধেকটা বড় হয়েই গেছিÑতবু তার রাগটা রয়েই গেছে। কার আর ভাল লাগে দুটো নবজাতককে যাদের সে গর্ভে ধরেনি তাদের তিলে তিলে মানুষ করার। আর মায়ের তো ইচ্ছেই থাকে ছেলের ভরা সংসার দেখে যাবার।
‘না মরলে নিস্তার নেই আমার। তরে পাললাম। হালির হালি তর মা তরে জন্ম দিত গিয়া মরি গেল। আবার নতুন এÐÑতর সাবুল। হি হারামজাদি নদীত গেছইন চান করতা। কেনে বাড়িত কুয়া নাইনি?’ কথাগুলো বাবার উদ্দেশ্যে বাবা বাড়িত থাকলে বলে না থাকলেও বলে।
‘বিয়া কইরা মরস না কেনে মাইলেনেওরা। বিয়া করলে তো তর পুয়া ইÐরে আমার পালা লাগে না।’ এদিকে বুড়ি বাবাকে না হোক আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না একদÐ। আমার বাবার খবর না পেলেও ছটফট করে। তবু মুখ তার চলবেই।
Ñ‘দেখ গিয়া। তর বাবার পাহাড়োর কোন জংলী পুরি রে লইয়া রাসলীলা মারের। ভরা যৌবনে বিয়া করল না। বেটা মাইনসের শরীলর একটা ক্ষিধা আছে না নি?’
একটু আগে খেতে বসে আমি দেরি করছিলাম খেতে। ক্লান্ত ছিল বলে খিটখিট করলো। এখন কুপি নিভিয়ে বিছানায় উঠলো। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কিছুক্ষণ কাঁদলÑতারপর গুণগুণ করে গান ধরলোÑ‘আগে যদি জানত রে হাছন, বাঁচবো বা কয় দিনÑ দালান কোঠা বানাই থইতো করিয়া রঙ্গিন।’ আমি ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে টের পাই আমাকে জড়িয়ে ধরে বুড়িও ঘুমিয়ে পরেছে। কাকে কখন গালাগাল করবে ঠিক নেই। বাবা, দীনাবুড়ি, পাশের বাড়ির সতুকাকা। তবে বেশি গালাগাল খায় দুজন। ‘হালির ঘরর হালি।’ প্রথম ‘হালির হালি’ হলো বুড়ির ছোট জা। আমার বাবার আসলি মা। চোদ্দো বছর বয়সে মরে গেল। ধাইমা আসতে পারেনি বলে মরেই যাবি। দ্বিতীয় ‘হালির হালি’ হল আমার মা, তবে আমি বা বাবা Ñআমরা মোটেই আমাদের আসল মায়েদের জন্য কোন টান টের পাই না।
অনঙ্গমোহিনী সুনামগঞ্জ হাওরের পাড়ের শ্বশুরবাড়িতে এসে ঢুকেছিল এগারো বছর বয়সে। শাশুড়ি আর স্বামীর কিলচড় খেতে খেতে যোগ্য বউ হতে শুরু করেছে মাত্র এমন সময়ে মানুষটাকে হাওরের পাড়ে টেনে নিয়ে গেল বাঘে। নৌকা করে একাই ফিরে আসছিল বাড়িতে। এক শীতের সন্ধ্যায়।
Ñ‘তর বাবা জেঠার দেশÑজানস নি রে মনাÑএক জাগা থাকি অইন্য জাগাত নৌকা করি যাইতে লাগে। অন থাকি অনো। তবু নৌকা লও। এল্লাগি ত তর বাপ জেঠা জুতা পরতা না। জল আর পেক। কই পরতা জুতা। তর দাদু আর বরযাত্রীরা আমরার বাড়িত আইছিলা খালি পাও। আমার মাসীমারা হাসতে হাসতে মরলা।’
শীতে হাওরের জল কমে যায়। বাঘ ওত পেতে থাকে ঘাটে। মানুষ ঘুমিয়ে পরলে গোয়াল ঘরে এসে হানা দেয়। বেআক্কেলে মানুষটা মশাল জ্বালানোর সরঞ্জাম নিয়ে যায়নি সঙ্গে। সঙ্গে টিন রাখতে হয়। টিন মেরে শব্দ করলেও বাঘ শিয়াল পালিয়ে যায়। তাও নিয়ে যায়নি নৌকায়। শীতের রাতে ঘাটে নৌকা ভিড়বে টের পেলে সতর্ক হয়ে যায় মানুষ। জোয়ান মরদরা লাঠি আর কুপি লম্ফ নিয়ে এগিয়ে যায়।
ফিরে আসেনি সে মানুষ। রাতেই ভাসুরেরা সব মশাল জ্বেলে লাঠিসোটা নিয়ে খুঁজ করতে গিয়ে ঘাটে বাঁধা খালি নৌকাটা দেখে যা বোঝার বুঝে নিল। মানুষটা কোথাও নেই। হল্লা করে নাম ডাকা হল। কেউ জবাব দিল না। অন্ধকারে জঙ্গলে খুঁজতে যাবার প্রশ্নই উঠে না। পরদিন ভোর ভোর আবার আরো বড় দল নিয়ে বেরুলো বাড়ির পুরুষেরা। খুবলে খাওয়া শরীরটাকে সহজেই পেয়ে গেল। যে শরীরটা আগের রাতে অনঙ্গমোহিনীর সঙ্গে ঘুমিয়েছে।
তের বছরের বিধবা। কত যে অত্যাচার হতে থাকলো। যৌবন এলে আরো বাড়লো। এই সময়ে অত্যাচারী শাশুড়ি মমতাময়ী হয়ে আগলে আগলে রাখতো তাকে। বিধবা সোমত্ত বউ। খারাপ নজর পড়তে কতক্ষণ। যে দেওরটা তাকে রাতে টানাটানি করত তার বিয়ে হওয়াতে রেহাই পেল।
কিন্তু অজয়কান্তির জন্মের পর সময়ে আবার অঘটন। মরেই গেলÑপ্রথম বার মা হতে যাওয়া ছোট জা-টা। ইনিই আমার আসলি ঠাম্মা।

(জ)
মায়ের যখন কুড়ি বছর বয়স, তখন শাশুড়ি তার কোলে তুলে দিলেন সদ্যোজাত শিশুটিকে তার প্রথম পালিত পুত্র অজয়কান্তিকে।
‘ওটারে মানুষ কর বেটি। একটা কিছু লইয়া ত জীবন কাটাইতে।’
অজয়কান্তি বিয়ে না করলেও তার বাবার যৌবনের ক্ষিদে ছিল, নির্দিষ্ট সময়ে বিয়ে করলেন। কিন্তু ততোদিনে অজয়কান্তি তার জেটিমাকে মা হিসাবে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরেছিলেন। কাঁচা বয়সের সৎমা ওর দিকে হাত বাড়াননি আর।
তারপর আমার মা চলে গেলেনÑমুখে আধো আধো কথা তখন আমার। আমি অনঙ্গমোহিনীর দ্বিতীয় পালিত পুত্র। আমার কোনও সৎমা না আসাতে বুড়ির কষ্টের শেষ নেই। এমনিতেই একটু ‘আউলাজাউলা’ মানুষটা।
Ñ‘যমে চউখেও দেখে না নু আমারে। আর কতদিন বাঁচতাম রে। ষাইট বছর বয়স অই গেল নু।’
রাতে আমার পাশে শুয়ে ঘুম না আসা পর্যন্ত বুড়ি একথার পর অন্য কথায় চলে যায়। আমাকে বড় করতে তেমন কষ্ট হয়নি তার। কিন্তু আমার বাবার বেলায় দিনরাত ঘুমাতে পারেনি। কাঁচা শিশুটিকে খাওয়াবে কি। তার নিজের অনভিজ্ঞতা। এই জ্বর হয়ে যায়, এই পেটখারাপ। মাথার উপরের অভিভাবকদের খবরদারি। আমার সময়ে অনেক কষ্ট কম পেয়েছে বটে।
অজয়কান্তির বাবা অর্থাৎ আমার ঠাকুরদা বউদি অনঙ্গমোহিনীর থেকে সাত আট বছরের বড় ছিলেন। ভয় পেতেন তাকে। তার ছেলে মেয়েরা জন্ম নিতে শুরু করলো। প্রথম বউয়ের প্রথম সন্তানের কোন দায়িত্ব নিল না লোকটা। দেশভাগের পর রাতারাতি চলে গেল কাছাড়ের কোথাও। অনঙ্গমোহিনী আর অজয়কান্তির গ্রামের অন্য লোকজনদের সঙ্গে মিকির পাহাড়ের এই বাঙালি গ্রামটাতে এসে উঠলেন। ভাগ্য ভাল ততদিনে আমার বাবা পড়াশুনা শেষ করে ভারত সরকারের চাকরিতে চলে গেছেন।
অজয়কান্তির পড়াশুনার সব দায়দায়িত্ব অনঙ্গমোহিনীর ছিল। ভাগ্য ভাল দেশের বাড়িতে তার স্বামীর জায়গা জমির অংশ তার অধীনেই ছিল। শাশুড়ি তার ওই স্বার্থপর পুত্রের স্বভাব জানতেন। মৃত পুত্র আর পুত্রবধূ আর মাতৃহারা পৌত্রকে তিনি বিশেষ দৃষ্টিতে দেখতেন। তাই সর্বার্থেই আমার বাবা তার বাঘের আঘাতে মৃত জেঠামশাই আর এই মা-জেঠিমার সন্তান। বাবা এলে প্রতিবারই বুঝিয়ে যানÑ‘কিতা যে পাগলের মত কতা কও মা। ষাইট বছর অইলেও মানুষ মরি যাইত কেল্লাগি? দেখ চাইন তোমার দেওর সব তোমার তাকি বয়সে কত বড়। তারা ত আগে মরুক। আর কইও না মা ইতা কতা।’
আমিও সুর মেলালামÑ‘ আর কইও না মা ইতা কতা।’
বাবা ও ছেলের একজনই মা। এখন আর বেমানান লাগে না। সংসারের চাকা ঘুরতে থাকে। প্রায় প্রতি মাসে বাবা আসেন। অনেক টাকা বেতন পান বাবা। দেড়শো টাকা তার নিজের খরচ হয় নেফাতে। বাকি একশ বিশ টাকা মায়ের কাছে রেখে যান।
Ñ‘আরে অত টাকা দেস কেল্লাগি বে। অত ত খরচ অয় না বুজস না। রাখতাম কই অত টাকা।’
Ñ‘জমাও তোমার ছোট পুয়ার বিয়াত লাগত না নি?’
ছোট পুয়া মানে আমি। বুড়ি রাগে ফুঁসে।
Ñ‘অয় আবার বিয়া। আবার আরেক বউ মরত। আমি পারতাম না কই দিলাম। আমারে আবার টাকা জমাইতে কয়।’
বাবা হাসে।
Ñ‘তর টাকা জমি গেছে বহুত। কিতা করতাম অত টাকা দিয়া।’ বুড়ি চলে যায় তার গুণগুণ করা হাছন রাজার দর্শনে।
Ñ‘কিসের বাড়ি কিসের ঘররে কিসের জমিদারি।
সঙ্গের সঙ্গীরা কেহই নাই তোর, কেবল একাশ্বরী\
ওই যে তোমার ধন জন, সুন্দর সুন্দর স্ত্রী।
কেহনি যাইবে সঙ্গে যমে নিলে ধরি\’
মা যে হাছন রাজার অনেক গান জানে এমন নয়। তবে যে কটা জানতো বেশ সুর করে গাইত।
Ñ‘আরে গো বুড়ি। তুমি ইতা গান না গাইয়া ভগবানের নাম কর না কেল্লাগি।’ বুড়ি এ কথার উত্তর দেয় না।
Ñআরে হোনস না বেটা। হাছন রাজার, ঠাকুরদার বাবা নু বে হিন্দু আছিল। আমার বাবার বংশ নু বেটা। হিবার কিতা অইলো হোন।’
Ñ‘কান্দে হাছন রাজার মন মইন্যা রে।’
সেবার পক্ষকাল হয়ে গেল টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে জল মোরগদের বন্দি করা হয়েছিল কৌশলে। প্রশিক্ষণ শেষ না হওয়া এমনি একটা জলমোরগÑযার এক পায়ে হাছন রাজার রূপার আঙটি লাগানো কি করে যেন পথ হারিয়ে বা জলে সাঁতরে তার সঙ্গীনির খোঁজে চলে এসেছিল অজয়কান্তিদের দেশের বাড়ির ভিটেয়। অনেকবার শোনা এ গল্প। বাড়ির উঠোনেই একটা টুকরি দিয়ে ঢেকে রাখা হল তাকে। কেউ খেয়াল করেনি তার এক পায়ে রূপার আঙটি পরানো আছে। তখন কুয়াশাও খুব। গ্রামের বড়রা সবাই জনতো জমিদার হাছন রাজার সখ হল জলমোরগকে বন্দি করে তাকে শিকারী বানানো। তার বাকি দুটো নেশা হলো পান খাওয়া আর দাবা খেলা। সুন্দরী রমনীদের সঙ্গ করা নিয়েও কানাঘুষো শোনা যায়।
যাই হোক কুয়াশায় পথ হারিয়ে আসা পাখির পায়ে রূপার আঙটির কথা জানাজানি হল। বলশালী লোকজন এসে হাজির একদিন। এই মারে কি সেই মারে। রাজার বাড়ির পাখি আটকে রাখা, এতো সাহস।
বাড়ির পাহাড়াদার কুকুরটার নাম কাজল। কাজলের মতোই এ বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিল। বিধবা অনঙ্গমোহিনী তখন অজয়কান্তিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দিনরাত যুদ্ধ করছেন। কাঙাল কি বুঝল কে জানে। এই কয়দিন পাখিটাকেও সে পাহারা দিয়েছে। আজ অপরিচিত তিনজন লোকের উপস্থিতিতে সে খুব চেঁচালো। আর লোকগুলো যখন বাড়ির একজন পুরুষ মানুষ আর পাখিটাকে ধরে নিয়ে রওয়ানা হচ্ছেÑ কাঙাল লাফিয়ে পড়লো একজনের ঘাড়ে। সর্দার লোকটা তার মাথায় মারলো বাড়ি। এমনিতেই সে তেজস্বী কুকুর নয়। মাথায় মোক্ষম বাড়িটা পড়াতে তার গলা থেকে কুঁই কুঁই একটা শব্দ বের হল। উঠোনেই পরে রইল সে।
অনঙ্গমোহিনীর মাথায় তখন কী একটা ভর করেছে।
Ñএখন তিন কুড়ি বয়স হবার পর আরো বেশি করে। সেদিনও ভর করলো। কাঙালকে প্রতিদিন খাবার দিত। তার এই দশা সহ্য হল না। রাজার পেয়াদারা পাখি আর বন্দি পুরুষটাকে নিয়ে রওয়ানা হবেÑহঠাৎ তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো ঘোমটা মাথায় হিন্দু ঘরের বিধবাটি। কি একটা যেন ছিল কন্ঠস্বরে তার।
Ñ‘আমিও কুলাউড়ার পুরি। তাইন আমরার বংশের মানুষ।’
পাইকরা কি বুঝলো কে জানে তবে তারা কুলাউড়া গ্রামটার নাম জানে। বন্দি পুরুষকে ছেড়ে দিয়ে শুধু পাখিটাকেই নিয়ে চলে গেল।
(ঝ)
এরপর দুদিন গঞ্জনা সহ্য করতে হল অনঙ্গমোহিনীকে। তার কথাতে যে বন্দি পুরুষকেÑএক ভাসুর পুত্র সেÑপাইকরা ছেড়ে দিয়ে গেছেÑএকথা কেউ উচ্চারণ করল না। তারপর কুয়াশা কেটে গেলে তিনদিনের মাথায় সবার জন্যই অপেক্ষা করছিল এক বিস্ময়। নৌকায় করে লোকজন এসে নামলো তাদের হাওরের পাড়ের জলঘেরা বাড়িতে। দুজন মুটের মাথা থেকে নামলোÑসাতটা সাদা পাড় হিন্দু বিধবার শাড়ি, সাতটা খাঁচাবন্দি ময়না পাখি। খাঁচাতে রূপার কারুকাজ করা। এক বস্তা উৎকৃষ্ট জাতের তাম্বুল। আর এক ঝুড়ি ছাতকের বিখ্যাত কমলা।
রাজা তাহলে বহু বছরের পুরনো ইতিহাসকে ভুলেননি। বীরেন্দ্রচন্দ্র অর্থাৎ তার প্রপিতামহ তো কুলাউড়া থেকেই সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী গ্রামে এসেছিলেন। প্রপিতামহের সৎ ভাই থেকে গেছিলেন কুলাউড়া। সেই ধারা হিন্দু রয়ে গেছেন। রাজার নির্দেশে এসেছে এতো সব উপহার সামগ্রী। সবাই অবাক। বাড়ির বড়রা কথা বলছিলেন পাইকের সঙ্গে। অনঙ্গমোহিনী কুড়ি বছর, হাছন রাজার ছিষষ্টি চলছে। কি হতে পারত দুজনের সম্পর্ক? দাদা, কাকা, জেঠা এমন কি দাদুও হতে পারতো। আজ আর অনঙ্গমোহিনী বাইরে আসেননি। ফিরে, যেতে যেতে একজন পাইক বলে গেলÑ‘আমিও কুলাউড়ার থনে আইসি।’
লোকজন চলে যেতেই পুরো গ্রাম এসে ভেঙে পরলোÑঅজয়কান্তিদের বাড়ি। একটাই লাভ হলোÑঅনঙ্গমোহিনীকে আর পরিবারের তুচ্ছতাচ্ছিল্য খুব একটা সইতে হল না।
মিকির পাহাড়ের বাড়িতে বাবা যখন ছুটিতে আসেনÑবাতাসটা বদলে যায়।
Ñ‘কিতা গো মাই। ঠিক করতে পারলায় নি? হাছন রাজার সঙ্গে দেখা অইলে কিতা ডাকলায় নি তুমি? দাদা?, কাকা, জেঠা না দাদু?’ এই জায়গাতেই অনঙ্গমোহিনী দুর্বল। এর উত্তর তার কাছে নেই। হয়তো তার বাবা কাকারা বলতে পারতেন।
Ñ‘যেতাউ হউক না। বংশের রক্ত। ভাইউ অইবা। অত পুরুষ আগর কথা। জানতাম কেমনে?’
Ñ‘ভাই না গো মা। তাইন তোমার দাদুই অইবা। কত বড় তোমার থাকি।’
বৃদ্ধা অন্যমনষ্ক হয়ে যান। হাছন রাজার ভুলে যাওয়া গানের কলি প্রাণপণে মনে রাখার চেষ্টা করেনÑ
‘আইস আইস প্রাণবন্ধু, আসিয়া লও কোলে।
ঠান্ডা হইব প্রেমের আগুন কোলে তুলিয়া লইলে।’
(ঞ)
অজয় কান্তি কদিন আর গ্রামে থাকতে পারেন? ছুটি ফুরিয়ে যায়। তখন বৃদ্ধা গ্রামের বাড়ি বাড়ি বেড়ানো অনেক বাড়িয়ে দেন। হাছন রাজার গল্প বলেন।
আর আমার স্কুল, ধানসিঁড়ি নদী, বকনা আকন্দদের সঙ্গে দিন কাটে। মাঝে মাঝে শহর থেকে তিরি এলে আমি আর নদীতে যাই না। তখন মাকে তাগদা দেই আমার নতুন শার্ট পেন্ট কোথায় আছে বের করে দিতে হবে। গেলবার তিরি এসে আমাদের বাড়িতে মায়ের কাছে গান লিখে নিয়ে গেছে। একটা গান তোলারও চেষ্টা করেছেÑ
‘বাঁশিটি বাঝাইয়া আমারে লইয়া যাও পরাণ।’
(ট)
গ্রামে রেডিও নেই। পত্রিকা আসে না। যুদ্ধের খবর এসে পৌঁছালো বাতাসে। কানাঘুষায়। চিন বন্ধুত্ব রাখেনি। নেফাতে চিনা সৈন্য ঢুকে গেছে। যুদ্ধ চলছে। অজয়কান্তি অনেক দিন হল বাড়ি আসতে পারেনি।
এমন একটা আবহে আমি এগারো বছর বয়সে জীবনে প্রথম মুখাগ্নিটা করলাম ধানসিঁড়ি নদীর শ্মশানে। বাবাকে খবর পাঠানো যায়নি। শহরে তিরির বাবাকে খবর পাঠানো হল অজয়কান্তিকে টেলিগ্রাম করে দিতে। তিনি বলে পাঠালেন পুরো ঠিকানা না হলে টেলিগ্রাম হয় না।
আমাকে প্রায় পুরোটা দিন বসিয়ে রাখা হল মায়ের শরীরের পাশে তুলসীতলায়। আমি অনেক কিছু বুঝতে পারছি না। কাঁদছিও না। আমার মা তাহলে মারাই গেছে। দীনাবুড়ি এসে খুব কাঁদছিল। আজ তাকে আটকাবার কেউ নেই। মুরুব্বিরা ঠিক করলেন মরা ফেলে রাখা যাবে না। বালকের অকল্যাণ হবে। গ্রামেরও। সবাই মিলে ব্যবস্থাতে লেগে গেল।
সন্ধ্যা হয় হয় আমি মুখে আগুন দিলাম আমার মায়ের
আমার বাবার জেঠিমারÑআমার ঠাকুমার বাবার জেঠিমার। চিতা জ্বললো। একসময় নিভেও গেল। বড়রা যা যা বললেন, আমি সব করলাম। সবার সঙ্গে নদীতে ডুব দিয়ে উঠে আসছি যখনÑঅনেকক্ষণ থেকে আলো দেয়া হারিকেনটা নিভেই গেল।
ও বাড়িতে আমি একা থাকবো কি করে আলোচনা চলছে। বকনার বাবা কাকা আমার সঙ্গে সঙ্গেই ছিলেন। ওদের বাড়ির উঠোনে গেলাম। কাকিমা আমাকে পাটকাঠিতে জ্বলতে থাকা আগুন আর লোহা ছুঁতে দিলেন। ভেজা শরীরে শস্যদানা বুলিয়ে আগুনে ফেলে দিলেন।
শুনছি আমি বকনা আর সতুকাকা আমাদের বাড়িতে থাকবো। আমি মাটিতে খরের বিছানায়। ওরা উপরে। আজ আমার খাওয়া নেই। কেউ একজন প্রশ্ন তুলছেনÑঅজয়কান্তি যদি আর কোনওদিন না আসেনÑতাহলে কী হবে এই ছেলেটার। আমি এর অর্থই বুঝতে পারছি না। মাথাও ঘামাচ্ছি না।
বকনাদের বাড়ির উঠোনটা অন্ধকার এখন। ফাঁকা। বকনা আমার হাত ছাড়েনি। দাঁড়িয়ে আছি। ভেজা কাপড়ে ঠান্ডা লাগছে। অন্য হাতটা কে যেন এসে ধরলো। অপরিচিত স্পর্শ। বকনা ডাকলো‘এ দিকে আয়।’
হাত যে ধরেছিল সে বললো ‘এদিকে এসো।’
কন্ঠস্বরে তিরিকে চিনতে পারলাম।

পাদটীকা :
১) জলমুরোগ- হাছন রাজার কিখ্যাত ‘কুড়া’ বা ‘কুড়ো’ পাখি।
২) মিকির পাহাড়-বর্তমান কার্বি আলঙ জিলা।
৩) নেফা NORTH EASTERN FRONTIER AGENCY (বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ)
৪) সাবুল-গ্রামীণ শ্রীহট্টের সদ্যজাত শিশু।