হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের চিরচেনা ভেট

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শরৎ এলেই বিল-ঝিলে ফুটে শাপলা ফুল। সাদা শাপলা যখন মাথা তুলে উঁকি দিয়ে দেখে শুভ্রাকাশ তখন তার পাতার নিচের বড় হয় গাঢ় সবুজ রঙের শাপলা ফল। শাপলা ফলকে চলিত ভাষায় ঢ্যাঁপ বলে চিনেন সকলে। সিলেট—সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় এ ফলকে ভেট নামে ডাকা হয়। তবে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের চিরচেনা এ শাপলা ফল বা ভেট। এখন হাওরের পর হাওর ঘুরলেও আগের মতো চোখে পড়ে না এ ফলটি। বেশ কয়েক বছর আগেও হাওর পাড়ের শিশু—বৃদ্ধরা ভেট তুলে বাজারে বিক্রি করতেন। অথবা নিকটস্থ হাওরে প্রতিদিন সকালে দেখা মিলতো ভেট তুলার দৃশ্যের। এখন সচরাচর সে দৃশ্য আর চোখে পড়ে না।
ভেটের ভিতরে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য বীজ মানুষের খাদ্য। গ্রামের গৃহিণীরা ভেট দিয়ে নানান সুস্বাদু খাদ্য তৈরি করতেন এক সময়। ভেটের বীজগুলো যখন খুব কচি থাকে তখন খাওয়া হয় না। কিছুটা পেকে আসলে খাওয়া হয় এবং পুষ্ট হলে (গাঢ় কালো রঙের হলে) রান্না করেও খাওয়া যায়। পাকা বীজ ভেট থেকে বের করে ছাই (খলই জাতীয় কোনো কিছু) দিয়ে ঘষে বীজের গায়ের পিচ্ছিল আস্তরণ ছাড়ানো হতো। পরে রোদে শুকানো হতো খই ভাজার জন্য। এসব খইয়ের সাথে গুড়ের রস মিশিয়ে তৈরি করা হতো সুস্বাদু ঢ্যাঁপের মোয়া, মুড়কি ও নাড়ু যা ছোট বড় অনেকের খুব প্রিয়। রথের মেলায় এধরণের খইয়ের দেখা মিলতো খুব বেশি। এখন সেসব খাবার আর দেখা যায় না। প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে মানুষের রুচিবোধও। কেউ আর এসব খান না। অথচ এসব খাবার আমাদের দেশের গ্রামীণ ঐতিহ্য বয়ে চলে অবিরাম।
ভেট দেখতে গোলাকার এবং গাঢ় সবুজ রঙের হয়। যখন কচি থাকে তখন তার ভেতরের বীজগুলোর রং থাকে লাল, যখন বীজ পেকে যায় তখন কালো রঙ ধারণ করে। এই ফল পাকলে ফেটে যায়, এর মধ্যে অনেকগুলো কোষ থাকে। কোষগুলোর মধ্যে থাকে অসংখ্য বীজ। বীজগুলো আকারে খুবই ছোট। কিছু সাদা আবরণও থাকে। এগুলোও খাওয়া যায়। কালের বিবর্তনে গ্রামীণ ঐতিহ্য বহণকারী এ ফল হারিয়ে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে ফলটিকে ধারণকারী জাতীয় ফুল শাপলার সংখ্যাও। এর কারণ কারণ হিসেবে জলবায়ুর ব্যপক পরিবর্তন, হাওরে কীটনাশকের ব্যবহার আর জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যপকহারে বিল—ঝিল ও জলাশয় কমে যাওয়াকেই দায়ী করছেন কৃষিবিদরা।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাজেদুর রহমান বলেন, ক্রমশ মানুষ বাড়ছে আর ভূমি কমছে। আগে যেসব জলাভূমি বা জলাশয়ে শাপলা ফুটতো এখন সেখানে মানুষের বসবাস। এমন অসংখ্য স্থান আপনি পাবেন। শাপলা না থাকলে ফল থাকবে কোত্থেকে।
তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। শাপলাও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার হচ্ছে, এসব কারণে ঢ্যাঁপও হারিয়ে যাচ্ছে। এটা দুঃখজনক। অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতে পারতেন এসব বিক্রি করে। ঢ্যাঁপের ডাটা ভালো সবজিও।