হালির হাওরে নির্বিচারে সরকারি গাছ লুট

বিন্দু তালুকদার
জামালগঞ্জের হালি হাওরের তীরবর্তী সুন্দরপুর জলমহাল ও কালীবাড়ি খালের দুইপাশের সরকারি জমির করচ বাগে গাছ লুটের হিড়িক পড়েছে। গত কয়েকদিন ধরে এলাকার লোকজন নির্বিচারে গাছ কেটে নৌকা বোঝাই করে বাড়ি নিচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হালি হাওরপাড়ের সুন্দরপুর জলমহাল ও কালীবাড়ি খালের দুই পাশের করচ গাছ কেটে নিচ্ছে জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের আছানপুর, হরিপুর, হরিনাকান্দি, মাহমুদপুর, তাহিরপুরের শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের পৈ-ুপ ও ধর্মপাশা উপজেলার সানবাড়ি, বরই, বানারসিপুর, স্বরসতীপুর, নজরপুর, ভাকরপুরসহ আরও অনেক গ্রামের লোকজন।
গত এক সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে চলছে এই সরকারি গাছ কাটার মহোৎসব। কুড়াল দিয়ে মাটি থেকে হাত-দেড়েক উপরে গাছ কেটে নৌকা বোঝাই করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এলাকার সকল গ্রামের লোকজনই গাছ কাটায় জড়িত থাকায় কেউ কাউকে বাধা দিচ্ছেন না। স্থানীয় ইউপি সদস্যরা বাধা দিলেও তাদের কথা শুনছেন না কেউ। গত কয়েকদিনে অন্তত হাজার খানেক গাছ কাটা হয়েছে। ৫-৭ লাখ টাকার গাছের ক্ষতি হয়েছে। যেভাবে গাছগুলো কাটা হয়েছে, এতে সবগুলো গাছ মরে যাবে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
দুর্গম হাওরপাড়ে নির্বিচারে এসব গাছ কাটার ফলে পাখি ও মাছের নিরাপদস্থল ধ্বংস হয়ে যাবে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। পাশাপাশি এসব গাছ কেটে নেয়ার ফলে হাওরে নৌকাডুবি বা অন্য নৌ দুর্ঘটনায় জেলেদের জীবন বাঁচানোর জন্য কোন আশ্রয় থাকবে না। তাই জরুরি ভিত্তিতে গাছ কাটা বন্ধ ও জড়িতদের শাস্তির দাবি উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যারা গাছ কাটার সাথে জড়িত তারা হলেন- হরিনাকান্দি গ্রামের কামাল মিয়া, আবু মিয়া, ইদ্দিছ মিয়া, গোলাপ মিয়া, শাহপরান মিয়া, করিম মিয়া, পরান মিয়া, গুলেনূর মিয়া, আবাল মিয়া, ফজলুল হক মিয়া, রাসেল মিয়া, আলিম আল। মাহমুদপুর গ্রামের সফিকুল ইসলাম, ছুরত জামান, আমিনুল ইসলাম, জমিরুল ইসলাম, হেলাল মিয়া, আমিনুল ইসলাম, ফজলু মিয়া, আমিরুল ইসলাম, আল আমিন।
অন্য গ্রামের কারও নাম অনুসন্ধান করে জানা যায়নি।
হরিনাকান্দি গ্রামের জালাল উদ্দিন গতকাল শনিবার বিকালে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন,‘গত ৬-৭ দিন ধরে হাওরে গাছ কাটা চলছে। হরিনাকান্দি, আছানপুর, মাহমুদপুর, পৈ-প গ্রামের কিছু মানুষ এসব গাছ কাটছে। মনো মেম্বার (ইউপি সদস্য মনো মিয়া) প্রতিবাদ করার পর দুইদিন গাছ কাটা বন্ধ ছিল। এখন আবার পুরোদমে চলছে গাছ কাটা। শনিবার ১০টি নৌকা বোঝাই করে গাছ কেটে আনা হয়েছে।’
হরিনাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ডের সদস্য মনো মিয়া বলেন,‘আমি আমার গ্রামের লোকজনকে গাছ কাটতে বাধা দিয়েছিলাম। কিন্তু গ্রামের লোকজন আমার বাধা মানছেন না। আমি বিষয়টি মোবাইল ফোনে ইউএনও স্যারকে জানিয়েছি। তিনি মামলা করার জন্য বলেছিলেন। আছানপুর, হরিপুর, মাহমুদপুর, তাহিরপুরের পৈ-ুপ ও ধর্মপাশার সানবাড়ি, বরই, বানারসিপুর, স্বরসতীপুর, নজরপুর, ভাকরপুরসহ আরও অনেক গ্রামের লোকজন গাছ কেটে নিচ্ছে। অন্তত ১০ লাখ টাকার গাছ কাটা হয়েছে। এভাবে গাছ কাটলে দুই দিন পর হাওরে আর কোন গাছই থাকবে না। ’
অবাধে গাছ কেটে নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আছানপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. সুফিয়ানও।
তিনি জানালেন, সুন্দরপুর বিলের ইজারাদাগণ বিলের স্বার্থে গাছগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। বিলের পাহাড়াদারদের কারণে অতীতে কেউ গাছ কাটতে পারতেন না। এখন বিলের ইজারাদার না থাকায় গত কয়েকদিন ধরে আছানপুর, হরিনাকান্দি, মাহমুদপুর, সানবাড়ি, বরই, বানারসিপুর, স্বরসতীপুর, নজরপুর, ভাকরপুরসহ আরও অনেক গ্রামের লোকজন গাছ কাটছে। বাধা দেয়ার কেউ নেই। গত ৩/৪ দিনে কয়েক লাখ টাকার গাছ কেটে নেয়া হয়েছে। ’
সুন্দরপুর বিলের প্রাক্তন ইজারাদার তাহিরপুরের শ্রীপুর দক্ষিণ ইউপির প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান দীনেশ তালুকদারের ছেলে দিপক তালুকদার বললেন,‘আমার বাবা ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিন সুন্দরপুর বিলের ইজারাদার ছিলেন। তিনি পাখির আবাসস্থল, বর্ষাকালে হাওরের জেলের জীবন বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে সুন্দরপুর বিলের আশপাশ, আছানপুর গ্রাম খেকে জারাকোনা গ্রাম পর্যন্ত, বেতাগড়া থেকে জারাকোনা গ্রাম পর্যন্ত ও করাইজান বিলের তীরে অন্তত ৫ লাখ টাকার গাছ লাগিয়েছিলেন। কালীবাড়ি বাঁধের কাছে কাবিলা বিলের তীরে ইট দিয়ে কালীবাড়ি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। বিলের পাহাড়াদাররা এসব গাছ দেখাশুনা করতেন। কিন্তু এখন নির্বিচারে এসব গাছ কাটা হয়। সরকারি জমিতে বড় হওয়া এসব গাছ রাষ্ট্রের সম্পত্তি হলেও গাছ কাটা বন্ধে প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই কষ্টদায়ক।’
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শামীম আল ইমরান বলেন,‘ দুর্গম হাওরপাড়ের এসব গাছ প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব গাছ হাওরের বাঁধ রক্ষায় খুবই উপকারী, পাশাপাশি পাখি ও মাছের আবাসস্থল। এসব গাছ রক্ষায় স্থানীয়দের এগিয়ে আসতে হবে। দ্রুত খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। ’
হালি হাওরপাড়ের সরকারি গাছ অবাধ কেটে নেয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলামকে অবগত করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।