হাসাউড়ার আনারস ও এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

হাসাউড়ার আনারস ক্রমশ একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হচ্ছে। জলঢুপ কিংবা বারইপুর অথবা মধুপুরের আনারসের মতো হাসাউড়ার আনারসও পৃথক পরিচিতি পেতে শুরু করেছে। হাসাউড়ায় যদিও এখন খুবই সীমিত এলাকায় আনারস চাষ হয় তবুও এই আনারস এখন সুনামগঞ্জের গন্ডি ছাড়িয়ে বাইরেও যাচ্ছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য পাওয়া যায়। হাসাউড়ার আনারস নিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এই অঞ্চলে আনারসের চাষ আরও বাড়ানো যেতে পারে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের প্রতিবেদন অনুসারে হাসাউড়ায় ১২০ টি বাগে ৯০ জন চাষী আনারস চাষ করছেন। এখানে আনারসের মোট উৎপাদন প্রায় ১২ লাখ টি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা। এই পরিমাণ উৎপাদন হয়ত ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু আমরা যখন হাসাউড়ার মতো ছোট্ট একটি সীমান্তবর্তী গ্রামের কথা চিন্তা করব তখন এই পরিমাণ উৎপাদনকে ছোট ভাবার কোন অবকাশ নেই। হাসাউড়ার আনারসের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো মৌসুমের শুরুতেই এটি বাজারে আসা শুরু হয়। এই আনারস সুমিষ্ট ও সুস্বাদু। বাজারে এই জাতের আনারসের চাহিদা বেশ। এখন সুনামগঞ্জের বাজারে হাসাউড়ার আনারস ভিন্ন আর কোন আনারস নেই। অর্থাৎ আনারস মৌসুমের প্রথম ভাগটির স্থানীয় চাহিদা মিটায় হাসাউড়ার এই আনারস।
বাংলাদেশে যত মৌসুমী ফল রয়েছে তার মধ্যে আম ও কাঠালের পরই জনপ্রিয়তার দিক থেকে আনারসের অবস্থান। আনারস ভিটামিনসমৃদ্ধ ফল। এতে আছে ভিটামিন এ, বি ও সি। এই ফলের রয়েছে নানাবিধ ঔষধি গুণ। জ্বরজারি হলে মুখের রুচি ফেরাতে আনারস বেশ কাজ করে। আমাদের মা-ঠাকুমারা জ্বর হলেই আনারসের খোঁজ করেন। তাঁদের মতে আনারসে রয়েছে জ্বর প্রতিরোধক এন্টিবায়োটিকের গুণাবলী। অন্যদিকে আনারস চাষে তেমন কোন বেগ পেতে হয় না চাষীদের। একবার একটি আনারস বাগান তৈরি করা সম্ভব হলে বছরের পর বছর ধরে এ থেকে সামান্য পরিচর্যার মাধ্যমেই ফলন উঠানো সম্ভব। হাসাউড়ার বর্তমান আনারস বাগানগুলোও বংশানুক্রমিকভাবে পেয়ে বর্তমান চাষীরা উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত রয়েছেন। আনারসকে বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়ায় জুস, জেলি, আচার, চাটনিতে রূপান্তরসহ সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্রাণ’ পণ্যের দেশ-বিদেশে জনপ্রিয়তা থেকে আমাদের কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে সেটি প্রমাণিত হয়। আনারসের এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাটি আমাদের বিবেচনায় রেখে দেশের যেসব অঞ্চলে আনারস চাষের সুযোগ আছে সেখানে এই ফলটিকে আরও সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন।
হাসাউড়ার মতো ভৌগোলিক এলাকা সীমান্ত জেলা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার প্রভৃতি স্থানে প্রচুর রয়েছে। এসব অঞ্চলে যদি পরিকল্পিতভাবে আনারস বাগান সৃজন করা যায় তাহলে সেটি লাভজনকই হবে। আমাদের চাষীরা অনেক উদ্যমী ও পরিশ্রমী। তাঁরা অল্প সুযোগ সুবিধা দিয়েই ভাল ফলন আদায় করে নিতে পারেন। এছাড়া আনারস চাষকে কেন্দ্র করে একটি তরুণ উদ্যোক্তা শ্রেণিও গড়ে উঠতে পারে। ফলন বেশি হলে এখানে ছোট বা মাঝারী আকারের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা সুনামগঞ্জের অনুকূল ভূপ্রাকৃতিক গঠনের সুযোগ নিয়ে আনারস চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাই।