হায়দার আলীর স্বপ্ন

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

রাজনগর গাঁয়ের হায়দার আলী সুখী, শান্তিপ্রিয় ও সম্পন্ন মানুষ। তিনি তার নিজস্ব মতবাদ দিয়ে নিজের জীবনকে পরিচালনা করতে ভালোবাসেন।
কাঁচাভোরে তার ঘুম ভেঙে যায়, এরপর তিনি আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারেন না। বাইরের আঙ্গিনায় তিনি কী এক মোহঘোরে পায়চারী করতে থাকেন, এই ঊষাকাল থেকেই দিনটি শুরু হয় তার, প্রচুর জমিজমার অধিকারী তিনি। এসবই দাদাজান ও বাপজানের সূত্রে পাওয়া। পরম যতেœ ও সার্বক্ষণিক তদারকিতে তিনি বিষয় সম্পত্তি বহুগুণ সম্প্রসারিত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিশ্রমই সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। আলসেমিকে তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করেন। চারপাশের অনেকের উত্থান পতন দেখে উপলব্ধি করেছেনÑনিজে শুয়ে বসে থাকলে তকদীরও একঠাঁয় বসে থাকে।
দেশী বিদেশী ফুলের সমারোহে পৈতৃক ভিটে বাড়িটি দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ধান-সর্ষে-ফল-সবজি ক্ষেতের দিকে তাকালে মন ভরে যায় তার। ধানের নোলক, সর্ষে ফুলের হলুদ রঙ, মটরশুঁটির লতা কী এক মোহমায়ায় তাকে যেন জড়িয়ে রেখেছে। গায়ের বাড়ি ছেড়ে বাইরে কোথাও তিনি যেতে চান না। অথচ ঢাকা-চাঁটগাঁ-কুমিল্লা থেকে শুরু করে বোস্টন,টরেন্টো, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াতে তার ভাই-বোনেরা, আত্মীয়-স্বজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। সবাই তাকে ভালোবাসে, সমীহও করে প্রচুর। কত অনুনয় বিনয় ওদের, মোবাইলে কথা হয় ওদের সাথে।
Ñভাইজান Ñ মেলবোর্ন এর একবার অন্তত আসুন। ছোটবোন টিয়ার আব্দারÑলন্ডনে আপনাকে একবার আসতেই হবে বড় ভাইয়া। অনেক চেনা লোকজন পাবেন, সিলেটি ভাষায় কথা বলতে পারবেন।
বোস্টন থেকে মেজবোন ময়না অভিযোগ করে বলে, গাঁয়ের বাড়ি থেকে বের হলে প্রথমে আমাকে দেখতে আসবেন ভাইজান। নাহলে আপনার সঙ্গে কাট্টি। ঠিক ছোটবেলার সতো বলে ময়না। কাট্টি মানে আড়ি।
আদিগন্ত ছুঁয়ে যাওয়া নিজের অফুরন্ত ক্ষেত খামারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেজবোনের কথা মনে করে ঠা ঠা করে হাসেন হায়দার আলী।
গরু চরানো রাখাল, ক্ষেতে নিড়ানি দেয়া কিষাণরা চমকে উঠে। ভীষণ রাগী আর গম্ভীর মালিকের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ঝুপসি পাতার আড়ালে বসা একঝাঁক পাখি ঝটপট ডানা মেলে আকাশে। এক সময় ওরা কালির বিন্দুর মতো হারিয়ে যায়।
দুপুরের ঝাঁঝালো রোদ সন্ধ্যায় কমনীয় হয়ে এসেছে। এবার ঘরে ফেরার পালা তার। বৈশাখী রোদে ঘেমে নেয়ে কিষাণরা পুকুর ঘাটে নেমেছে। এই শান্তি¯িœগ্ধ সময়টা বড় প্রিয় তার। সেই উষাকাল থেকে গোধূলি পর্যন্ত কি করে যে কেটে যায় হুঁশ করে Ñ তা নিজেও বুঝতে পারেন না।
বাড়ির পথ ধরে আপন মনে ভাবেন, বোস্টন, টরন্টো, মেলবোর্ন কিংবা লন্ডন যেখানেই তিনি যাবেন, বোন কিংবা ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করবেÑহোয়াট ডু ইউ মিন বাই উষাকাল অর গোধূলি? উষাকাল যে মুক্তকণার মতো শিশির ভেজা কাকভোর কিংবা আসন্ন সন্ধ্যায় গরুর পাল নিয়ে রাখাল যখন ঘরে ফেরে, গরুর পায়ের ধূলিতে কুয়াশা মাখা হয়ে উঠে সন্ধ্যাÑ এটাই গোধূলিÑ এগুলো কি ভালো করে বুঝাতে পারবেন ওদের? ওদের লাইফ স্টাইল তো অন্যরকম।
বাড়িতে ফিরে কিসমিস-বাদাম দেয়া ঘিয়ের হালুয়া আর এক গ্লাস ঠা-া শরবত খেয়ে ধাতস্ত হন হায়দার আলী। শেষ জ্যৈষ্ঠের গরম ভীষণ তাতানো, আম, কাঁঠাল, লিঁচু-গোলাপজাম পেকে উঠে এই ভাপে। রাহেলা শরবতের গ্লাস আর হালুয়ার বাটি তুলে নিতে নিতে বলে , মেজভাই মোবাইল করেছেন।
মেজভাই আতাহার ঢাকায় থাকে। নতুন ফ্লাট বাড়ি কিনেছ্,ে বড় ভাই ভাবীকে না দেখিয়ে স্বস্তি পাচ্ছে না সে। এবার রমযানের মাস ওদের সাথে থেকে ঈদ করে তবেই ভাইজান-ভাবী বাড়ি ফিরতে পারবেন।
হ্যাঁÑনিজের বৃত্তের বাইরে মাঝে মাঝে মানুষের বেড়িয়ে পড়া দরকার।
‘আপন বাহিরে মেল চোখ
সেইখানে অনন্ত আলোক’
রবীন্দ্রনাথের এই পঙক্তিটি তার মনে খেলা করতে থাকে।
সিলেট এম.সি কলেজে বি.এ পড়তে পড়তে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন হুট করে। সেই টিলার উপর গাছগাছালি ঘেরা কলেজ বাড়িটি দেখতে দেখতে শুধু রাজানগর গাঁয়ের কথা মনে পড়ত। এ সময় আচমকা বুকের ব্যথায় অসুস্থ হয়ে আব্বা মারা না গেলে হয়তো কলেজের পড়া শেষ করেই বাড়ি ফিরতেন, কিন্তু তা আর হয় নি। বাড়ির বিষয়সম্পত্তি দেখা, চার ভাই দু’বোনের দায়িত্ব নেয়া সব হুড়মুড় করে ঘাড়ে এসে পড়ে।
আম্মা মারা যাবার আগে বিয়ে দিয়ে গেছেন রাহেলার সঙ্গে। ঘর-সংসারে রাহেলা আর বাইরের জগতের সাথে জড়িয়ে রইলেন হায়দার। নিজে নিঃসন্তান তবে টিয়া-ময়নার বিয়ে, ভাইদের প্রতিষ্ঠা করিয়ে দিতে দিতে একদিন স্বামী স্ত্রী অনুভব করলেনÑ মেঘে মেঘে বেলা অনেক গড়িয়ে গেছে। তবে অভ্যেসের নিগড়ে থেকে থেকে রাহেলার প্রিয় হয়ে উঠেছে সংসার। হায়দার তার বৈষয়িক জগতেই আনন্দ আর আত্মতৃপ্তি খুঁজে পান। দূর জগতের হাতছানি তাকে তেমন টানে না। তবে বেশ কিছুদিন ধরে ভাইবোনের অহরহ ও একটানা ডাকে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন হায়দার আলী। যে যখন সুযোগ পায় বাড়িতে এসে হৈ-হুল্লোড় করে স্বাদু রান্নায় আপ্লুত হয়, যাবার বেলায় চোখের পানিতে ভেসে যেতে যেতে বলেÑ এবার কিন্তু আমাদের ওখানে যেতে হবে ভাইজান। হায়দার আলী বরাবরের মতো বলেন, আমরা গাঁওÑগেরামের মানুষ, ভেজাল ভুজাল শরীরে সয় না। কথাটা শুনে সবাই অভিমান করে-আমরা বুঝি শুধু ভেজালই খাই? তাহলে বেঁচে আছি কি করে? ভাইজানের কথার কোন ঠিকঠিকানা নেই। এবার আর ছাড়াছাড়ি নেই। আতাহার জেদ ধরেছে বাড়ির শিকড় ছেড়ে ঢাকা কদিনের জন্য অন্তত যেতে হবে। একই বিল্ডিং-এ ছোট ভাই, মোজাহারও থাকে। ওদের সাথে এক সঙ্গে কিছুদিন কাটানো যাবে।
ধানমন্ডির ৪ নম্বর রাস্তার তিন হাজার স্কয়ার ফুটের ফ্লাটে আনন্দের ফোয়ারা বয়ে যায়। ঋতু, টিটো, মিমো, রিমো, ডালু ওরা খুশিতে ডগোমগো হয়ে ঘোষণা দেয়Ñআজ আমরা স্কুলে যাব না, যাব না, যাব না। বড় চাচ্চু আর চাচিমা এসেছে যে, সঙ্গে চাচুর সর্বক্ষণের সঙ্গী আমীর মিয়া। এখন ছোটদের সব দুষ্টুমি মাফ।
হবে না? আজ একটা বিশেষ দিন যে, যে মানুষটি রাজা নগর গাঁ ছেড়ে সহজে নড়েন না, তিনি হুট করে কাউকে জানান না দিয়ে চলে এসেছেন ঢাকায়। মেজ ভাই আতাহার আর ছোট মোজাহার একই বিল্ডিংÑএর দুটি ফ্লাটে থাকে। দুভাইকে একসঙ্গে পেয়ে খুশির আসর আরও জমজমাট হয়ে উঠে।
হায়দার গাঁয়ের বিশাল বাড়িতে থাকেন। বছরের পর বছর ধানী জমি, ফল, সবজি বাগান, ফুলের বাগিচা আর গাঁয়ের লোকজনদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তিনি। এখন শহরে আপনজনদের মাঝে রয়েছেন। খুব আনন্দ তার।
ছেলেপুলেরা খেতে বসলে ডাইনিং টেবিলের পাশে নকশা করা (শুধু তারই জন্য অর্ডার দিয়ে আতাহার তৈরি করিয়েছেন) চেয়ারে বসে খাবার তদারকি করেন।
Ñওসব দিতাছ ক্যান বানুর মা? এক একদিন একেকরকম খাওয়ন দিবা, নাইলে পোলাপানরা খাইব ক্যান? বুঝতে পারছ আমার কথা, না বোঝো নাই? বানুর মা আস্তে করে বলেন, হ বুজছি। গালিব আর রুবাই বলে, ভালো করে বুঝে নাও বুয়া বড় চাচুর কাছ থেকে।
পাঁচ-ছয় দিন বেশ কাটল। রাহেলাকে ঘিরে ছোটরা গল্পের জমাটি আসর বসায়। যখন-তখন পিঠে-পুলির আব্দার করে। তিনি ছোটদের নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটান। বেশ লাগে তার। হুঁশ করে দিনগুলো বয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে মেহমান এলে ছোটদের এমনিতেই ভালো লাগে, পড়াশুনার বালাই থাকে না, মা-বাবার চোখ পাকানো শাসন কর্পূরের মতো উবে যায়।
রোজার মাস শুরু হয়েছে। শ্রাবণ মাসের ঝিপেঝিপে বৃষ্টি, বাড়িতে উৎসবের আমেজ। ডালি, ঋতু, টিটো, রিমোর বুকের খুশি উপচে পড়ে।
দক্ষিণ খোলা বেডরুমটি বড় ভাইয়ের জন্য ছেড়ে দিয়েছে আতাহার। ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা পুরু তোষক-ম্যাট্রেসে পরিপাটী বিছানায় শুয়ে স্ত্রীর জন্য বহুদিন পর রোমাঞ্চকর টান অনুভব করতে থাকেন হায়দার। রাহেলাকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে বুকে টেনে নেন, রাহেলাÑআরে করেন কি, কি করেনÑবলে মোহময়ী রমণী হয়ে উঠেন।
বিষয়-সম্পত্তি, ক্ষেত-খামার দুজনকে যেন হিসেব-নিকেশের এক বৃত্তে বন্দী করে রেখেছিল। মধুর এই রাতে একান্ত ভাবনায় হায়দার আলী আর রাহেলার মনে হয়Ñজীবন ভারী সুন্দর। সকাল-সন্ধ্যার একঘেঁয়ে ঘেরাটোপ থেকে মাঝে মাঝেই বুঝি বেড়িয়ে পড়তে হয়, সাংসারিক ঝুট ঝামেলা থেকে মধুর মুক্তি।
হায়দার আপন মনে বলেন, শহরের দিনগুলো তো ভালোই কাটতেছে, ক্যান যে এদ্দিন গাঁ ছাইড়া আইলাম না।
টিয়া-ময়না দু’বোন বোস্টন আর ইংল্যান্ড থেকে ফোন করে।
Ñএরপর ভাবী, আমাদের এখানে আসতে হবে।
Ñতোমাগো ভাইজান রাজী হলে আমার তো কোন অসুবিধা নেই বুবু। দুজনেই খুব উপভোগ করেন প্রতিটি মুহূর্ত। আমীর আলী ওদের পরম যতেœ বিভোর। গাড়ি চড়ে সে ঢাকার শহর দেখে বেড়াচ্ছে। শুধু বলছেÑআহা কী সুন্দর, হাচাই কইতাচিÑএমুন কুনুদিনও দেখি নাই।
হঠাৎ করে একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় হায়দারের, রাত দুপুরে বিকট সেই আওয়াজে বুকের ভেতরটা টিপটিপ করে তার। হৃদপিন্ডটা লাবডুব লাবডুব ছন্দে নাচতে থাকে।
আতাহার কাছে এসে বলে, ঘুম ভেঙ্গে গেছে নাকি ভাইজান? কথা বলতে পারেন না হায়দার আলী। ছোটভাই আর স্ত্রীর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। আতাহার অভয় দেয়,Ñ ভয় পাওয়ার কিছু নেই ভাইজান। সামনে বিশ তলা ফ্ল্যাট হচ্ছে তো, দুশ ছাব্বিশটা ফ্ল্যাট হবে। তাই লোহার রড, ইট, সিমেন্টের বস্তা নিয়ে বড় ট্রাক এসেছে।
হায়দার তাজ্জব,Ñরাইত তিনটায়?
Ñহ্যাঁ ভাইজান। এখানে সারা দিনরাত কাজ চলে। ঋতুর আম্মু রোদেলা এসে বলে, শহরে কি কেউ কারো কথা শুনে? জোর যার মুল্লুক তার। কেউ কাউকে পরোয়া করে না, যার যা ইচ্ছে হয় করে। খুব রেগে গেছেন হায়দার।
Ñএ কি মুগের মুল্লুক নাকি? এ কোথায় আইলাম রে, রাইতে নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেও পারুম না।  
দু’বউ রোদেলা আর নওশীন সেহেরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাহেলা ছোট দুই জাকে স্বাদু রান্নার কৌশলগুলো বাতলে দেন, রোদেলা আর নওশীন বলে, আপনার কাছ থেকে সব টিপস শিখে নেব আমরা। মেয়েরা গল্প আর কাজে মেতে উঠে। কিন্তু কিছুতেই আর নতুন করে ঘুম আসে না হায়দারের। বিছানায় তেমনই বসে থাকেন তিনি। ছোট ভাই মোতাহার বলে, ছি: ছি: Ñ আপনার ঘুম ভেঙে গেল !
Ñতোমাদের ঘুম ভাঙে না?
অসহায় আতাহার বলে, আমাদের সয়ে গেছে ভাইজান। হায়দার মেজাজী গলায় বলেন,বাড়ি বানাইবো একজন, আর এলাকার হাজার জনের ঘুম ভাঙাইবো। কি কও?
পরদিন হায়দার বলেন, ট্রেনের টিকেট কাইটা আনো আতা। রাইতে না ঘুমাইয়া মরুম নাকি?
রাহেলা মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন, কী শাহী মেজাজ ? দ্যাখো দ্যাখোÑকারে লইয়া ঘর করি। এক রাইত না ঘুমাইলে মাইনসে মরে না।
গাঁয়ের বাড়িতে স্বামীর সাথে এমন করে কথা বলেন না, এখানে এসে দেবর-জা সবার মাঝে থেকে সত্যি কথাটি বলতে পারেন।
দুদিন পর, বেলা দশটা থেকে শুরু হয় কান ফাটানো আওয়াজ। ঘট্ ঘট্ ঘট্ ঘট্। শব্দটা থামার কোন লক্ষণ নেই। আজ নাকি সারাদিন এই চলবে। ভাইজি ডালু বলে, ও কিছু নয় বড় চাচা। ওপাশে ছয় তলা বিল্ডিং হচ্ছে তো। ইট ভেঙে সুরকি করা হচ্ছে মেশিনে।
কেউ কারো কথা শুনতে পাচ্ছে না, চেঁচিয়ে কথা বললেও কানে যাচ্ছে না।
হায়দার আলী আপন মনে গজগজ করেনÑ কিছু না মানে? কথাই কইবার পারি না, শোনবার পারি না, সারা দিনই কি এমুন চলবো? বুকভাঙা করুণ নিঃশ্বাস ফেলেন তিনি। রোদেলা চেঁচিয়ে বলেÑও বুয়া, ফ্রিজ থেকে মুরগি বের করে ভুনা করবেÑবুঝলে?
Ñকি কন ভাবী? হুনবার পারি না। কানে ফটা লাইগ্যা গেছে।
হায়দার গমগমে গলায় বলেন, ও আমীর, ও আমীর‌্যাÑ আতা আর মোজাকে বল, দক্ষিণ খোলা ঘরের কাম নাই, আমারে কোণার ঘর দিয়া দিতে।
সন্ধ্যার ইফতারীতে প্রণ-টেম্পুরা, ডিমের ডেভিল, পিৎজা, শাওয়ারমা লোভনীয় খাবারগুলোতে আপ্লুত হয়েও চারপাশের হট্টমেলায় তিতি বিরক্ত হায়দার আলী। ইফতারীর কিছু সময় আগে মেশিন বন্ধ হলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন সবাই। হায়দার বলেন, যন্ত্রণা আর সয়না রে আমীর‌্যা।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই ঘুমোতে যায়। প্রথমে ঝিরিঝিরি, ধীরে ধীরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে, শ্রাবণ মাস, ঘনঘোর বর্ষা। অল্প সময়েই অতল ঘুমে তলিয়ে যান হায়দার, এখানে টিনের চাল নেই, টুপটাপ-ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে না। তবে থাই এ্যালুমিনিয়ামের রূপো রঙ জানালার আবছা নীল কাঁচের শার্সি বেয়ে বৃষ্টির দানা ঝরতেই থাকে, ষ্ট্রিট লাইটের আলোয় হীরের টুকরোর মতো জ্বল জ্বল করে ফোঁটাগুলো।
পাশ বালিশকে আঁকড়ে ধরে আয়েশী ঘুমে মগ্ন হয়ে থাকেন হায়দার। বেশ পুরু অথচ মোলায়েম নকশি কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। রাহেলা তো বরাবরের ঘুম কাতুরে, বিছানা একটা পেলেই হলো। জায়েরা পরিশ্রম করতে দেয় নাÑতারপরও বানুর মায়ের হাত থেকে নিজেই হাসি মুখে নানা দায়িত্ব নিয়েছেন। বাঁধাবাড়া করতে তার ভালোই লাগে। বিশেষ করে ঋতু, টিটো, মিমো, ডালু বলেÑ বড় চাচী তুমি রাঁধবে কিন্তু, বুয়া-ম্যাম-ছোট চাচী-ওরা কিছুই পারে নাÑ
এসব শুনতে ভীষণ ভালো লাগে রাহেলার। কদিন ইবা থাকবেন, সেই তো ফিরে যেতে হবে রাজানগর গাঁয়ে। যা কিছু রাধেন পিঠে-পুলি-ফিরনী-পায়েশ তৈরি করেন, ছোটরা আনন্দ করে সোনামুখ করে খায়Ñএতেই তার তৃপ্তি।
গভীর রাতে বিছানায় উঠে বসেন রাহেলা। তাকিয়ে দেখেন স্বামী বিছানা ছেড়ে চেয়ারে বসে আছেন। বাইরে হুড়োহুড়ি আর কান ফাটানো দাপাদাপি আওয়াজ। এর সাথে যুগলবন্দী হয়ে মিশতে থাকে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি। ব্যাপার কী? গ্রিল ভেঙে ডাকাত ঢুকলো নাকি? এ তো মহাজ্বালা, শহরে বেড়াতে এসে কি বিপদ ডেকে আনলেন। দিন-রাতের সর্বক্ষণ একটা না একটা অঘটন ঘটেই চলেছে। রাতের ঘুম তো হারাম হয়েই গেছেÑ এবার প্রাণে বাঁচবেন তো!
পা টিপে টিপে এগুতে থাকেন হায়দার। রাহেলা পেছন থেকে হাত ধরে চাপা গলায় বলেন, যাইতাছ কই? ডাকাতের হাতে পরানখান দেবা নাকি?
এক ঝটকায় স্ত্রীর হাত ছাড়িয়ে এগোতে থাকেন তিনি। আওয়াজ আর আলো আসছে ড্রয়িং রুম থেকে। দেখেন টিভি ছেড়ে টিটে-রিমোর সাথে ছোট ভাই মোজাহারের ছেলে গালিব আর রুবাই বসে আছে। মহানন্দে রিমোট টিপে বাড়িয়ে দিচ্ছে আওয়াজ। পর্দায় ইয়া বড় মানুষরাÑঠিক গালিভারের মতো দেখতে, ওরা কুস্তি লড়ছে প্রাণপণে। ইংরেজীতে চলছে চিৎকার আর চেঁচামেচি।
Ñরাইতের একটা-দুইটায় মানুষ এসব দ্যাখে নাকি? ওরা চারজন বড় চাচুকে জাপটে ধরে বসিয়ে দেয় সোফায়।
Ñরেসলিং-এর প্রোগ্রাম বড় চাচু। দেখলে বুঝতে পারবে ভীষণ মজার ব্যাপার। ফ্যানটাসটিক প্রোগ্রাম। পৃথিবীর কিছুই তো দেখলে না তুমি। গাঁয়ে বসে শুধু জমির হিসেব কষো, বিল ক্লিনটনও এসব প্রোগ্রাম দেখেন বড় চাচু।
এত চ্যাঁচামেচি-হৈ হুল্লোড়Ñতবু আতাহার-রোদেলাদের ঘুম ভাঙে না, সারাক্ষণ হট্টমেলার মাঝে থাকে বলেই হয়তো কোন আওয়াজে ওরা অবাক বা বিব্রত হয় না। সব সয়ে গেছে ওদের।
দু’মিনিট বসেই মাথা ধরে যায় কুস্তিগীরদের চ্যাঁচামেচিতে। মারধর সমানে চলছে, রক্ত ঝরছে শরীরের নানা জায়গা থেকে। একজন অন্যজনের চুল টেনে ধরছে প্রাণপণ শক্তিতে। মার খেতে খেতে স্টেজে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়েছে একজন, তবুও আস্ফালন থামছে না, আড়াইশ,তিন শত, চার শত পাউন্ড ওজনের মানুষরা স্টেজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
অসহ্য, অসহ্যÑ ডিসগাস্টিং। হায়দার বিরক্ত হয়ে বলেন, বড় হইতাছো, স্বাধীন হইছোÑভালো কথা। মা-বাবা তোমাগো কোন কামে হস্তক্ষেপ করে না, ভালোমন্দ কিছু কয় নাÑতাও বুঝলাম, তো রাইত দুইটায় এই রেসলিং দেখন কি ঠিক? তোগো মায়ে-বাপে বয়রা হইয়া গেল নাকি?
গালিব হেসে বলে, বয়রা না বড় চাচুÑসবাই ঠিক আছে, এখন ব্যক্তি স্বাধীনতার যুগÑকে কি বলবে? সাড়ে তিনটায় প্রোগ্রাম শেষ হবেÑতারপর বিছানায় যাব। সকালে শাওয়ার নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি মন দিয়ে দেখলেই বুঝতে ভীষণ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।
বমি বমি ভাব হচ্ছে হায়দারের। ফের বিছানায় এসে বসেন। রাহেলা হেসে বলে, গাঁয়ে থাকতে থাকতে ডরাইন্যা স্বভাব হইছে আমাগো। পোলাপানরা টিভি দেখছেÑ দেখুক। হায়দার স্ত্রীর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে ভাবেন, মা-বাবাকে নিয়ে ভয়-ডর থাকবে না সন্তানদের ? ফুল ভলিউমে হাউমাউ করে টিভি চালিয়ে দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়া?
গভীর নিশুতি রাত। জানালার কাঁচ সরিয়ে বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। বুকের ভেতরে রাজ্যের বিরক্তি, তবুও শেষ রাতেন ¯িœগ্ধ প্রকৃতি সারা শরীর জুড়িয়ে দিয়ে যায়। রাহেলা পরনের শাড়ি গুছিয়ে কিচেনের দিকে যান সেহেরির আয়োজন করতে। বানুর মা আর রোদেলার কথা শুনা যায়। নওশীনও চলে এসেছে। জানালায় চোখ রেখে হায়দার আলী দেখতে থাকেন, আকাশ ছোঁয়া বাড়িগুলোর দেশলাইয়ের বাক্সেও মতো দরজা-জানালা দিয়ে আলোর ফুলঝুরির বিচ্ছুরণ। শহরে-নগরে কি রাতে কেউ ঘুমোয় না?
কী পবিত্র এই রমযানের মাস ! ছেলেবেলার সেই শান্ত ¯িœগ্ধ পরিবেশ কোথায় হারিয়ে গেল? সারা রাত ভরে রিক্সার টুংটাং, গাড়ির হর্ণ, মানুষের কথাবার্তা, মানুষের হাসাহাসি আর উচ্চগ্রামের কথাবার্তার আওয়াজে ঘুমোবার জো নেই, দিন-রাত যেন অদৃশ্য এক মহোৎসব চলছে।
ক্রোধ ফেনিয়ে উঠতে থাকে হায়দার আলীর বুকের ভেতরে।
টিভি স্কিনের ছবিগুলোর কথা মন থেকে মুছে ফেলতে পারছেন না একেবা্েরই, কুস্তিগীরদের পাশে দাঁড়ানো এক চিলতে জাঙ্গিয়া আর ব্রা পরা অপূর্ব সুন্দরী সোনালী চুলের বিদেশিনীরা ছুটোছুটি করছে। হায়দার আলী জিজ্ঞেস করছেন, এই মেয়েগুলান আবার কি করতে আইছে? ওরাও কুস্তি লড়ে নাকি?
গালিব হাসতে হাসতে বলেছেÑ না না বড় চাচু, তুমি কিছুই বোঝো না, ওরা এই রেসলারদের ইনসপিরিসন আর কি? প্রেরণাদাত্রী যাকে বলে।
হুÑ কী যে সব হইতাছেÑএমনই কথা হায়দারের বুকের ভেতরে। ঈদের পরই গাঁয়ে ফিরে যাবেনÑঠিক হলো। কেনা-কাটার আর শেষ নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলোÑআনন্দ, একসাথে সবাই উৎসব করা এর চেয়ে খুশির আর কিছুই হতে পারে না। টিটো-ঋতু-ডালু-রিমো-মিমো-গালিবÑসবাই নতুন নকশাদার পাজামা-পাঞ্জাবী গিফট করে বড় চাচুকে অবাক করে দিচ্ছে। ওদের ভাষায় সারপ্রাইজ দেয়া।
ঈদের আর বেশী দেরি নেই। চারপাশে আনন্দের ছোঁয়া। উৎসবের আমেজ। বাড়িতে হাজারো স্বাদু পদ রান্না। খুশির আর অন্ত নেই। হায়দার আলীর মনেও খুশির ঢেউ লেগেছে।
সেই রাতেই অভিজাত এই এলাকার দু’দলের ছেলেদের মারামারি শুরু হয়। একেবারে হায়দারের কামরা বরাবর। একদল চিৎকার করে, অন্যদল মারমুখী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডু অর ডাই, মারব নয়তো মরব। খানিকক্ষণ পর ‘ইয়াহু ইয়াহু’ বলে ঘুষি পাকিয়ে লাফিয়ে উঠে ওরা।
গালিব ওদের ফ্লাট থেকে ছুটে এসে বলে, বড় চাচু এসব হাঙ্গামা তোমার গাঁয়ে আছে বলো? টিটো চাপা গলায় বলে, মার মার আরোও জোরে মার। রুবাই বুঝিয়ে বলে, অনেক দিনের রেষারেষিÑবুঝলে বড় চাচু?
হ্যাঁ Ñহায়দার আলী অনেক কিছু বুঝেছেন। ছাপ্পান্ন বছর গাঁয়ে থেকে যা বুঝতে পারেন নি, ঢাকার শহরে এসে সতেরো দিনেই সব বুঝতে পেরেছেন। আর নয়, গাঁ থেকে বেরোন নি বলে সবাই আড়ালে-আবডালে কত কথাই বলেছে, ময়না তো মুখ ঝামটা দিয়ে অনেকবার বলেছে, গেঁয়ো ভাইজান। টিয়া বলত, তুমি আমাদের ওখানে না গেলে আর কক্ষণো আসব না। ভাইয়েরা যতই রাগ করুক, বউয়েরা যত অভিমানই করুকÑঈদের আগে ফিরে যাবেন বাড়িতে আর নয়Ñ অসহ্য।
এখানে এসে লিফটে চড়েছেন, যখন-তখন ছাদে উঠেছেন,গাড়িতে সারা শহর ঘুরে বেড়িয়েছেন। শ্রাবণের বৃষ্টিঝরা ভেজা ভেজা দিনে বাথরুমে গিজার চালিয়ে গোসল করছেন, গরম পানি করার হাঙ্গামা নেই। কারেন্ট চলে গেলেÑকুছ পরোয়া নেহি। ঘট ঘট করে জেনারেটর চালাতেই বাতি জ্বলে উঠে, ফ্যান ঘুরতে থাকে, সুবিধার শেষ নেই। অনেক আরাম, কিন্তু কি যেন নেই। কিসের অভাবে যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে সব।
ঈদের মাত্র তিনদিন বাকি। এর মাঝেই আমীর মিয়াকে দিয়ে টিকেট করিয়ে আনলেন হায়দার। ঋতু আর ডালু আদুরে গলায় বলে, এই প্রথমবার তুমি এসেছ বড় চাচু। ঈদ করে যেতে হবে, ও চাচিÑতোমাদের কোন কথা আমরা শুনব না।
হায়দার বলেন, তোমাদের সব কথাই শুনব আম্মাজান, তবে এবারের মতো মাফ করো, রাইত-বিরেতের আওয়াজ-ফাওয়াজ শুনলে আমি আর বাঁচুম না। রুবাই-গালিব বলে, এত ঘুম কাতুরে কেন তুমি বড় চাচু? না ঘুমোলে কি হয় শুনি? আমরা তো ল্যাপটপ নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত জাগি।
দিনে কাজ, রাতে ঘুমÑএতদিন পর্যন্ত এই জেনে এসেছেন হায়দার। নতুন ভাবে যে নতুন পৃথিবীর সব নিয়ম কানুন হচ্ছেÑতাতো তিনি একেবারেই জানেন না। নিজের উপর এক ধরনের করুণাবোধ হতে থাকে, কী বোকা তিনি। আধুনিক পৃথিবীর কোন কিছুই জানেন না হায়দার। হাসিমুখে বলেন, আর যাই বলিস সব মেনে নেব সোনা-ময়নারা, শুধু এখানে আর থাকতে বলিস না বাপ। মেজ আর ছোট ভাই মলিন মুখে বলে, ঈদ সামনে রেখে চলে যাচ্ছেন ভাইয়া? ভাবীÑআপনি কিন্তু ভাইয়াকে মানা করতে পারতেন। রাহেলা বলেন,হুঁÑভালই কইছ ভাই, তোমাদের ভাইজান আমার কথা কত শোনে।
ট্রেনে চেপে প্রথমে সিলেট, এরপর মিনিবাসে সুনামগঞ্জ, বাকিটা পথ লঞ্চে চেপে রাজানগর গাঁয়ে পৌঁছেন ওরা।
 হিজল-জারুল-কৃষ্ণচূড়া-কদম আর বট গাছ দেখতে দেখতে মন ভরে যায় হায়দারের। বাঁধানো ঘাঁট, লঞ্চের ভেঁপু, পাল তোলা নৌকা, গোধূলিতে রাখাল ছেলের গরু নিয়ে ঘরে ফেরা দেখতে দেখতে মনে হয়Ñআহা! কী শান্তির পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। কি করে রইলেন ওদের ছেড়ে?
বাড়ির আঙ্গিনায় গন্ধরাজ, সন্ধ্যামালতী, জুঁই, দোলনচাঁপা ধরা ¯œানে ভিজে মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
রাহেলা ফুল বাগানের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ সুরে বলেন, ঢাকায় তো এই ফুলগুলান দেখি নাই গো। সত্যিই বাটার কাপ, গন্ধহীন রজনীগন্ধা, এরিকা পাম, গ্লাডোলিয়া ছাড়া অন্য কোন ফুল চোখে পড়ে নি। সেখানে যেন গোলাপের গন্ধও হারিয়ে গেছে। সব আছে অথচ কিছুই যেন নেই।
হায়দার আলী চাপা গলায় হুংকার ছাড়েন,
Ñওরা মারামারি করব না ফুল ফুটাইব?
রাহেলা মুখ ভরে হেসে বলেন এইটা ঠিক কথা কইছো।
দু’দিন পর সন্ধ্যার মুখে হায়দার আলী উঁচু গলায় ডাকেনÑআমীর, এ্যাই আমীর‌্যাÑকোথায় গেলি রে।
কেউ জবাব দেয় না।
Ñএ্যাই আমীর‌্যা, আমীর‌্যাÑডাকি যে হুনস না?
Ñজি ¡সাব।
Ñঈদ কবে রে?
Ñকালকেই সাব।
ওহ! Ñ চারপাশে যেন কলকল করে দুষ্টু-দুরন্ত এক নদী। বুকের ভেতরে আনন্দধারা বয়ে যায় হায়দারের। প্রতি বছর আমীরের বাড়ি থেকে ঈদের ভোরে এক বাটি সেমাই আসে। দুধের সাথে সেদ্ধ করা সেমাই, তেমন ঘন নয়,দু’একটি এলাচি-দারুচিনি থাকে বলে মিহি এক সৌরভ বাতাসে ভাসে, অগুনতি পেস্তা-বাদাম-কিসমিস দেয়া নিজের বাড়ির ঘন দুধের সেমাইয়ের পাশে আমীরের বাড়ির সেমাই বড্ড পানসে ঠেকে। তবু প্রতি বছর সবার আগে আমীরের আনা সেমাই মুখে দিয়ে চেখে দেখেন। এতে যে ভালোবাসা মেশানো থাকে। ভাবতে গিয়ে অনিন্দসুন্দর চাঁদ রাতের এই সন্ধ্যায় চোখ ভিজে উঠে হায়দারের। এখানে সবার জন্য ভালোবাসা-মায়া-মমতা মাখামাখি হয়ে আছে। শহরে তো দেখে এলেন, রাত-দুপুরে দুই প্রতিপক্ষের তর্জন-গর্জন, সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত ইট ভাঙা মেশিনের ঘঁন ঘট্ ঘঁর ঘট্ আওয়াজÑবয়স্ক মানুষরা রাতে ঘুমোচ্ছে কিংবা অসুস্থ মানুষদের এতে কষ্ট হবে Ñএকথা কেউ ভাবে না। আমি শুধু আমার কথা ভাববÑ আর কারো কথা নয়Ñএমন মতবাদেই যেন বিশ্বাসী ওরা।
এখানে সবাই সবার কথা ভাবে। অগুণতি গাছের ¯িœগ্ধ ছায়ায় বড় মোহময় এ গাঁ-টি। তাইতো তিনি গেঁয়ো হায়দার আলী। আশেপাশের ছোট ছেলেমেয়েরা আনন্দের হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে,
Ñঈদেও চাঁন উঠছে, ঐ যে ঈদের চাঁন।
রাহেলা ঘর থেকে ছুটে আসেন।
Ñযাই সেমাই-টেমাই বার করি। পেস্তা-বাদাম গরম পানিতে ভিজাইয়া রাখন লাগব। জাফরান তো দুধে ভিজামু। ও করিমনÑজাফরানের প্যাকেট কই রাখলি রে?
আকাশে চিকন হাঁসুলির মতো চাঁদ। দূরাগত নির্মল আনন্দের রেশ ছুঁয়ে যায় হায়দার আলীকে। পোলাও-কোরমা-সেমাই রাঁধার আয়োজন চলছে ঘরে ঘরে, তারই চিকন সুবাস মেখে শ্রাবণের বাতাস উদ্বেল হয়ে উঠেছে।
কাজে ব্যস্ত আমীরকে ডাকতে থাকেন, আয় আমীর‌্যাÑঈদের কোলাকুলিটা সাইরা নিই।
রাহেলা এসে দাঁড়ান। বড় চমৎকার এই সন্ধ্যারাত।
Ñও আমীর মিয়া, জাফরানের পোটলাটা তো পাই নাই।
Ñআইতাছি ভাবীজান।
আমীরকে বুকে জড়িয়ে ধরে চাঁদ রাতের সন্ধ্যায় আনন্দের অজ¯্র স্বপ্নকুসুম দেখতে থাকেন হায়দার আলী। বর্ণালী পাঁপড়িগুলো মেলতে থাকে ধীরে ধীরে।