হিজড়াদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে

হিজড়া নামধারী তৃতীয় লিঙ্গের কিছু মানুষের উৎপাত ও দৌরাত্ম্য এতোটাই বেড়ে গেছে যে, বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে পর্যন্ত আলাচনা করতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নূরজাহান বেগম তাঁর প্রশ্নে বলেন, হিজড়ারা জোর করে মানুষের কাছে টাকা দাবি করে এবং মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করে। তাদের এই দৌরাত্ম্য বন্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা, তিনি জানতে চান। আরেক সংসদ সদস্য কবি কাজী রুজি বলেন, হিজড়ারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা দাবি করে, কেউ দিতে না পারলে তারা নানা ধরনের হুমকি দেয়। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেছেন, একবার রাস্তায় এক হিজড়াকে টাকা দিতে না চাইলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ এসব বেপরোয়া হিজড়াদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় সংসদের এই আলোচনা থেকে সারা দেশে হিজড়াদের উৎপাত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য এই সুনামগঞ্জে আমরাও হিজড়াদের এমন দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত নই। এখানেও বর-কনের গাড়ি আটকিয়ে চাঁদা আদায়, অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে সংঘবদ্ধভাবে টাকা দাবি, তাদের চাহিদামাফিক টাকা না দিলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শোনার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। এসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমেও একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অবস্থার বিশেষ হেরফের হয়নি। এখনও হিজড়াদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসাবে হিজড়ারা সমাজের মূল ¯্রােত থেকে আলাদা হয়ে আছে। তারা অনেক সময় নিজেরাই পরিবার ও সমাজ ছেড়ে হিজড়া সমাজে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এদের প্রতি সমাজের এক ধরনের উন্নাসিক মনোভাব রয়েছে। সামাজিক অবহেলা ও মানসিক কিছু অভিঘাতের ফলে হিজড়ারা সমাজের মূল ¯্রােত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে আলাদা একটি ¯্রােত তৈরি করে নেয়। এরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য এরা পরনির্ভরশীলতাকে বেছে নেয়। চাঁদাবাজি করাই হিজড়াদের মূল পেশায় পরিণত হয়েছে। এই চাঁদাবাজি করতে যেয়ে এরা মানুষকে বেশ বেকায়দা অবস্থায় ফেলে দেয়। বিড়ম্বনার হাত থেকে বাঁচতে অনেকেই এদের অযৌক্তিক দাবি মেনে টাকা পয়সা দিয়ে নিস্তার পেতে চায়। কিন্তু সমাজের একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠীর দ্বারা অপর জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনা ও হেনস্তার সন্মুখীন হোক, এরকম অবস্থা মোটেই কাক্সিক্ষত নয়।
হিজড়াদের সমাজের মূল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে বেশ কিছু কর্মসূচী চালু আছে। সুনামগঞ্জেও নিকট অতীতে অন্তত একটি এনজিও হিজড়াদের নিয়ে কাজ করত বলে আমরা জানি। এসব সরকারি বেসরকারি উদ্যোগের ফলে হিজড়াদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে এমন কোন দৃষ্টান্ত আমাদের জানা নেই। অর্থাৎ হিজড়া পুনর্বাসনে এইসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে সনাতন প্রথা অনুসারে দলনেতাদের অধীনে সংঘবদ্ধ জীবন যাপন এবং জীবিকার জন্য চাঁদাবাজিই এখন পর্যন্ত হিজড়াদের একমাত্র অবলম্বন।
এই হিজড়ারা কোন না কোন পরিবার থেকে আগত। পরিবারে যদি কোন হিজড়া সন্তান অন্যান্য স্বাভাবিক সন্তানের মতো আদর যতœ পেত তাহলে তারা নিজ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হত না। তাই হিজড়া পুনর্বাসনের কাজটি পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো অপরিহার্য। অন্যদিকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হিজড়াদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে তাদেরকে নানামুখী প্রশিক্ষণ দানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। উদার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও হিজড়া পুনর্বাসনের জন্য জরুরি।