হুজুগতাড়িত না হয়ে যৌক্তিক হতে হবে

যতদূর জানা গেছে করোনা ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় না। এটি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রমিত হয়। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে জীবাণু বেরিয়ে আসে এবং তা এক ফুটের মধ্যে থাকা অন্যদের সংক্রমিত করে। এখন পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুসারে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ৩ রোগীর সন্ধান মিলেছে যার দুইজনই ইতোমধ্যে সুস্থতা অর্জন করেছেন। আইইডিসিআর বুধবার পর্যন্ত আর নতুন কোনো করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর খবর দেয়নি। এরকম অবস্থায় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ঝুঁকি খুব মারাত্মক কিছু নয়। তারপরেও বাংলাদেশে মাস্ক ও জীবাণুনাশক দ্রব্যের দাম কেন বেড়ে গেছে তা কিছুটা আশ্চর্যজনকই বটে। বাজারে যেসব মাস্ক পাওয়া যায় তা জীবাণুর মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুর সংক্রমণ আটকাতে কতটা কার্যকর সে নিয়েও রয়েছে বিস্তর সন্দেহ। তারপরেও মানুষ হন্যে হয়ে মাস্ক কিনে চলেছে। একটি দু’টি নয়। পুরো বাক্সসমেত কিনে নিচ্ছে। পারলে পুরো ফার্মেসিতে যত মাস্ক রয়েছে তার সবগুলোই একজনই কিনে নিতে চাইছে। জীবাণুনাশকের বেলায়ও এই কথা সত্য। হুজুগে তাড়িত জাতি আমরা। যৌক্তিক বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পিছনে ছুটি। এর সুযোগ নেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে চাহিদা বাড়লে পণ্যের দাম বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের মুনাফাখোর লোভী ব্যবসায়ীরা এই অর্থনীতির সূত্রটিকে অস্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে যেতে অতিশয় পারংগম। তাদের এই অসাধুতা আরও বেশি উৎসাহ পায় প্রায় অনুপস্থিত বাজার তদারকি ব্যবস্থার কারণে। বাংলাদেশে খুচরা কিংবা পাইকারি; পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ কিংবা তদারকির নিয়মিত কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে যে যেমন ইচ্ছা তেমন করে জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে পারছে। এই অসৎ ব্যবসায়ীরা যখন মওকা পেয়ে যায় কিংবা হুজুগে মাতা গ্রাহক হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাদের দোকানে, তখন তো তাদের পোয়াবারো অবস্থা। সুতরাং কিছুদিন আগে যেমন পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে অসৎ ব্যবসায়ীকূল পকেট ভারী করেছিল তারা এবার করোনা আতঙ্ক কাজে লাগিয়ে একই ধান্দায় ব্যস্ত হবে তাতে আর আশ্চর্য কী?
আমরা যে পরিবেশে বসবাস করি, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, তাতে সকল সময়ই আমাদের মাস্ক মুখে পরার কথা। আমাদের রাস্তা-ঘাট সর্বদা ধুলিকাকীর্ণ থাকে। বাতাসে ভাসে বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য। কিন্তু করোনা আতংক শুরুর আগে অল্প লোককেই আমরা দেখি মাস্ক পরিধান করতে। এটি সচেতনতার মানদ-। আমাদের বেশির ভাগ লোক স্বাস্থ্যসচেতন নয়। সচেতনতা অবলম্বন করলে ভাইরাসবাহিত রোগে আক্রান্তের হার অনেক কম থাকত। এখন হঠাৎ করে সচেতনতা বেড়ে যাওয়ার পিছনে আতংক দায়ী। এই আতংক ক্ষতিকারক। করোনা ভাইরাস বা যে ভাইরাসই হোক, তাকে মোকাবিলা করতে হবে, ভয় পেলে ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচা যাবে কি? ভয় বা আতংক মূলত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আমাদের সকলের দায়িত্ব অযথা আতংক ছড়ানো থেকে বিরত থাকা।
যে চীন থেকে এই পর্যায়ে করোনার বিস্তৃতি ঘটেছিল সেই চীন ইতোমধ্যে তা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। অন্যান্য আক্রান্ত দেশগুলোও বিজ্ঞানসম্মত উপায় অবলম্বন করে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা শুরু করেছে। যেহেতু এখন বৈশ্বিক অভিঘাত এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বরং পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের একটি ক্রিয়া সারা পৃথিবীকে ছুঁয়ে যায়, সেহেতু আমাদের বিশ্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বৈজ্ঞানিক পন্থায়ই এই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। মানুষকে যৌক্তিক ও সচেতন হতে হবে। তাই করোনা নিয়ে অযথা আতঙ্ক নয়, এই বিষয়ে গণসচেতনতা ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণই বাঞ্ছনীয়।