১ম ও ২য় শ্রেণির কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তে বঞ্চনার ঘরবদল হল মাত্র

সরকারি চাকুরির ১ম ও ২য় শ্রেণিতে বিদ্যমান সবধরনের কোটা বাতিলের বিষয়ে সরকারি কমিটির সিদ্ধান্ত মন্ত্রীসভা অনুমোদন দিয়েছে। অর্থাৎ সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ ফোরামে এই অনুমোদন হওয়ায় ধরে নেয়া যেতে পারে এখন থেকে ১ম ও ২য় শ্রেণির নিয়োগে শতভাগ পদই মেধার ভিত্তিতে পূরণ করা হবে। অবশ্য ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির পদগুলোতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা বহাল থাকবে। বর্তমানে ১ম ও ২য় শ্রেণির পদে বিভিন্ন কোটায় প্রায় ৫৫ শতাংশ নিয়োগ হয়ে থাকে। অবশিষ্ট ৪৫ শতাংশ পদ নিয়োগ হত মেধার ভিত্তিতে। সরকারি নিয়োগে নানা নামে সংরক্ষিত বৃহৎ সংখ্যক কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে এবছর ব্যাপক আন্দোলন হয়। সরকার আন্দোলনকারীদের দাবির প্রেক্ষিতে এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বললে অসংগত হবে না। ১ম ও ২য় শ্রেণির পদে সব ধরনের কোটা তুলে দেয়ার ফল ভাল হল না খারাপ হল, কিংবা এর মধ্য দিয়ে নাগরিকদের প্রতি সুষম আচরণ হল কিনা সে নিয়ে বিস্তর তর্ক বিতর্ক হতে পারে। তবে যে বিষয়টিতে বিতর্ক ছিল না তা হল বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করে কোটার পরিমাণ যুক্তিসংগত পর্যায়ে হ্রাস করে আনা। সরকার এখন সংস্কারের পরিবর্তে পুরো কোটা ব্যবস্থাই বাতিলের ব্যবস্থা করলেন। অর্থাৎ এর ফলে আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশার চাইতেও বেশি চাহিদা পূরণ হয়ে গেল। অন্যদিকে বিভিন্ন কোটার সুবিধা যারা ভোগ করতেন তারা এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। জানা মতে, কোটা প্রত্যাহারের ফলে ক্ষতিগ্রস্তরা রাজপথে নেমেছেন এবং সামনে আরও বড় কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নামছেন। তাই মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্তে কোটা নিয়ে বিতর্ক কিংবা ক্ষোভ বিক্ষোভ সম্পূর্ণ মাত্রায় প্রশমিত হল না বরং ক্ষোভের ঘরবদল হয়েছে মাত্র। এই ধরনের সিদ্ধান্তকে তাই আপাতত ভাল-মন্দ কোন ধরনের বিশেষণে বিশেষায়িত করার উপায় নেই বলেই আমাদের মনে হয়।
সরকারি চাকুরি অথবা রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত পন্থা। নানাভাবে অনগ্রসর শ্রেণি কিংবা বিশেষ কীর্তিবানদের জন্য এরকম কোটা ব্যবস্থা রাখার ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এরকম বিশেষ সুবিধা প্রদানের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত মৌলিক নাগরিক অধিকার বিশেষ। ১ম ও ২য় শ্রেণির সকল কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তটি তাই সংবিধানের আলোকে প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে কোটা সংরক্ষণের যে উদ্দেশ্য ছিল অর্থাৎ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনা সেটি এখন মুখ থুবড়ে পড়বে। যারা কোটা সুবিধা পান তারা কিন্তু মেধাহীন নন। এরা পরীক্ষায় পাস করেই কোটা সুবিধা পান। তাদের সকলের অবস্থান হয়ত মেধা তালিকার প্রথম দিকে থাকে না, কিন্তু পরীক্ষা পাস করার অর্থই হল, ন্যূনতম যোগ্যতার অধিকারী তারা সকলেই। অকৃতকার্য হলে কেউই কোটার সুবিধা পান না। সুতরাং কোটা সংরক্ষণের মাধ্যমে মেধাবীরা বঞ্চিত হয়ে পড়ছেন এমন কথা বলার অবকাশ নেই। তবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে পুনঃ নির্ধারণ করা এখন যুগের দাবি। এই বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে মোটামোটি ঐকমত্যই দেখা যায়।
সরকার কোটা বাতিলের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে ভবিষ্যতে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। বঞ্চিতদের রাজপথে কর্মসূচীসহ আইনগতভাবেও এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এর চাইতে ভাল ছিল, পুরোপুরি বিলোপ সাধন না করে কোটা সংস্কার করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সংখ্যা বাড়ানো।