১২৪ টি ভাঙা নিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্টরা

পাগনার হাওরের গজারিয়ার পাশের এই ক্লোজারের প্রাক্কলনই হয়নি, কাজও শুরু হয়নি                

বিশেষ প্রতিনিধি
৩৭ টি বৃহৎ হাওরের ১২৪ টি ক্লোজার (ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙন) নিয়েই চিন্তিত কৃষকসহ সংশ্লিষ্টরা। এসব ক্লোজারের  কোন কোনটি দিয়ে এখনও হাওরের পানি নিস্কাশন হওয়ায় মাটি দিয়ে বাঁধ করা যাচ্ছে না। কোনটিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এখনও কাজই শুরু করেনি। এই অবস্থায় সোমবার জেলা প্রশাসনের নির্দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ১১৭ টি ভাঙনের তালিকা করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। কাজের অগ্রগতি কম হওয়ায় ধর্মপাশার চন্দ্র সোনার তাল হাওরের ৩ পিআইসির সভাপতিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমবার বিকালে আটক করে মুচলেখা নিয়ে ছেড়েছেন।
সুনামগঞ্জের ৫২ টি হাওরে এবার প্রায় ১৫ শ’ কিলোমিটার বাঁধের কাজ হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৬ টি বৃহৎ হাওরের ১২৪ টি ক্লোজারকে ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙন মনে করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডর কর্মকর্তারা সোমবার দাবী করেছেন ১১৭ টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ। সেগুলো হচ্ছে শনির হাওরের রহমতপুরের ভাঙ্গা, নান্টুখালী, ঝালখালী, লালুরগোয়ালা, নয়াবারংকা, মাসুকের খাড়া, ঝাকুড়ি ভাঙা, মহালিয়া হাওরের নোয়াগাঁও ক্লোজার ১, নোয়াগাঁও ক্লোজার ২, নোয়াগাঁও ক্লোজার ৩, পাগনার হাওরের মুচিবাড়ী, গজারিয়া, মতির ঢালা, মোড়লপুর ক্লোজার, বোগলাখালী, কাউয়ার বাঁধ, ডালিয়ার ভাঙা, উরারবন্ধ, ফুলিয়া টানা, কাইল্যানী, এলংজুড়ি, হালির হাওরের কালাগাঙ ক্লোজার, কোপাগাঙ্গের ভাঙা, লক্ষ্মিপুরের ভাঙা, ডাকাতখালী, কালীবাড়ি, হেরারকান্দি, মাহমুদপুরের ক্লোজার, গইন্নারখালের ভাঙা, সাচনার খালের ভাঙা, মটিয়ান হাওরের আলমখালী, মেশিনবাড়ি, টাকাটুকি গাজিপুর, পাঁচ নালিয়ার ভাঙা, বড়দলের ভাঙা, কাউকান্দির   ভাঙা, ছিলাইন তাহিরপুরের ভাঙা, ধরুন ভাঙা, নাইন্দার ভাঙা, জামলাবাজ, মাঝের খাল, গুরমার হাওরের ফাশুয়া, জিনারিয়ার ভাঙা, কইন্যারখাড়ার ভাঙা, গুরমার হাওরের টঙ্গিবাঁধ, শাহপুরের ভাঙা, কইয়াজুরা, নরসিংহপুর, ঘোড়াডোবা হাওরের ফুলদোয়ারী, জমশেদপুর, আখরা, শাইল্যানী, সোনামোড়ল হাওরের কুকুরমারা, রাজনার ভিটা, হাতিমারা, প্রতাপপুর, জারাকোনা, কয়রানী, চন্দ্রসোনার তাল হাওরের শয়তানখালীর ভাঙা, মারাদারীয়া, উলাষখালী, ডুবাইল, আলিপুরের ভাঙা, মিলনপুরের ভাঙা, গাহলাখালীর ভাঙা, চাঁনপুরের ভাঙা, ধানকুনিয়া হাওরের নুরপুরের ভাঙা, ইন্দুরাজার ঢালা, মোহিনিপুরের ঢালা, জয়ধোনা হাওরের মুক্তারপুরের ভাঙা, টাংগুয়ার হাওরের বাদালিয়ার ভাঙা, ঘোরামাড়ার ভাঙা, বরাম হাওরের তুফানখালীর ভাঙা, বোয়ালীয়ার ভাঙা, শয়তানখালী, কলাপাড়া, পাখখাওরী, উদগল হাওরের মাচুয়া খারা, গিলোটিয়ার ভাঙা, কাশিপুর ভাঙা, জয়পুরের ভাঙা, কালিকোটা হাওরের কলকলিয়া, চাপতির হাওরের বৈশাখীর ভাঙা, কাশিতলা, খাটশিয়ার ভাঙা, ভেড়ার ডহর হাওরের কুশিয়ারার ডান তীর, প্রতাপপুর, ফয়জুল্লাপুর বাঁধ, ছায়ার হাওরের মাদারিয়ার ভাঙা, শাল্লা ব্রীজের ভাঙা, ভান্ডা বিল হাওরের নোয়া জাঙ্গাইল, হরিনগর, দেকার হাওরের টলাখালীর ভাঙা, কুইড়ার খাড়া, করিমপুরের ভাঙা, দিগদাইর ভাঙা, উথারিয়া ভাঙা, কাঁচিভাঙা হাওরের ভাই বোনের ভাঙা, খাই হাওরের পাখিমারার ভাঙা, রাঙ্গামাটির ভাঙা, জামখোলা হাওরের দরগাপাশার ভাঙা, পূর্ব বীরগাঁও ভাঙা, সুরাইয়া বিবিয়ানা হাওরের বালিশ্রীর ভাঙা, নলুয়ার হাওরের বেতাওকার ভাঙা, বোরাখালী, আশারকান্দী, স্টিল ব্রীজ, কুশিয়ারার ডান তীর, জোয়াল ভাঙা হাওরের নিয়ামতপুরের ভাঙা, জিরাকের ভাঙা, বুড়িডক্কা ভাঙা, করচার হাওরের সোনাপুরের ভাঙা, হরিমনের ভাঙা, আঙ্গুরালী হাওরের চন্ডিতলা, গাছতলার ভাঙা, ফুলবাড়ির ভাঙ্গা, কাংলার হাওরের বিরামপুরের ভাঙা, পেটফোলার ভাঙা, কাঠের ব্রীজের ভাঙা ও নাইন্দার হাওরের মংলার ভাঙা, পেকেংগার ভাঙা।
এছাড়া স্থানীয় কৃষকরা বলেছেন, শনির হাওরের সাহেব নগরের পূর্বাংশ, পাগনার হাওরের গজারিয়ার পাশের আরেকটি ভাঙা, কালিকোটা হাওরের শর্মারখাল, সিঙাইড় খাল, ছায়ার হাওরের মুক্তারপুরের বাঁধ, রূপসি গাছের তল এবং নলুয়ার হাওরের ডুমাইখালি ভাঙন ঝুঁকিপূর্ণ।
ভাটি তাহিরপুরের কৃষক রহমত আলী জানিয়েছেন, শনির হাওরের লালুর গোয়ালায় কাজ বিলম্বে শুরু হয়েছে। পাগনার হাওরপাড়ের গজারিয়ার সাবেক ইউপি সদস্য শাহাব উদ্দিন জানিয়েছেন, বোগলাখালী ও কাউয়ার বাঁধে এখনো কাজ শুরু হয়নি।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌস আলম আখঞ্জি বললেন,‘মাটিয়ান হাওরের ছিলাইন তাহিরপুরের পিআইসি’র দায়িত্বপ্রাপ্তরা কাজ করতে অপারগতা জানিয়েছে। তারা দাবী করেছে বাঁধের পাশে মাটি পাওয়া যাচ্ছে না। দূরবর্তী স্থান থেকে মাটি আনতে হলে আরও সময় দিতে হবে।’
ধর্মপাশার দু’জন ইউপি সদস্য জানিয়েছেন, চন্দ্রসোনার তাল হাওরের মারাদারিয়া বাঁধ ভাঙলে কেবল চন্দ্র সোনার তাল নয়, ধর্মপাশার সকল হাওর ডুবিয়ে মধ্যনগর পর্যন্ত ডুবায়। এই বাঁধে কাজের কোন অগ্রগতি নেই। একই অবস্থা আলীপুরের ভাঙা এবং শয়তানখালীর ভাঙনেও।
ধর্মপাশার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন খন্দকার জানিয়েছেন, কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় ৩ পিআইসি সভাপতিকে সোমবার দুপুরে আটক করা হয়েছিল। পরে মুচলেখা নিয়ে সন্ধ্যায় ছাড়া হয়েছে তাঁদের।
দিরাই-শাল্লার উদগল হাওরের গিলটিয়া বাঁধে কাজ চলছে মন্থর গতিতে। এই উপজেলার কালিকোটা হাওরের শর্মার খাল ও সিঙাইর খাল, ছায়ার হাওরের মুক্তারপুর বাঁধ, ভান্ডা বিল হাওরের হরিনগর ও রূপসি গাছের তলের ভাঙনে কাজই শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস।
চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের ডুমাইখালি বাঁধে কাজ শুরু হয়নি বলে দাবী করেছেন ইউপি সদস্য রণধীর দাস। এমন অবস্থা আরও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙনে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন হাওরপাড়ের কৃষকরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন,‘বৃহৎ হাওরগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বছর এই সকল স্থানকে আমরা নতুন পদ্ধতিতে আটকানোর চেষ্টা করবো। তাতে বাঁধের স্থায়ীত্বও বৃদ্ধি পাবে। এই পর্যন্ত ৯৩৫ টি পিআইসির মধ্যে ৭৭৫ টির কাজ শুরু করেছে। এরমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙনেও কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের বিশেষ টিম থাকবে যারা এখন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কী পরিমাণ কাজ হচ্ছে, সেটি দেখভাল করবে। আমাদের হাতে কাজের যে সময়সীমা রয়েছে, এর মধ্যেই কাজ শেষ করার চেষ্টা করবো।’



আরো খবর