১৪ বছরেও নেই উন্নতি লোকসানে উদ্যোক্তারা

আসাদ মনি
করোনায় দীর্ঘ লকডাউন ও ৪ দফা বন্যায় লোকসান গুনছে সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। ভঙ্গুর সড়ক, নৌ পথে কাঁচামাল পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় ব্যবসায় সুবিধা করতে পারছেন না জেলার বিসিকের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। সারাদেশের চেয়ে সুনামগঞ্জ বিসিক পিছিয়ে থাকার দায় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বলছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ বিসিকে প্লট বরাদ্দের কাজ শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে। এখন জেলার বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ২৫ ইউনিট রয়েছে। কোনো কোনো ইউনিটের আওয়াতাধীন একাধিক ফ্যাক্টরি রয়েছে। সবগুলোই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। কর্টন মিল, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, মুড়ি মিল, বেকারি, এ্যালমুনিয়াম ফ্যাক্টরি রয়েছে এখানে। প্রথম দিকে সরকারি অনেক সাহায্য সহযোগিতা পাবার কথা শুনলেও এখন কোনো সহযোগিতাই পাচ্ছেন না বলছেন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। কর্মকর্তারা বলছেন, কি ধরণের সহযোগিতা প্রয়োজন এবং সে সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে প্রতিষ্ঠানের।
সরজমিনে দেখা যায়, ৪ দফা বন্যায় শিল্প নগরীর সড়ক ভেঙে গেছে। কোনো কোনো অংশে কংক্রিটের শেষ অংশও নেই। এতে সামান্য বৃষ্টি হলেই কাঁদা লেগে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। এসময় পণ্য পরিবহন করতে অসুবিধায় পড়তে হয়। সিলেট সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক পার হলেই সুরমা নদী। নদী পথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকলেও বিসিকের সঙ্গে সংযোগ সড়ক না থাকায় সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।
বিসিকের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বলছেন, সুনামগঞ্জ দেশের প্রান্তিক জেলা। অন্যান্য জেলা থেকে কাঁচামাল সহজে আমদানি করা সম্ভব না হলেও সুনামগঞ্জেই কাঁচামালের সহজ লভ্যতা রয়েছে। মাছ, ধান ও পানি কে প্রক্রিয়াজাত করণের ফ্যাক্টরি হতে পারে এখানে। এ জেলা থেকে সারাদেশসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে মাছ রপ্তানি হয়ে থাকে। শুটকির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। শুটকির ফ্যাক্টরি হতে পারে। চুনাপাথর পাওয়া যায়। চুনের ফ্যাক্টরি গড়ে উঠতে পারে। সরকার ও বিসিকের কর্তকর্তাদের সদয় দৃষ্টিপাত প্রয়োজন এক্ষেত্রে।
বি- বাড়িয়া বেকারির মালিক আব্দুল করিম বলেন, প্রথমে শুনেছি বিসিকে প্লট নিয়ে ব্যবসা শুরু করলে সরকারি অনেক সহযোগিতা পাওয়া যাবে। এজন্য ২০০৮ সালে প্লট কিনে অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু করি। যথাসময়ে কাজ শেষ করে ব্যবসা শুরু করি। শুরু থেকে এ পর্যন্ত সরকারি কোনো সহযোগিতা পাইনি। ২০১৪ সনে আমার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছি। এখন বেকারি চালাচ্ছি। তবে প্রতিদিন নয়। একদিন চালালে ৩ দিন বন্ধ রাখতে হয় মুলধনের অভাবে।
বিসিক মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, অনেক মালিক শুরুতে সরকারি অনেক সহযোগিতার কথা শুনে কারখানা শুরু করেন। প্রথমে নিজের পুঁজি দিয়ে জায়গা ও অবকাঠামো করেই মুলধন শেষ করেছেন। আশায় ছিলেন ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করবেন। পরে ঋণ না পেয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারেন নি। নিজের পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে।
বিসিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হোসেন বলেন, বর্তমানে করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে ব্যাংক ঋণ আমাদের প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে প্রনোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, এর কোনো ছিটেফোঁটা আমরা পাই নি। বিসিকে প্লট নিয়েছি আমরা, ভেবেছিলাম সরকারি সাহায্য সহযোগিতা পাবো। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া এখানে ব্যবসা হবে না। অন্যান্য জেলার বিসিকের উন্নয়ন হয়েছে সরকারি সুযোগ সুবিধা পেয়েই। কিন্তু আমরা কোনো সুযোগ সুবিধা পাই না।
জেলার কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না বলে উল্লেখ করে মালিক সংগঠনের এই নেতা বলেন, আমরা আশা করি উর্দ্ধতন কর্তপক্ষ এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। আমরা ব্যবসা করতে বিসিকে এসেছি। আমরা সরকারের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সহযোগিতা চাই। সহজ শর্তে ঋণ চাই।
মালিক সংগঠনের সভাপতি মো. খালেদ মিয়া বলেন, নদী পথে কাঁচামাল পরিবহন করতে পারি না। অথচ সুরমা নদী আমাদের কাছেই। বিসিকের সঙ্গে একটা সংযোগ সড়ক প্রয়োজন। এদিকে বিসিকের ভেতরে রাস্তার বেহাল অবস্থা। বৃষ্টি হলে কাঁদা লেগে যায়। এছাড়াও আমরা যারা ব্যবসা করছি সবার গ্যাস সংযোগ নেই। বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সংযোগ চাই।
সুনামগঞ্জ বিসিকের উপ ব্যবস্থাপক এম. এস. এম আসিফ বলেন, ব্যাংক ঋণ দেয় না কথাটা ঠিক নয়। ব্যাংক ঋণ দেয়ার আগে বরাদ্দকৃত প্লটের কাগজপত্র যাচাই করেন। অনেক মালিক প্লটের কিস্তি পরিশোধ করেন নি। ব্যাংক তো এগুলো যাচাই করবেই।
অন্যান্য জেলার বিসিক থেকে সুনামগঞ্জ বিসিক পিছিয়ে আছে কেনো? এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, সুনামগঞ্জের উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। এছাড়াও সুনামগঞ্জের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিসিকে আসে না, তারা বালু, পাথর ও কয়লার ব্যবসা করে।
তিনি বলেন, নদী পথে পণ্য পরিবহনের জন্য সুরমা নদীর সঙ্গে বিসিকের সংযোগ সড়ক করার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি। সিলেট সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপাশের জমি বিসিকের নয়। তাই সংযুক্ত সড়ক করতে সময়ের প্রয়োজন। বিসিকের ভেতরের সড়ক খুব দ্রুত হয়ে যাবে। আমরা উর্দ্ধতন কতৃপক্ষকে প্রস্তাব পাঠিয়েছি।