২০০ ফাযিল পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত

বিন্দু তালুকদার
পরীক্ষা দিয়েছি, সবার রেজাল্ট হয়েছে কিন্তু আমরা রেজাল্ট পাচ্ছি না। জীবনটাই এখন নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথে। সারা দেশের ছাত্রদের রেজাল্ট বের হয়েছে কিন্তু আমাদের রেজাল্ট স্থগিত করে রাখা হয়েছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কারণে আমরা চরম হয়রানীতে পড়েছি।’
ফাযিল ৩য় বর্ষের পরীক্ষার ফলাফল না পেয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মেরুয়াখলা মমিনিয়া ফাযিল মাদ্রাসার ছাত্র হুমায়ুন আহমেদ।
শুধু হুমায়ুন আহমেদই নয়, মেরুয়াখলা মমিনিয়া ফাযিল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রায় ২০০ জন শিক্ষাথীর ফাযিল ২য় ও ৩য় বর্ষের ফলাফল স্থগিত রেখেছে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
মেরুয়াখলা মমিনিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ৩য় বর্ষের পরীক্ষার্থী হুমায়ুন আহমেদ অভিযোগ জানিয়ে বলেন,‘আমরা পরীক্ষার্থীরা ফি’র চেয়েও অতিরিক্ত টাকা দিয়েছি। কেউ কেউ ৫ হাজার, ৬ হাজার টাকা বা আরো বেশী দিয়েছেন। আমাদের রেজাল্ট স্থগিতের বিষয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাথে কিছু টাকার লেনদেন বাকী রয়েছে। পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ হয়েছে গত ২৭ মে, কিন্তু আমাদের মাদ্রাসার সবার রেজাল্ট স্থগিত। এখন এই বিষয়ে কথা বললে মাদ্রাসার প্রভাষক আবু সাঈদ ও আব্দুল খালিক আমাদেরকে মামলা দিয়ে জেলে ঢুকানোর হুমকি দিচ্ছেন।’
এ ঘটনায় মাদ্রাসার ১০ জন পরীক্ষার্থী গতকাল বৃহস্পতিবার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। জেলা প্রশাসক পরীক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়টি দ্রুত তদন্তের জন্য বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেরুয়াখলা মাদ্রাসা পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)। এই মাদ্রাসায় বিভিন্ন পরীক্ষা ও নানা ফি ইচ্ছাখুশি আদায় করেন কর্তৃপক্ষ। যারা প্রতিবাদ বা আন্দোলন করতে পারেন তারা কিছু টাকা কম দিতে পারেন। আর যারা প্রতিবাদ করার সাহস পান না তাদের কর্তৃপক্ষের চাহিদামত টাকা পরিশোধ করতে হয়। এভাবেই চলছে এই মাদ্রাসার কার্যক্রম।
পরীক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, গত ২৭ মে সারা দেশে মাদ্রাসার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু মেরুয়াখলা মাদ্রাসার ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির কারণে ২০০ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত রেখেছে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সবার কাছ থেকে নির্ধারিত ফি আদায় করলেও, সেই ফি জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফি না পেয়ে ফলাফল স্থগিত রেখেছে। এঘটনায় পরীক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় গিয়ে আন্দোলন করলে কর্তৃপক্ষ দুইদিনের সময় নিয়েও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি।
মেরুয়াখলা মাদ্রাসার ফাযিল ২য় বর্ষের পরীক্ষার্থী সালাহ উদ্দিন ও আলফাজ উদ্দিন বলেন,‘মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যার কাছ থেকে যত টাকা পেরেছেন আদায় করেছেন। কারো কোন ফি বকেয়া নেই। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেয়া হয়নি। নির্দিষ্ট ফি জমা দিলে আমাদের এই সমস্যা হত না। সারা দেশের পরীক্ষার্থীরা ফলাফল পেয়েছেন কিন্তু আমাদের ফলাফল স্থগিত করে রাখা হয়েছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ভুলের কারণে আমাদের জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছে। এই বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ কোন শিক্ষকই এখন ফোন রিসিভ করছেন না। ’
এ ব্যাপারে মেরুয়াখলা মমিনিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাও. আব্দুল মতিনের সাথে কথা বলতে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন সাড়া দেননি।
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মেরুয়াখলা মমিনিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ২০০ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত রয়েছে বলে জানা গেছে। পরীক্ষার্থীরা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য ইউএনওকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’