৩৭ ভাগ বাঁধের কাজে অনিয়ম হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ৫২ টি হাওরের বোরো ফসল আগাম বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে নির্মিতব্য বাঁধের ৩৯ ভাগ কাজ এখনো হয় নি। ৩৭ ভাগ বাঁধের কাজে নানাভাবে অনিয়ম হয়েছে। বেসরকারি সংগঠন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য ওঠে এসেছে। এছাড়া বাঁধের মাটি দুরমুজ করা, ঢাল বজায় রাখা, মাটি ফিনিসিং করা ও ঘাস লাগানোর কাজ এখনো বাকি রয়েছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা এবং সংস্থার সহসভাপতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী এবং তাহিরপুর এসোসিয়েশন শাবিপ্রবির সদস্যদের সহযোগিতায় সুনামগঞ্জের মোট ৮১০ টি বাঁধের মধ্যে ১০২ টি বাঁধ পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
রোববার দুপুরে ‘হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের সর্বশেষ তথ্য বিষয়ক ভার্চুয়াল আলোচনা ও গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠান’ এ তারা এই গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন। গবেষণা প্রতিবেদনে তারা আরও উল্লেখ করেন, ৫ মার্চের মধ্যে মাত্র ৫৮ শতাংশ বাঁধে মাটি ভালভাবে দুরমুজ করা হয়নি, মাত্র ৭ ভাগ বাঁধে ঘাস লাগানো হয়েছে। তারা আরও উল্লেখ করেন ৩৭ ভাগ বাঁধ নিয়ে এলাকাবাসী দূর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। বাঁধ নির্মাণে বিলম্বিত হবার কারণ হিসাবে তারা প্রকল্প প্রাক্ষলন ও কমিটি গঠনে বিলম্ব, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, হাওর থেকে দেরিতে পানি নামা ড্রেজার মেশিনের স্বল্পতার কথা উল্লেখ করেন। এছাড়াও তারা বাঁধের মাটির দুস্প্রাপ্যতা, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ, প্রকল্প কমিটি গঠনে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতিকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
প্রকল্প প্রাক্ষলনে বিলম্ব না করা , আগে ভাগে প্রকল্প কমিটি গঠন , সময়মতো অর্থ ছাড়, নীতিমালা মেনে প্রকল্প কমিটি গঠন , প্রকল্প প্রণয়নে স্থানীয় কৃষকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, বাঁধের বিকল্প ভাবা ও নদী এবং বিল খননের কথা সুপারিশ হিসেবে উল্লেখ করা হয় সংগঠনের পক্ষ থেকে।
কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এই বছর ৫ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৬১ শতাংশ বাঁধে মাটি ফেলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে বলা হয় বাকি ৩৯ শতাংশ বাঁধে মাটি ফেলার কাজই শেষ হয়নি। এরপর মাটি দুরমুজ করা, ঢাল বজায় রাখা, মাটি ফিনিসিং করা ও ঘাস লাগানোর কাজ বাকি রয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধের ৫০ মিটার দুর থেকে মাটি আনার কথা থাকলেও ২২ ভাগ বাঁধে এর কাছে থেকে মাটি আনা হয়েছে।
অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এই তথ্যগুলো যদি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং তারা সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তবেই আমাদের প্রচেষ্ঠা সার্থক হবে।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আলী ওয়াক্কাস সুহেল বলেন, বাঁধের বিকল্প ভাবতে হবে। বাঁধের কারণে হাওরের প্রতিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে। তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এজন্য নদী ও হাওরের বিল খনন করতে হবে। একই সাথে হাওরের সমস্যা সমাধানে হাওরের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য তিনি মতামত দেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, এই বছর হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ দেরিতে হওয়ার একটা বড় কারণ হলো হাওর থেকে দেরিতে পানি নামা। হাওরে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। হাওর এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। যত্র তত্র ব্রীজ কালভার্ট, সড়ক নির্মাণ করা যাবে না। হাওরকে নিয়ে সামগ্রীক ভাবে ভাবতে হবে। খন্ডিত ভাবে ভাবলে হবে না।
এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এন্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, বিগত বছরের তুলনায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। জবাবদিহিতা বেড়েছে। এটি আশাব্যঞ্জক। সুশাসনের জন্য জবাবদিহিতা অপরিহার্য। এতে হাওর রক্ষা আন্দোলনের ভূমিকা রয়েছে। এই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। এ ব্যাপারে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় বাঁধ কোনো ভাবেই কাম্য নয়। এটি যত সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
এতে আরও বক্তব্য রাখেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার কোষাধ্যক্ষ রজত ভূষণ সরকার।